ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। এমন সময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, নিঃসন্দেহে তোমার মন প্রতিজ্ঞা-দৃঢ়, কিন্তু তোমার মতো বহু দৃঢ় মনোভাবসম্পন্ন লোকও পরিবর্তিত হয়। আমার কথার স্বপক্ষে আমি একটি কাহিনি বলছি। শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে। শোনো বলছি।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
বীরকেশরী নামে এক সাধারণ লোক ছিল। লোকটার এক অসাধারণ গুণ ছিল, তা হল সে চুপ করে থাকতে পারত না। পথে যার সঙ্গে দেখা হত তাকেই কোনো না কোনো কথা বলত। কেউ জবাব দিক বা না দিক প্রশ্ন করাই ছিল তার স্বভাব। এমনকী তার প্রশ্নের সঠিক জবাব পেল কি না তা নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না। প্রশ্ন করেই সে খুশি। এটা যাদের কাছে ভালো লাগত না তারা তাকে এড়ানোর চেষ্টা করত।
তার স্ত্রী ছিল খুব ভালো। কেউ তার কথা শুনুক বা না শুনুক তার স্ত্রী বাধ্য হত তার কথা শুনতে। শুনে শুনে তার যেন শোনাটাই অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। সে কোনো প্রশ্ন করত না আর কোনো প্রশ্নের জবাবও চাইত না। বীরকেশরী যা বলত, সত্য হোক মিথ্যা হোক সে শুধু শুনে যেত। এসব দেখে তার দাদা শম্ভু মনে মনে দুঃখ পেয়েছিল। সে তার বোনকে এই ধরনের কষ্ট থেকে মুক্ত করার জন্য অন্য এক গ্রাম থেকে এক কুস্তিগীরকে নিয়ে এল। কুস্তিগীর ওই গ্রামে এসে সোচ্চারে ঘোষণা করল, 'আমার সঙ্গে কেউ কি কুস্তি লড়তে চাও? এই গ্রামে কি আমার সঙ্গে কুস্তি লড়ার কোনো লোক আছে? কেউ যদি থাকো, এগিয়ে এসো।'
দর্শকদের মধ্যে বীরকেশরী ছিল। সে এগিয়ে এসে বলল, 'তুমি ভালোভাবেই জানো, এখানে কোনো কুস্তিগীর নেই। আর নেই বলেই এত জোর গলায় ঘোষণা করছ।'
কুস্তিগীর ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, 'ভিড়ের ভেতর থেকে কে বলছ? সাহস থাকে এগিয়ে এসো। তুলে আছাড় মেরে তাকে এক্ষুনি মেরে ফেলব। কে বলেছ, এগিয়ে এসো।'
বীরকেশরী তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে বলল, 'কেন, কী হয়েছে? আমি বলেছি। যা সত্য তাই বলেছি। সত্য কথা বললে অত রাগ করার কী আছে?'
এই কথায় কুস্তিগীর আরও রেগে গিয়ে বীরকেশরীর হাত ধরে টেনে তুলে একটা আছাড় মেরে তাকে ছেড়ে দিল। সে যাত্রায় সে প্রাণে বেঁচে গেল বটে, কিন্তু তার শরীরে অসংখ্য ঘা হয়ে গিয়েছিল। পরে বীরকেশরীকে শম্ভু বলল, 'দেখলে তো, সবসময় তুমি এই যে প্রয়োজনে নিষ্প্রয়োজনে কথা বল তারই ফল হল এই। অতগুলো লোকের মধ্যে আর কেউ কোনো কথা বলল না। তুমি হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে যা মুখে এল তাই বলে দিলে।'
সারা গায়ে ব্যথা হলেও বীরকেশরী শ্যালককে বলল, 'অতবড়ো কুস্তিগীরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস কারও আছে? আমার আছে তাই বলেছি।'
শম্ভু ভাবল, 'এর স্বভাব অত সহজে বদলাবে না। প্রবাদ আছে— ''স্বভাব যায় না মলে, ইল্লত যাই না ধুলে।'' তাই এর পেছনে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।'
একদিন বীরকেশরী যখন বাড়িতে ছিল না তখন এক সাধু এল। বীরকেশরীর স্ত্রী বলল, 'দেখুন আমার স্বামী এখন বাড়িতে নেই। এসে যদি শোনেন যে তাঁর অনুপস্থিতির সময় আমি কাউকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছি তাহলে উনি ভীষণ রেগে যাবেন এবং যা মুখে আসবে তাই আমাকে বলে ফেলবেন।'
