অক্ষয় পাত্র

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে পরিশ্রম করছ, আমার ধারণা, তুমি তার ফল পাবে। অনেকে আবার যত পরিশ্রম করে তার সহস্রগুণ ফল তোলে। ভাগ্যের ফেরে ওরা অবশ্য সেই ফল হারিয়েও ফেলে। আমার বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ আমি চিদাম্বরের কাহিনি শোনাচ্ছি। কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বেতাল কাহিনি শুরু করল:

চিদাম্বর ছিল খুব গরিব। কাঠ কেটে সে পেট চালাত। পেটভরে সে খেতে পেত না। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে সে কিছুদিন ধরে আনন্দ ও ভোগবিলাসের স্বপ্ন দেখতে লাগল।

একবার সে কাঠ কাটছিল। ওই গাছের গোড়ায় ছিল একটি সাপের ঢিপি। ঢিপি থেকে একটি সাপ বেরিয়ে এসে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। চিদাম্বর এককোপে সাপকে দু-টুকরো করে ফেলল। তৎক্ষণাৎ সেখানে এক সুপুরুষ চেহারা দেখা গেল। ওই সুপুরুষ বলল, 'চিদাম্বর, তুমি আমাকে শাপমুক্ত করেছ। এক সাধুর অভিশাপের ফলে আমার এই অবস্থা হয়েছিল। আসলে আমি এক যক্ষ। তোমার ইচ্ছেমতো বর চাও, দেব।'

চিদাম্বর যক্ষকে নমস্কার করে বলল, 'প্রভু, আমার মতো গরিব আর কী বর চাইতে পারে? আমি শুধু দু-বেলা পেটভরে খেতে পেলেই খুশি। খেটেখুটে কোনোরকমে আমার পেট চলছে। খাটলেই খাওয়া হয়তো পাওয়া যায়। কিন্তু আমি যতই খাটি না কেন আমি তো আর যক্ষলোক দেখতে পাব না। আপনি দয়া করে আমাকে আপনার লোকে নিয়ে যান। আপনার বিষয়সম্পত্তি আমি দু-চোখ ভরে দেখতে চাই।'

চিদাম্বর মাথা নেড়ে সাবধানে চলাফেরার কথা দিল। যক্ষ চিদাম্বরকে যক্ষ বানিয়ে নিজের লোকে নিয়ে গেল।

যক্ষলোকে গিয়ে চিদাম্বর স্বপ্ন দেখার মতো সব কিছু অবাক হয়ে দেখতে লাগল। ওদের ধনসম্পত্তি, ভোগবিলাস, আহার-বিহার, যক্ষকন্যাদের সাজগোজ, চলাফেরা দেখে তার মনে হল পৃথিবীতে কোটিপতিরাও ওই ধরনের জীবনযাপন করতে পারে না। সবদিকেই গানের আমেজ, গাছে গাছে ফুল আর ফলের বাহার। দেখে-শুনে চিদাম্বরের মনে হল পৃথিবীর বুকে এক হাজার বছর থাকা আর যক্ষলোকে একদিন থাকার সমান।

এমন সময় এক যক্ষিণী খিলখিল করে হাসতে হাসতে তার হাত ধরে 'বেড়াতে চল' বলল।

তার সুন্দর রূপ দেখে চিদাম্বর বলে ফেলল, 'তুমি কী সুন্দর! তোমার মতো সুন্দরী আমাদের লোকে একটি নেই।'

মুখ ফসকে চিদাম্বর এই কথাগুলো বলে ফেলল।

তৎক্ষণাৎ রেগে গিয়ে সে চিদাম্বরের হাত ছুঁড়ে ফেলে বলল, 'মূর্খ কোথাকার, কে তুমি? যক্ষের রূপ ধরে তুমি এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?' কথা বলার সময় রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল সে।

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চিদাম্বর যে যক্ষ তাকে এনেছিল তাকে খুঁজতে লাগল কিন্তু অনেক খুঁজেও তার পাত্তা পেল না। নিরুপায় হয়ে চিদাম্বর যা ঘটেছিল সব যক্ষিণীকে বলে ক্ষমা চাইল। কাকুতিমিনতি করে সে বলল, 'কী কুক্ষণে আমি বর চেয়েছিলাম। আমাকে আবার নিজের লোকে ফেরত পাঠিয়ে দিলে ভালোভাবে চলব।'

তৎক্ষণাৎ সে শান্তস্বরে বলল, 'তুমি এক যুবককে শাপমুক্ত করেছ। তাই তোমাকে আমি ক্ষমা করছি। এখন তুমি মনের মতো একটা বর চাইতে পার। বল, কী বর চাই তোমার?'

