পরিবর্তন

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, মানুষ বদলে যায়। মানুষের পরিবর্তন ঘটে তার ভাগ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। এই পরিবর্তনের কারণ সবসময় বোঝা যায় না। বোঝানোও যায় না। আমার কথা যে সত্য তা প্রমাণ করার জন্য আমি সোমনাথের কাহিনি বলব। এই কাহিনি শুনলে পথ চলার পরিশ্রমও লাঘব হবে। বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—

সোমনাথ ছিল বাপ-মায়ের এক ছেলে। কিন্তু সে বাপ-মায়ের কোনো কাজে এল না। ওদের কথা সে এককানে শুনত অন্য কানে বের করে দিত। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়াত, ঠিক খাবার সময় বাড়ি ফিরত। তার মা অনেক করে তাকে বোঝাত; কিন্তু মার কথা সে কানেই তুলত না। নানাভাবে তার মা চেষ্টা করেছিল তার এই ঘুরে বেড়ানোর অভ্যেস ছাড়াতে। কিন্তু কোনো ফল হল না। মাঝে মাঝে সোমনাথ মাকে দু-চার কথা শুনিয়ে দিত। তার বাবাও বেশি কথা বলত না। কিন্তু সহ্যের একটা সীমা আছে। তার বাবা একদিন, আর সহ্য করতে না পেরে, সোমনাথকে কড়া কথা শুনিয়ে দিল। বাপ যে তাকে অত কথা শোনাবে তা হয়তো সে ভাবতে পারেনি। কিন্তু যখন বাপের কড়া কথা শুনল তখন সে খুব দুঃখ পেল। তার কারণ, তার অপরাধ যে ঠিক কী, কেন যে বাবা তাকে অত বকছে, তা সে বুঝতে পারেনি। সে অত্যন্ত অপমানবোধ করল। মনে মনে গুমরে উঠে সে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

বাড়ি থেকে পালিয়ে সারাদিন সে হাঁটল। কোথায় যে যাচ্ছে তা সে জানে না। হাঁটতে হাঁটতে তার পা ফুলে ঢোল হয়ে গেল। খিদের জ্বালায় তার মাথা ঘুরতে লাগল। যেখানে সে জল দেখতে পেল সেখানেই সে জল খেতে লাগল। কিন্তু জলে তো আর খিদে মেটে না।

যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। সোমনাথের পথ চলার যেন বিরাম নেই। শেষে সে ঢুকে গেল এক অরণ্যে। ঢুকেই সে দেখতে পেল একটি ভাঙা মন্দির। তখন সে এত ক্ষুধার্ত যে হাঁটতে পারছিল না। তার মনে হল বাড়ি থেকে পালানো তার ভুল হয়েছে। বোকার মতো হঠাৎ পালানো উচিত হয়নি।

কোত্থেকে একটা গোরুর গাড়ি তার কাছে এসে থামল। গাড়ি থেকে এক বৃদ্ধ ক্ষীণকণ্ঠে অতি কষ্টে বলল, 'বাবা, আমি আর পারছি না। তুমি এই বলদগুলোকে খুলে একটু চরতে দাও।'

সোমনাথ নিজেই নড়তে পারছিল না। এমন সময় বৃদ্ধের অনুরোধ শুনে অনেক কষ্টে বলদগুলোকে খুলে চরতে ছেড়ে দিল। তারপর সোমনাথ এবং বৃদ্ধ নানা কথা বলতে লাগল। বৃদ্ধের নাম রামলাল। সে সোমনাথকে বলল, 'দেখো বাবা, তোমাকে দেখে আমার ছেলের কথা মনে পড়ছে। বাচ্চা বয়সেই ওর মা মারা গিয়েছিল। আমিই ছিলাম তার মা এবং বাবা। ছেলের উপর আমার অনেক আশা ছিল, কিন্তু আমার সব আশা ধুলোতে মিশে গেল। খারাপ সঙ্গীদের সঙ্গে মিশে সে এমন হয়ে গেল যে কখন যে কী করে বসবে সেই নিয়ে আমি ভয়ে ভয়ে কাটাতাম। শেষ পর্যন্ত হলও তাই। হঠাৎ একদিন সে এমন একটা অপরাধ করে বসল, যার ফলে সে রাজপ্রহরীদের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল। সেই যে গেল আর ফিরল না। কোথায় যে ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা জানি না। আমি তাকে খুঁজছি আর খুঁজছি।'

'আহা, তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। তোমার কথা শুনে মন জুড়িয়ে গেল। তোমার বাবা মা কত পুণ্যবান যে তোমার মতো একটা সুপুত্রকে পেয়েছে।' বলতে বলতে রামলাল কাশতে লাগল। একবার কাশি শুরু হলে আর থামে না।

কাশতে কাশতে রামলাল বলল, 'শোনো বাবা, আমার অপদার্থ ছেলের জন্য আমি ফতুর হয়ে গেলাম। এই গোরুর গাড়ি ছাড়া আমার আর কিছু নেই। আমি আর বাঁচব না। ভাগ্যিস এই অরণ্যে এলাম তাই তোমার মতো ভালো ছেলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শ্রীপুরে আমার এক বন্ধু আছে। নাম গঙ্গানাথ। তুমি তাকে একটু খবর দেবে।' বলতে বলতে রামলাল মারা গেল।

পরের দিন সকালে সোমনাথ একটা গর্ত খুঁড়ে সে গর্তে রামলালকে রেখে দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দিল। তারপর সে গোরুর গাড়িতে চেপে অরণ্য থেকে বেরিয়ে গ্রামের সন্ধানে রওনা দিল।

অনেকদূর যাওয়ার পর একটি গাছ থেকে ফল পেড়ে গোগ্রাসে খেতে লাগল। ওই গাছটার মালিক ছিল গঙ্গানাথ। সে দূর থেকে দেখতে পেয়ে হাঁক পাড়তে পাড়তে এসে সোমনাথকে বলল, 'এটা কি তোমার ঠাকুরদার গাছ পেয়েছ যে ইচ্ছামতো পাড়ছ আর খাচ্ছ।'

'শুনুন বাবু, শুনুন। দু-দিন আমি খাইনি। কিচ্ছু খেতে পাইনি আমি। তাই দুটো ফল খাচ্ছি।' সোমনাথ বলল।

'ঘরবাড়ি নেই নাকি? যার তার গাছ থেকে পেড়ে খেলেই হল? কোন গ্রামের ছেলে তুমি, কোথায় যাচ্ছ?' গঙ্গানাথ প্রশ্ন করল।

'আমার গ্রাম জেনে আর কী হবে? আমি যাচ্ছি শ্রীপুরে। গঙ্গানাথবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। একটা খারাপ খবর আছে। গতকাল রামলাল মারা গেছেন। রামলালের একমাত্র বন্ধু হলেন গঙ্গানাথ। ওনার সাহায্যে এই গোরুর গাড়ি বিক্রি করে শ্রাদ্ধের কাজকর্ম করতে হবে।' সোমনাথ বলল।

'তুমি কী বলছ খোকা! আমার বন্ধু রামলাল মারা গেছে? আহা, ওর মনে কত আশা ছিল। আমাকে কত বার বলেছে, মরার আগে ছেলেকে একবার দেখতে চাই। সেইজন্যেই হয়তো তোমাকে একবার দেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।' গঙ্গানাথ এই কথাগুলো বলতে বলতে কাঁদতে লাগল। তার কান্না দেখে সোমনাথও কাঁদল। সোমনাথের কান্না দেখে গঙ্গানাথ তার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিল। তারপর তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বউকে বলল, 'শুনছো, এই হল রামলালের ছেলে। কাল রাত্রে রামলাল আমাদের মায়া ছেড়ে স্বর্গে গেছে।' স্বামীর মুখে এই কথা শুনে গঙ্গানাথের বউ সস্নেহে সোমনাথের মাথায় হাত বুলাল।