'মা জননী, আমাকে একটু খেতে দাও। তোমার কর্তার মুখ কী করে বন্ধ করতে হয় তা আমি জানি।' সে বলল।
তার কথায় বিশ্বাস করে বীরকেশরীর স্ত্রী তাকে খাওয়াতে বসল।
এমন সময় বীরকেশরী বাড়িতে এসে ওই সাধুকে গোগ্রাসে গিলতে দেখে সাধুকে ধমক দিয়ে বলল, 'এই খাওয়ার জন্যে এত কষ্ট করে দাড়ি গোঁফ বাড়িয়ে রাখতে হয়েছে! একটু গায়ে-গতরে খেটে রোজগার করে খেতে পারো না? স্বাস্থ্য তো বেশ বাগিয়েছ।' এই ধরনের আরও অনেক খারাপ খারাপ কথা বলল।
'দেখো, আমার যে কত ক্ষমতা আছে তা তুমি জানো না। আমাকে গালাগাল দিয়ে তুমি কিন্তু নিজের কবর খুঁড়ছ।' সাধু বলল।
'চুপ করো, তোমার মতো ভণ্ড সন্ন্যাসী অনেক দেখেছি। আর একটি কথা বলেছ কী মজা দেখিয়ে দেব! তুমি ভণ্ড।' বীরকেশরী বলল।

পরক্ষণেই দেখা গেল সন্ন্যাসীর ছেঁড়া কাপড়ের পরিবর্তে ভালো পোশাকের অন্য লোক। সে বলল, 'বীরকেশরী, তোমাকে একটা বর দিচ্ছি। এবার থেকে তুমি যার সর্বনাশ কামনা করবে তারই পৌষমাস হবে।' বলে ওই সাধু চলে গেল।
তারপর অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। একদিন বীরকেশরী একজনকে অভিশাপ দিয়ে বলল, 'তোমার ধান ক্ষেত পুড়ে যাক।' সঙ্গেসঙ্গে ওই ধানক্ষেত সোনালি ধানে ভরে গেল। কাউকে হয়তো বলল, 'তোমার বাড়ি ঝড়ে উড়ে যাক।' আর সেই বাড়ি সঙ্গেসঙ্গে প্রাসাদ হয়ে গেল।
এইভাবেই রাগের মাথায় যাকে অভিশাপ দেয় তারই আশীর্বাদ হয়। এতগুলো লোকের রাতারাতি উপকার হয়ে যাওয়ায় চমকে উঠে সে সংযত হল এবং কারও অপকার কামনা না-করে উপকার কামনা করতে লাগল। তার মধ্যে দেখতে দেখতে অনেক পরিবর্তন দেখা দিল। আপ্রাণ চেষ্টা করা সত্ত্বেও কারও না কারও বিরুদ্ধে যখন সে কথা বলত তখন শেষপর্যন্ত প্রতিপক্ষের উপকারই হত। এই ঘটনার ফলে সে যে শুধু অন্যের উপকারের কামনা করতেই লাগল তা নয়, সে কথাও কম বলতে লাগল। তার এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে খুশি হল তার স্ত্রী। এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাপার ছিল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, শেষপর্যন্ত সাধু বীরকেশরীর মনে পরিবর্তন এনেছিল। অথচ সাধু এমন কিছুই করল না। শুধু একটি ব্যবস্থা করে গেল যাতে বীরকেশরী অভিশাপ দিলে তা আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। এইটুকুর জন্যে বীরকেশরীর আজীবনের স্বভাব পালটে গেল কেন? তার রাগ এত কমে গেল কী করে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে অনতিবিলম্বে আমার সামনেই তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'যেকোনো লোক যখন প্রতিপক্ষকে অভিশাপ দেয় তখন সে চায় যে তার অভিশাপ লাগুক। পুরাণে আছে কিছু লোকের অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অত বড়ো ক্ষমতা নেই। এই ক্ষমতা না থাকার ফলে সাধারণ মানুষ যা মুখে আসে তাই বলে। যা বলত তাই যদি ঘটে যেত তাহলে মানুষ সংযত হয়ে কথা বলত। বীরকেশরী যা বলত তার বিপরীত ঘটনা ঘটে যাওয়ার ফলে শেষপর্যন্ত তাকে সংযত হয়ে কথা বলতে হল। বীরকেশরী অন্যের উপকার করতে চাক আর নাই চাক তার কথা ফলে যাওয়ায় সে সংযত হয়ে কথা বলতে শুরু করল। এইভাবে যে লোকটা অনবরত কথা বলত, গালাগালি দিত তা বন্ধ করে আশীর্বাদ করতে লাগল। এ যেন মরা মরা করতে করতে রাম নাম জপ করা। এর ফলে তার স্বভাবের পরিবর্তন ঘটে গেল।'
রাজার এইভাবে নীরবতা ভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন