ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যেভাবে পরিশ্রম করছ তা লক্ষ্যণীয়। তোমার এই পরিশ্রম যদি নিজের প্রতিষ্ঠা এবং সুনাম বৃদ্ধির জন্যই হয়ে থাকে তাহলে এর কোনো মূল্য নেই। খ্যাতির সঙ্গে প্রয়াসের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার এই কথা যে কতখানি সত্য তার প্রমাণ পাবে মুকুন্দের কাহিনি শুনলে। শুনতে শুনতে পথ হাঁটলে আমার ধারণা তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করে দিল—
মুকুন্দ ছিল কোনো এক গ্রামের চাষি পরিবারের ছেলে। চাষি পরিবারের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও সে ছিল মেধাবী। তার লেখাপড়ার দিকে খুব ঝোঁক ছিল। একবার যা পড়ত তা দীর্ঘকাল মনে রাখতে পারত। এত লেখাপড়া করেও তাকে কিন্তু চাষির জীবনযাপন করতে হয়েছে।
সে অতি সাধারণ গ্রামের ছেলে হলেও তার গ্রামের নাম কিন্তু ইতিহাস প্রসিদ্ধ ছিল। সেখানে এক সময় যে অনেক কিছু ছিল তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেইসব নিদর্শনগুলো দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক আসত। ওইসব দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে মুকুন্দ ভেবেছিল, 'এঁরা বিখ্যাত লোক। কিন্তু এঁদের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে এঁদের চেয়ে আমি কোনো অংশে কম নই। এঁরা যদি এত কম জেনে এত বেশি নাম করে থাকেন তাহলে আমিই বা বিখ্যাত হতে পারব না কেন?' এই কথা সে যে শুধু ভেবেছিল তাই নয়, তার এই মনোভাব কয়েক জনের কাছে প্রকাশও করেছিল।

বৃদ্ধের এই কথা মুকুন্দের মনে ধরল। সে বাবার সম্মতি ছাড়াই নগরের দিকে রওনা দিল। তার যাওয়ার পথে একটা বন পড়ল। একা একা ওই পথে যাতায়াত করতে অনেকেই ভয় পায়। কিন্তু মুকুন্দের মনে সেই ভয় ঢুকল না। সে ওই পথেই হাঁটতে লাগল।
বনের মাঝপথে একটা চোর তার পথ আগলে দাঁড়াল। মুকুন্দ তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে নিজের পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে চোর ভাবল, 'আমি গত দশ বছর ধরে এখানে চুরি করছি। আমার নাম শুনেই লোকের পিলে চমকে যায়, আর এই লোকটা আমাকে কোনোরকম তোয়াক্কা না-করে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল! এ তো বড়ো আশ্চর্যের কথা!' সে এই কথা ভেবে মুকুন্দকে বলল, 'ভাই, তোমার মতো সাহসী লোক আমি জীবনে দেখিনি।'
লোকটা যে একটা নামকরা চোর এবং সে যে একটা নামকরা চোরকে জব্দ করেছে এটুকু জানতে পেরে মুকুন্দের খুব গর্ব হল। চোরের নাম ছিল বীরেন্দ্র।
'দেখো ভাই, আমি নাম করতে চাই। তুমি যেভাবে বিখ্যাত হয়েছ আমাকেও সেইভাবে বিখ্যাত করে দাও। আমার মূল উদ্দেশ্য হল খ্যাতি অর্জন করা। আমি আর কিছু চাই না।' মুকুন্দ বলল।
তার কথা শুনে খুব খুশি হয়ে বীরেন্দ্র বলল, 'তাহলে চলো আমরা দু-জনে মিলে নগরে যাই। নগরে আমি তোমাকে চুরি বিদ্যা শেখাব।'