শ্রাদ্ধের কাজকর্ম হয়ে গেল। সোমনাথের কাজকর্ম, কথাবার্তা সব কিছুই গঙ্গানাথের ভালো লাগল। গঙ্গানাথ সোমনাথের বিষয়ে স্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করল।

কিছুদিন পরে সোমনাথ চলে যেতে চাইল। চলে যাওয়ার কথা শুনে অবাক হয়ে গঙ্গানাথ বলল, 'তুমি কোথায় চলে যাবে বাবা? তোমার বাবা বেঁচে থাকতে আত্মীয়স্বজন বলো, বন্ধুবান্ধব বলো, সব কিছুই আমরা ছিলাম। এখন তোমার প্রতি আমাদের কর্তব্য আছে। তোমার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমাদের মেয়েকে বিয়ে করে সংসারে মন দাও। সারাজীবন ঘুরে বেড়ালে তোমার বাবার আত্মা কষ্ট পাবে বাবা। আমার কথা শোনো।'

সোমনাথ কিছুক্ষণ ভেবে গঙ্গানাথের মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল। বিয়ের পর সোমনাথ গঙ্গানাথের ঘরজামাই হয়ে রইল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, সোমনাথ নিজের বাপ-মায়ের কথা শুনল না। তার বাপ-মা তাকে কোনোদিন ভালো ছেলে বলেনি। কিন্তু রামলালের ওই ছেলেকেই পছন্দ হল। সোমনাথ গঙ্গানাথের মেয়েকে বিয়ে করে ঘরজামাই হিসেবে থাকতে রাজি হওয়ার পেছনে কোনো খারাপ মতলব ছিল না তো? নিজেকে রামলালের ছেলে বলে মেনে নিতে তার একটুও বাধল না কেন? ক্ষণিকের পরিচিত একটা বৃদ্ধকে বাপ হিসেবে মেনে নিতে তার সংস্কারে বা বিবেকে বাধল না। নিজের বাপ বেঁচে থাকতে অন্যকে বাপ বলতে সে পারল কী করে? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

বেতালের প্রশ্নের জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'পিতাপুত্রের সম্পর্ক, সাধারণ সম্পর্ক নয়। রক্তের সম্পর্ক। তা সত্ত্বেও যদি বনিবনা না হয় তাহলে শুধু এক পক্ষকেই দোষ দেওয়া যায় না। বাপ নিজের কাজে থাকত। ছেলে কেন যে ঘুরে বেড়াত, কী করলে যে তাকে ঠিকপথে আনা যাবে তা নিয়ে বাপ কোনোদিন গভীরভাবে ভাবেনি। আর ভাবেনি বলেই তার প্রতিকারও সঠিকভাবে করতে পারেনি। ছেলে দৈনন্দিন জীবনে যা করে তার প্রতিকার করা অত সহজ নয়। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে তাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করলে সোমনাথকে নিশ্চয় বদলানো যেত। রামলালের ছেলে রাজার প্রহরীদের ভয়ে পালিয়েছিল। বাপের উপর রাগ করে নয়। বাপেরও টান ছিল ছেলের উপর। আচার আচরণে সোমনাথকে ভালো লেগেছিল গঙ্গানাথের। তাহলে সোমনাথ নিশ্চয় ভালো ছেলে ছিল। ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পেয়েও সে বৃদ্ধকে সাহায্য করেছিল। রামলালের কোনো সম্পত্তি ছিল না। অতএব তার ছেলে বলে ঘোষণা করে ওই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার ইচ্ছাও সোমনাথের মনে ছিল না। গঙ্গানাথ চাইল রামলালের আত্মা শান্তি পাক। তার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য সোমনাথ তার মেয়েকে বিয়ে করল।'

রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ওই গাছে ফিরে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%