'আমি খুব গরিব। কাঠ কেটে পেট চালাই। দু-বেলা সপরিবারে যাতে খেতে পাই সেরকম বর দাও।' বলল চিদাম্বর।

যক্ষিণী তাকে একটি পাত্র দিয়ে বলল, 'এটা হল অক্ষয় পাত্র। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো খাবার চাইলে তুমি এই পাত্রে পাবে। শুধু যে তোমার পরিবারের সকলের জন্যেই তুমি খাবার পাবে তাই নয়, এখান থেকে খাবার নিয়ে তুমি অতিথি সেবাও করতে পারবে। যতটা উচিত, যা চাওয়া উচিত, তাই এই পাত্রের কাছে চাইবে। অনুচিত কিছু চাইলে তুমি আবার তোমার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। সাবধান, মনে রেখো এই কথা।'

চিদাম্বর পাত্রটি নিয়ে তার কথামতো চলতে রাজি হল। তারপর সে চোখ বুজল। কিছুক্ষণ পরে সে চোখ খুলে দেখল নিজের বাড়ির বিছানায় শুয়ে আছে। ঘুম ভাঙার পর তার মনে হল সে যা যা দেখেছে সব স্বপ্ন। কিন্তু পরক্ষণেই পাশে দেখতে পেল সেই অক্ষয় পাত্র। সে তখন ওই পাত্রকে নমস্কার করে পায়েস ও মিষ্টি চাইল। সঙ্গেসঙ্গে ওই পাত্রে পায়েস ও মিষ্টি ভরে গেল। এই দৃশ্য দেখে চিদাম্বরের মনে হল সে যা দেখেছে তা স্বপ্ন নয়, সত্য।

কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা গেল চিদাম্বরকে সমাজের সবাই সম্মান দিয়ে চলছে। তার অনেক বন্ধুও জুটে গেল। সে মাঝরাত পর্যন্ত না খেলে ওরাও খেত না। সে যখন খেত তখন তার বন্ধুরাও একসঙ্গে বসে খেত।

একদিন অনেক রাত্রে খেতে বসে ভালো-মন্দ খাওয়ার পর বন্ধুরা ওই পাত্রের কাছে মদ চাইতে বলল। চিদাম্বর কোনোদিন ওই পাত্রের কাছে মদ চায়নি। তাই প্রথমে সে চায়নি। কিন্তু বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে সে ওই পাত্রের কাছে মদ চাইল। ওরা যত মদ চেয়েছিল তত মদ অক্ষয় পাত্রের কাছে পেল। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে চিদাম্বরও মদ খেল। ওরা নেশায় চুর হয়ে নাচতে লাগল।

ওদের নাচ দেখেই চিদাম্বরের মনে পড়ে গেল যক্ষিণীদের নাচ। সে যক্ষিণীদের নাচের প্রশংসা করল। বন্ধুরা তখন তাকে চেপে ধরে বলল, 'তাহলে আমরাও যক্ষিণীদের নাচ দেখতে পাব না কেন? তুমি চাইলে অক্ষয় পাত্র নাচেরও ব্যবস্থা করে দেবে।'

চিদাম্বর পাত্রের কাছে যক্ষিণী চাইল। কিন্তু যক্ষিণী এল না। নেশায় মত্ত হয়ে লাঠি এনে সে অক্ষয় পাত্রে মারল। পাত্রটি ভেঙে গেল।

পরের দিন থেকে চিদাম্বরকে কুড়ুল নিয়ে গাছ কাটতে বেরুতে হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, যে চিদাম্বর যক্ষের কাছে খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা সমাধানের বর চাইল না সেই আবার যক্ষিণীর কাছ থেকে অক্ষয় পাত্র নিল কেন? পাত্রটিকে ভেঙে ফেলল কেন? এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই প্রশ্নের জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'চিদাম্বর কোনোদিনই বাস্তব পন্থা নেয়নি। সেইজন্যই সে যক্ষলোক দেখার বর চেয়েছিল। তারপর যক্ষিণীর অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সে দু-বেলা খাওয়ার বর চেয়েছিল। ওর একমাত্র সম্বল যে ওই অক্ষয় পাত্র সে-কথা সে ভুলে গিয়েছিল। ভুলে সে ওই পাত্রটি ভেঙে ফেলল। তাই তাকে আগের অবস্থায় চলে যেতে হল।'

রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে চলে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%