বীরেন্দ্র এবং মুকুন্দ নগরে পৌঁছাল। ঘুরে ঘুরে বীরেন্দ্র ঠিক করল এক বাড়িতে চুরি করবে। রাত্রে দু-জনে মিলে গুটি গুটি পা পা এগিয়ে ওই বাড়ির কাছে পৌঁছাল। বাড়ির দেয়াল টপকে উঠোনে দাঁড়াল। তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে বীরেন্দ্র। মুকুন্দ তার প্রতিটি কাজ গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বীরেন্দ্র মুকুন্দকে নিয়ে যে ঘরে সিন্দুক ছিল সেই ঘরে পৌঁছাল। সিন্দুকে যত টাকাপয়সা ছিল সব খুলে একটা পোঁটলায় বেঁধে নিল। তারপর বীরেন্দ্র চারদিকে ভালো করে দেখে নিয়ে, পোঁটলা নিয়ে আস্তে আস্তে সেখান থেকে তখনই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে লাগল। ওই ঘর থেকে বেরোনোর সময় দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা একটা রমণীর ছবি নজরে পড়তেই বীরেন্দ্র চমকে উঠল। সেই ছবি দেখে সে পা টিপে টিপে আর একটু এগিয়ে পাশের ঘরে ঘুমন্ত মানুষের দিকে তাকাল। তারপর সে ওই পোঁটলাটা সেখানেই রেখে দিয়ে খুব সাবধানে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
'এটা কি ধরনের চুরি? এত কষ্ট করে ঘরে ঢুকলাম, সিন্দুকের টাকাপয়সা বের করলাম, পোঁটলা বাঁধলাম, শেষে কিনা সব ফেলে রেখে চলে আসতে হল! তাহলে না ঢোকাই উচিত ছিল।' মুকুন্দ বিরক্ত হয়ে বলল।
'তাহলে বলি শোনো, একবার আমি যেকোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে বনে পড়েছিলাম। এক মহিলা ওই বনপথ দিয়ে গাড়ি করে যাচ্ছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে সে গাড়িতে তুলে বসিয়ে তার বাপের বাড়িতে নিয়ে গেল। যতদূর মনে হচ্ছে এই বাড়ি হল ওই মহিলার স্বামীর। যে মহিলা একসময় আমাকে বাঁচিয়েছে, যার জন্য আমি প্রাণে বেঁচেছি তাকে কি আমি কখনো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারি। তাই সব কিছু সেখানে ফেলে রেখে আমি চলে এসেছি। আমি চোর হলেও আমার একটা নিয়ম আছে, বিবেক আছে।' বীরেন্দ্র বলল।
মুকুন্দ ভাবল, বীরেন্দ্রের কাছে শেখার কিছু নেই। সে তাকে ছেড়ে চলে গেল।
তারপর মুকুন্দ একা একা নগরে ঘুরতে লাগল। কোথায় থাকবে, কী খাবে ঠিক নেই। সেই সময় তার সঙ্গে পরিচয় হল ওই নগরের শ্রেষ্ঠ বিচারক শরৎচন্দ্রের।
বিচারকের একটা অভ্যেস ছিল একা খেতে না-বসা। প্রত্যেকদিন উনি একজন অতিথিকে নিয়ে বসতেন। সেদিন মুকুন্দকে অতিথি হিসেবে পেল ওই বিচারক। মুকুন্দের কথা শুনে সে বলল, 'তুমি যতদিন না এই নগরে স্থির হয়ে কোথাও থাকছ, ততদিন আমার বাড়িতে থাকতে পারো।'
ওই নগরে চক্রধর নামে এক বীর ছিল। ওই বীরকে নাকি কেউ পরাজিত করতে পারে না। মুকুন্দের ইচ্ছা করল ওই বীরকে পরাজিত করে খ্যাতি অর্জন করা।
চক্রধর প্রত্যেকদিন সন্ধ্যের সময়ে নিজের উদ্যানে একা ঘুরতে ভালোবাসে। একবার মুকুন্দ অত্যন্ত সন্তর্পণে এবং গোপনে উদ্যানে ঢুকে চক্রধরের সামনে অতর্কিতে তার তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চক্রধর প্রশ্ন করল, 'কে তুমি?'

'তোমাকে পরাজিত করে আমি খ্যাতি অর্জন করতে চাই।' মুকুন্দ বলল।
'সেটাই যদি তোমার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে তুমি গোপনে এই জনমানবশূন্য স্থানে এলে কেন?' চক্রধর বলল।
'আমি তোমাকে হারিয়ে দিতে চাই। কিন্তু তোমার কাছে হেরে যাওয়ার ভয়ও তো আছে। তাই এসেছি।' মুকুন্দ বলল।
তারপর চক্রধর নিজের তরবারি বের করল। কিছুক্ষণের মধ্যে মুকুন্দ চক্রধরকে পরাজিত করল। পরাজিত হয়ে চক্রধর বলল, 'ভাই, তুমি যে ধরনের অস্ত্র চালনা জানো তাতে মনে হচ্ছে তুমি আমার চেয়ে অনেক বড়ো এবং ক্ষমতাবান। আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। তোমার কাছে আমি অস্ত্র চালনা শিখতে চাই।'
'তোমাকে অস্ত্র চালনা শিখিয়ে আমার কী লাভ?' মুকুন্দ বলল।
'তুমি আমাকে অস্ত্রচালনা শেখাবে, আমি তোমাকে দৈনিক একশোটি স্বর্ণমুদ্রা দেব।' চক্রধর বলল।
দু-মাসের মধ্যে চক্রধর মুকুন্দের কাছ থেকে সমস্ত রকমের অস্ত্রশিক্ষা শিখে নিল। মুকুন্দের অস্ত্রচালনার শেখানোর চাকরি চলে গেল। কিন্তু মুকুন্দ দমে যায়নি। কারণ তার কাছে ছ-হাজার স্বর্ণমুদ্রা ছিল। মুকুন্দ ভাবল, এই ছ-হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ব্যাবসা করলে ভালো হয়। সে এক রত্নব্যবসায়ীর সঙ্গে আলোচনা করল। রত্ন ব্যবসায়ীর নাম ছিল রত্নেশ্বর। নগরে তার নাম ডাক ছিল। মুক্তোর ব্যাবসা করে মুকুন্দ এক বছরের মধ্যে লক্ষাধিপতি হয়ে গেল।
রত্নেশ্বর মুকুন্দকে বলল, 'যা রোজগার করবে তার দশভাগের একভাগ দান করবে।'
কিন্তু মুকুন্দ তার কথা কানে তুলল না। ব্যাবসা ছেড়ে সে গানের চর্চা করল। কিন্তু কোনোটাতেই নাম করতে পারল না।
হঠাৎ মুকুন্দ নগরে তার বাবাকে দেখে বলল, 'কী ব্যাপার, তুমি এখানে?'
'আর বলিস কেন? এবছর আমাদের ক্ষেতে তিনগুণ ফসল হওয়াতে রাজা পুরস্কার দেওয়ার জন্য আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।' মুকুন্দের বাবা বলল।
মুকুন্দ বুঝল এতকাল সে যা ভেবেছে তা ভুল। খ্যাতি অর্জনের জন্য নগরে আসার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, মুকুন্দের খ্যাতিলাভের ইচ্ছা ব্যর্থ হল কেন? তার কি সামর্থ্য ছিল না? বাবাকে দেখেই কি তার বাড়ি ফেরার ইচ্ছা করল? নগরের সব ব্যাপারেই তো সে এগিয়ে গেল, তা সত্ত্বেও সে বিখ্যাত হল না কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'মুকুন্দ ভেবেছিল, খ্যাতি অর্জনের জন্য কয়েকটি ক্ষেত্র আছে। ওই ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে নাম করা যায় না। সে ইচ্ছে করলে যেকোনো ক্ষেত্রে টিকে থেকে নাম করতে পারত। কিন্তু তার মধ্যে সেই ধৈর্য ছিল না। বাপ যখন রাজার কাছে পুরস্কার নিতে এল তখন সে বুঝতে পারল খ্যাতি অর্জনের জন্য যেকোনো একটি ক্ষেত্রই যথেষ্ট। তাই সে নিজের গ্রামে ফিরে গেল।'
রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন