ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুর মূল্য নির্ধারণ অসম্ভব ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে। এই যে এত পরিশ্রম করছ, হয়তো এসবের মূল্য নির্ধারণ হত কিন্তু শেষপর্যন্ত কোনো কিছুরই কোনো মূল্য থাকে না। আমার কথার অর্থ আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে সংগীতপ্রেমিক রাজা কান্তিবর্মার কাহিনি শুনলে। শুনতে শুনতে হাঁটলে পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:

অনেককাল পরে একদিন রাত্রে সরস্বতীদেবী কান্তিবর্মাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলল, 'দক্ষিণের অরণ্যে গেলে একটি বটগাছ পড়বে। ওই বটগাছের নীচে একটি বীণা পড়ে আছে। সেই বীণা নিয়ে এসে গাইয়ের সামনে রাখলে কার গান যে কেমন তা বীণাই বলে দেবে। ফলে শুধু যে তুমি গাইয়ের গুণাগুণ বুঝতে পারবে তাই নয়, গাইয়েও নিজের ত্রুটি ধরতে পারবে।' বলে সরস্বতীদেবী অদৃশ্য হল।
ওটা যে স্বপ্ন ছিল তা বুঝতে কান্তিবর্মার অনেকক্ষণ লেগেছিল। স্বপ্ন হলেও রাজা কান্তিবর্মার কাছে এত সত্যের মতো লাগল যে— রাজা দক্ষিণ দিকের অরণ্যে গিয়ে সোজা হাঁটতে হাঁটতে সেই বটগাছ খুঁজতে লাগল। শেষে সত্যি সত্যি একটি বটগাছের সন্ধান পাওয়া গেল এবং তার নীচে একটি বীণাও পড়েছিল।
কান্তিবর্মা ওই বীণা নিয়ে এসে পুজো করে সংগীতসভার মাঝখানে সেটা রাখল। সেদিন থেকে যে গাইতে আসত তাকে বলে দেওয়া হত ওই বীণার বিষয়ে। গানের শেষে বীণাও গান কেমন হল তা জানিয়ে দিত। বীণার কাছে গানটাই ছিল মুখ্য। গাইয়ের রূপ বা তার গায়ের রং তার কাছে গুরুত্ব লাভ করেনি। তার চেয়ে মারাত্মক ঘটনা ঘটেছিল এই বীণা যার গান শুনে গর্দভ স্বর বলেছিল বীণা সেই গাইয়ের স্বরকে গর্দভ স্বর বলার সঙ্গে সঙ্গে সেই গাইয়ে তৎক্ষণাৎ গর্দভ হয়ে ডাকতে ডাকতে সভা ছেড়ে পালিয়ে গেল।
এই ঘটনার পর আর কোনো গাইয়ে সাহস করে গাইতে রাজি হল না। তবে টানা চার দিন পর সংগীতকলাবিদ বিরুদাক্ষ এসে বীণার সামনে বসে গাইতে লাগল। গান শুনে বীণা বলে উঠল, 'ষাঁড়ের স্বর।' তৎক্ষণাৎ সংগীতজ্ঞ ষাঁড় হয়ে সংগীতসভা ছেড়ে পালিয়ে গেল।
পরের দিন আত্মবিশ্বাস নিয়ে একজন গাইয়ে সভায় গান গাইতে বসল। গান শুনে বীণা বলল, 'কুকুরের স্বর।' তৎক্ষণাৎ লোকটা কুকুর হয়ে সভা ছেড়ে পালিয়ে গেল। এসব দেখে রাজকুমারী কলকণ্ঠী নিজেই একদিন বীণার সামনে গাইতে বসল। রাজকুমারীর গান শেষ হতেই বীণা বলে উঠল কোকিলকণ্ঠী। তৎক্ষণাৎ রাজকুমারী কোকিলের রূপ ধরে কু-উ কু-উ ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল।

যেই রাজকুমারী কোকিল হয়ে উড়ে গেল অমনি সবাই ভীষণ রেগে গেল। সবাই বীণার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলল। তাতেও রাজার রাগ কমল না। ওই টুকরোগুলো জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দিল। বীণা পুড়ে ছাই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাধা, ষাঁড়, কুকুর, কোকিল প্রত্যেকে আগের রূপ পেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, স্বয়ং সরস্বতী যে বীণার সন্ধান দিল সেই বীণার মাধ্যমে রাজার তো কোনো উপকার হলই না উপরন্তু ওই বীণার ফলে অনেকের অপকার হল। উপকার করার ইচ্ছাই যখন ছিল না তখন সরস্বতী স্বপ্নে এসে সেই বীণার সন্ধান কেন দিল? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'কান্তিবর্মাকে সংগীতপ্রেমী বলার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। নিত্যনতুন গাইয়েকে আনিয়ে সভায় গাওয়ানোর কোনো অর্থ ছিল না। বীণার প্রাপ্তির ফলে রসজ্ঞের কান যে গান শোনে এই বোধ রাজার হল। রাজার মধ্যে এই বোধ হওয়াতেই বীণার সার্থকতা।'
এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন