সম্পর্ক

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, সবসময় নিজেকে বিচার করতে সবাই পারে না। ধীরে-সুস্থে বসে নিজের মন যে কী চায় তা ঠিক বুঝতে পারে না। এক একজন লোক শত্রুকে শেষ করার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করে, যেকোনো বিপদের ঝুঁকি নেয়— এই প্রসঙ্গে দুই ভাইয়ের কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—

নগেন ও গঙ্গাধর দুই ভাই। দু-জনেই চাষি। কিন্তু ওরা যেন আজন্ম পরস্পরের শত্রু। পরস্পরের প্রতি ওরা ঈর্ষাভাব পোষণ করত। মাঝে মাঝে ওদের একপক্ষের বিদ্বেষ বেড়ে গিয়ে ভয়ংকর আকার ধারণ করত। সেইদিনই ওরা যেন একজনকে শেষ করে অন্যজন জল খাবে।

একবার কিছু পশু পাহাড়ের উপর চরে নীচে নেমে আসছিল। নামতে নামতে নগেনের ক্ষেতে কয়েকটা ঢুকে পড়েছিল। এই ঘটনা ঘটেছিল গঙ্গাধরের চোখের সামনে। সে মনে মনে খুব খুশি হয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে রাখাল ছুটতে ছুটতে এসে ওই পশুগুলোকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। ব্যাপারটা শুনেই নগেন রাখালটিকে ধরে মারল। ওর মারার পর গঙ্গাধর গ্রামবাসীকে বলল, 'আমাদের বয়সি লোক যদি ওইটুকু ছেলেকে মারে তবে লোকে কী বলবে? মূক পশু যদি কারও ক্ষেতে ঢুকে পড়ে তাহলে রাখাল কী করবে? ছেলেটার তো কোনো দোষ ছিল না। সে যে মুহূর্তে লক্ষ করেছে সেই মুহূর্তে ছুটে গিয়ে পশুগুলোকে অন্যদিকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ও যদি ছুটে না আসত তাহলে তো ক্ষেত সাবাড় হয়ে যেত। রাখাল ছেলেটা নেহাত গরিব মানুষ, ওর হয়ে দু-চার কথা বলতে কেউ নেই তাই ওকে ধরে নগেন মেরে দিল। যার কেউ নেই তার ভগবান আছে। একদিন না একদিন এর ফল অবশ্যই ভোগ করতেই হবে।'

নগেন জানতে পারল যে তার ভাই গঙ্গাধর তার বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের কাছে প্রচার করেছে। শুনেই সে তার উপর ভীষণ রেগে গেল।

এই ঘটনার কিছুদিন পরে গাড়ি নামছিল। হঠাৎ এক বলদের পা হড়কে গেল। সে পড়ে গেল। গঙ্গাধর ওখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে লোকজনকে ডাকতে লাগল। সবাই জানতে পারল বলদ চোট পেয়েছে।

এই খবর শুনে নগেন খুব খুশি হল। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। ডেকে ডেকে যাকে সামনে পেল তাকেই বলল, 'পাপ ঢাকা থাকে না। পাপীদের ফলভোগ করতেই হয়। যতই হোক যারা মিথ্যে কথা বলে তাদের যেকোনোভাবে ভগবান শাস্তি দেন। তাদের অহংকার চূর্ণ করাই ভগবানের কাজ।'

নগেন এই কথা প্রচার করেছে শুনে গঙ্গাধর তেলে-বেগুনে চটে গেল।

নগেন এবং গঙ্গাধরের বউরা দুই ভাইয়ের মধ্যেকার অবস্থা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল। এমনিতেই জায়েদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকে না। তার ওপর দুই ভাইয়ের অবস্থা দেখে ওরা পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষ ওগরাতে লাগল। এর কথা ওকে লাগাত আবার ওর কথা একে লাগাত।

একবার গঙ্গাধরের স্ত্রী একটা হার গড়িয়ে, গলায় পরে গাঁয়ের মেয়েদের ডেকে ডেকে বলতে লাগল, 'টাকা থাকলেই গহনা পরার ভাগ্য সকলের থাকে না। যার ভাগ্যে ভোগ করার আছে সেই ভোগ করতে পারে।'

গঙ্গাধরের স্ত্রীর কথা মুখে মুখে ঘুরে নগেনের স্ত্রীর কানে এল। কানে যত কথা এল সেই কথাগুলো আরও বাড়িয়ে নগেনকে সে বলল, 'আমাদের কীসের অভাব? তবু আমাকে দেখে মনে হবে ভিখিরির ঘরের বউ। তোমার যদি একটু মানসম্মান থাকে তাহলে আমার জন্যে দু-একদিনের মধ্যে ওর চেয়ে ভালো একটা হার গড়িয়ে দেবে। আমি কীসের জন্য অন্যের কাছে খাটো হতে যাব?'

নগেন স্ত্রীর কথায় উত্তেজিত হয়ে নিজের স্ত্রীর জন্য আরও দামি গহনা গড়িয়ে দিল। নগেনের স্ত্রী গহনা পরে গাঁয়ের মেয়েদের বলল, 'গহনা থাকলেই যে বের করতে হবে তার কী মানে আছে? সবাই তো ভালো চোখে দেখে না। আর দেখে না বলেই ভালো জিনিসও পরি না।' এই কথা ঘুরতে ঘুরতে গঙ্গাধরের স্ত্রীর কানে গেল। সে শুনে চটে গিয়ে যাকে পেল তাকেই বলল, 'যে যাই ইচ্ছে পরুক, আমার চোখ টাটাবে কেন? আমি ভালো চোখে দেখব না কেন? ভালো জিনিস সবাই ভালো চোখে দেখে। তবে খারাপ জিনিস পরে কেউ যদি ভালো বলে প্রচার করতে চায় তাহলে আমি নিরুপায়। আর যাই হোক নিজের ঢাক নিজে অত বেশি পেটানো উচিত নয়।'

এ ধরনের ছোটোখাটো খোঁচাখুঁচি লেগেই থাকত। কোনো পরিস্থিতি এক জায়গায় থাকতে পারে না। তাই ছোটো ঝগড়া বাড়তে বাড়তে একদিন ভয়ংকর রূপ ধারণ করল। দুই জায়ে মিলে প্রকাশ্যে গালাগালি ও চুলোচুলি করল। ওদিকে ভাইরাও চুপচাপ বসে রইল না। তারাও প্রকাশ্যে মারামারি শুরু করে দিল।

এই ঘটনার কিছুদিন পরে টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হল। গঙ্গাধরের বাড়ির দক্ষিণ দিকের দেওয়াল পড়ে গেল। গঙ্গাধর উঠে ঘরে যাতে জল না-পড়ে তার ব্যবস্থা করছিল। এমন সময় সারা আকাশ আলোকিত হয়ে উঠল বিদ্যুতের আলোয়। পরক্ষণেই শব্দ হল।

বাড়ির ভেতর থেকে গঙ্গাধরের স্ত্রী চিৎকার করে স্বামীকে ডাকল। কিন্তু স্বামীর সাড়া পেল না। সে তৎক্ষণাৎ পাশের বাড়িতে ঢুকে নগেনের বউকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল, 'দিদি, তোমার ঠাকুরপোকে বাঁচাও!'

কিছুক্ষণের জন্য নগেনের বউ থতমত খেয়ে গেল। পরক্ষণেই সে নগেনকে বলল, 'দেখছ কী? তাড়াতাড়ি আলো নিয়ে গিয়ে দেখো তোমার ভাইয়ের কী হয়েছে!'

তারপর তিন জনে মিলে আলো নিয়ে ঘটনার স্থলে এল। গঙ্গাধর অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। নগেন তাকে তুলে নিয়ে, নিজের ঘরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। সেই রাত্রির অন্ধকারে নগেন বৈদ্যকে ডেকে আনতে গেল। বৈদ্য এসে ওষুধ দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে গঙ্গাধরের জ্ঞান ফিরল।

এই ঘটনার পর প্রতিবেশীদের মনে কৌতূহল জাগল, ওদের সম্পর্ক কোনদিকে গড়ায়। কিন্তু তারপর অনেকদিন কেটে গেল। প্রতিবেশীরা আর ওদের ঝগড়া শোনেনি। ওরা যে প্রত্যাশা করেছিল বরং তাই ঘটল। গঙ্গাধরের বউ পাড়ার লোকজনকে বলতে লাগল, 'সেদিন রাত্রে ওর দাদা চেষ্টা না করলে আমার সিঁথির সিঁদুর মুছে যেত।' এই কথাই সে জনে জনে ধরে ধরে বলতে লাগল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, ওই দুই ভাইয়ের মধ্যে শেষপর্যন্ত কী সম্পর্ক ছিল? আত্মীয়তা না শত্রুতা? আগে তো একের ক্ষতি হলে অন্যে খুশি হত। সেবারে ভাইয়ের বিপদে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগেন ছুটে গেল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'মান-অভিমান, বিদ্বেষ মানুষের মধ্যে থাকে। সম্পর্ক থাকলেই এগুলোও থাকবে। পরস্পর পরস্পরের প্রতি যদি নির্লিপ্ত থাকে তাহলে কেউ কারও প্রতি টান অনুভব করে না। অনেক সময় ভালোবাসার উৎস থেকে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। সেই ঝড়বৃষ্টির রাত্রে যদি ছোটো ভাই মরে যেত তাহলে নগেন তার ভাইকে চিরদিনের মতো হারাত। সেইজন্য জীবন-মৃত্যুর চরম মুহূর্তে ছোটো ভাইকে বাঁচানোর জন্য ছুটে গেল। ক্রোধের চেয়ে ভালোবাসার শক্তি অনেক বেশি। যে উপকৃত হয় সে ভুলে গেলেও যে উপকার করে সে কিন্তু ভুলতে পারে না।'

রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%