ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি এইভাবে যে পরিশ্রম করছো, এই পরিশ্রম যদি তুমি তোমার বন্ধুর জন্যে করে থাক তাহলে আমি বলব সব বন্ধু যে তোমার শ্রমের মর্যাদা দেবে এমন নাও হতে পারে। আমার কথার উদাহরণস্বরূপ আমি তোমাকে কুমারবর্মার কাহিনি বলব। সেই কাহিনি শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
কৌশাম্বি নগরে কুমারবর্মা ছিল এক ক্ষত্রিয় যুবক। যোদ্ধা হিসেবে তার নাম ছিল। সে টাকার পরিবর্তে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ করে অনেক টাকা করেছিল। অনেক দূর দূর দেশে সে চলে গিয়েছিল। টাকা হওয়ার পর হঠাৎ একদিন তার ইচ্ছা জাগল দেশে ফেরার। সে দেশে ফিরে মনের মতো মেয়ে দেখে বিয়ে করবে— এই ধরনের পরিকল্পনা করে বাড়িমুখো হল। পথে কুমারবর্মার সঙ্গে ধনগুপ্ত নামক এক ব্যবসায়ীর দেখা হল। তারও দেশ ছিল কৌশাম্বি। সে ছিল কোটিপতি। তার সঙ্গে ছিল ছেলে নন্দগুপ্ত। নন্দগুপ্ত সেই প্রথম বাপের সঙ্গে বেরিয়েছিল বিভিন্ন দেশের ব্যাবসা বুঝতে।
নন্দগুপ্ত এই প্রথম বেরিয়েছে, বেশি দেশ ঘুরলে তার শরীর খারাপ হতে পারে এই ভয়ে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে ছেলেকে নিয়ে ফিরছিল ধনগুপ্ত।
কুমারবর্মাকে পেয়ে ধনগুপ্ত ভাবল, এর সঙ্গে ছেলেকে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়। কিছুক্ষণ ভেবে সে কুমারবর্মার উপর তার ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়ে দিল। নন্দগুপ্তের হাতে কিছু টাকাও দিল ধনগুপ্ত। সে ব্যাবসা করতে অন্য দেশে চলে গেল।
কুমারবর্মা ও নন্দগুপ্ত কৌশাম্বির দিকে এগিয়ে চলেছে। পথে পড়ল একটি নগর। ওই নগরে মুক্তো ছিল খুব সস্তা। নন্দর মাথায় একটা বুদ্ধি জাগল, এখানে মুক্তো কিনে কৌশাম্বিতে বিক্রি করলে ভালো পয়সা পাওয়া যাবে। কিছুক্ষণ পরে কুমারবর্মাকে নিয়ে নন্দ গেল মুক্তোর দোকানে। কাছে যে টাকাপয়সা ছিল তা দিয়ে নন্দ চারটে মুক্তো কিনল।

অনেকক্ষণ ধরে এই কথা বলাতে কুমারবর্মা নন্দকে বলল, 'তোমার যদি অত টাকার দরকার হয় আমার কাছ থেকে নিতে পারো। আর যাই হোক, পথে তো আমার এত টাকা লাগছে না। এখন নিয়ে, কৌশাম্বি গিয়ে মুক্তো বিক্রি করে, আমার টাকা আমাকে দিলেই হবে।'
কুমারবর্মার কাছে টাকাপয়সা নিয়ে নন্দগুপ্ত আরও চারটে মুক্তো কিনল। তারপর ওরা রওনা দিল।
আর মাত্র একদিন বাকি। আর একটি দিন হাঁটার পর ওরা পৌঁছে যাবে কৌশাম্বি। শুধু মাঝে একটি অরণ্য। যা ভেবেছিল তা হল না। ওই রাত ওদের অরণ্যে কাটাতে হল।
ওই অরণ্যে যে চোরডাকাত আছে তা নন্দগুপ্তের জানা ছিল। জানা থাকার ফলেই নন্দ রাত কাটানোর কথা ভাবতেই ভয়ে কেঁপে উঠল। সে ভাবল, 'যদি ডাকাত এসে তার মুক্তোগুলো কেড়ে নেয় তাহলে নিজের টাকা তো জলে যাবেই; উপরন্তু কুমারবর্মার কাছে ঋণী থাকতে হবে। একটা ভরসা অবশ্য আছে, কুমারবর্মার কাছে তরবারি আছে। কিন্তু যদি ডাকাত পড়ে তখন সে একা কী করতে পারে!
ওর টাকায় যে মুক্তোগুলো কিনেছি সেগুলো ওকে দিয়ে দিই। কৌশাম্বিতে এসে ও যদি লাভ করে করুক। এর ফলে আর যাই হোক দুটো উপকার হবে। আমি ওর কাছে ঋণী থাকব না আর ও ডাকাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না-করে পারবে না।'
এইসব কথা ভেবে সে কুমারবর্মাকে বলল, 'বর্মা, তোমার টাকায় আমি লাভ করব এটা আমার ভালো লাগছে না। তাই বলছি, তোমার টাকায় যে মুক্তোগুলো কেনা হয়েছে সেই মুক্তোগুলো তুমি নিয়ে নাও। ওগুলো তুমি কৌশাম্বিতে বিক্রি করে অনেক টাকা লাভ করতে পারবে। সত্যি কথা বলতে কি ঝোঁকের মাথায় তখন টাকা নিয়েছি বটে কিন্তু মনে বড়ো অশান্তি হচ্ছে।' বলে ওই চারটে মুক্তো দিয়ে দিল।
কুমারবর্মা অনেক দেশ ঘুরে বহু লোককে দেখেছে। নন্দগুপ্ত কেন যে এই ধরনের কথা বলছে, উদ্দেশ্য যে কী তা বুঝতে তার একটুও সময় লাগেনি। সে সোজা নন্দকে বলল, 'দেখো নন্দ, এই মুক্তোগুলো আমার কাছে থাকায় আমার মনে ডাকাতদের ভয় ঢুকেছে। এখন থেকে তুমি নিজেকে বাঁচাও, আমি নিজেকে বাঁচাব। তোমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আর আমি নিতে পারছি না।' বলে সে ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে যেতে গেল।
নন্দগুপ্ত ভীষণ ভয় পেয়ে কাতরভাবে বলল, 'আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।'
সঙ্গেসঙ্গে কুমারবর্মা বলল, 'একটা শর্তে আমি তোমাকে কৌশাম্বি নিয়ে যেতে পারি। শর্তটা হল তোমার কাছে এখন যে চারটে মুক্তো আছে তার থেকে দুটো দিতে হবে।'
নন্দ সঙ্গেসঙ্গে রাজি হয়ে গেল। সেই রাত্রে কোনো বিপদ ঘটেনি। পরদিন ভোরে রওনা দিয়ে দিনের শেষে, সন্ধের আগে ওরা কৌশাম্বি নগরে পৌঁছাল। নন্দ নিজের কথানুযায়ী তার কাছে যে চারটি মুক্তো ছিল তার থেকে দুটো কুমারবর্মাকে দিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, কুমারবর্মার এই ধরনের আচরণ সমর্থন করা যায়? নন্দগুপ্ত যতই হোক ধনগুপ্তের ছেলে। তার মধ্যে লোভ প্রকটভাবে থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে উচিত হয়েছে এতটা স্বার্থপর হওয়া? নন্দ এমন কোনো অপরাধ করেনি, তার টাকায় যে মুক্তোগুলো কিনেছিল ডাকাতের ভয়ে সেগুলো তাকে ফেরত দিল। এই ঘটনায় কুমারবর্মা হঠাৎ ঘোড়ার পিঠে চেপে দ্রুত চলে যাওয়ার তাল করল কেন? আবার নন্দর চারটে মুক্তো থেকে দুটো নিলোই-বা কেন? এটা কি তার পক্ষে উচিত কাজ হয়েছে? তাহলে কি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে কুমারবর্মা নন্দকে টাকা ধার দিয়েছিল? তার সেই উদারতার মর্যাদা সে কি, শেষপর্যন্ত, নিজেও দিতে পেরেছে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না-দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'যা শুনলাম তাতে নন্দ বা কুমারবর্মা কাউকেই যেমন প্রশংসা করতে পারছি না, তেমনি নিন্দাও করতে পারছি না। যে যার চরিত্র অনুযায়ী কাজ করে গেছে। কুমারবর্মা ওই অবস্থায় ধার দেওয়াতে তাকে প্রশংসা করতে পারছি না, কারণ সে তো বলেই দিয়েছে যে পথে তার টাকা লাগছে না, ফিরে গিয়ে লাগছে। কুমারবর্মার মনে লাভ করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না, তা যদি থাকত তাহলে সে নিজেই নন্দর দেখাদেখি কিছু মুক্তো কিনে ফেলত। আসলে ওই অরণ্যপথে নন্দ যেভাবে কপটতার আশ্রয় নিল তাতে কুমারবর্মার বিরক্তি জাগল। এই অবস্থায় একজন পেশাদার যোদ্ধা যা করতে পারে কুমারবর্মা তাই করল। নন্দর মনে যে সংশয় জেগেছিল, ডাকাত পড়লে কুমারবর্মা তাকে বাঁচাবে কিনা, এই সংশয় তার মনে বিরক্তি জাগাল। নন্দ যা ভেবেছে তা তার পক্ষে স্বাভাবিক। তার ধারণা ছিল ডাকাতরা আক্রমণ করলে কুমারবর্মা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। ডাকাতরা তার কাছে টাকাপয়সা না-পেয়ে তাকে ধরেই ছেড়ে দেবে। তার কাছে যা ছিল সব তো ধার নেওয়া হয়ে গেছে। এই অবস্থায় কুমারবর্মা ডাকাতদের বিরুদ্ধে কিছুই করবে না। অগত্যা তাকেই মার খেতে হবে। সে ব্যাবসাদারের ছেলে, সে শিখেছে বিনা স্বার্থে কেউ কারও প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে আসে না। কুমারবর্মা বিভিন্ন দেশ ঘুরে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তার বাস্তবজ্ঞান নন্দর তুলনায় অনেক বেশি। সে নন্দর মতো বেশি কথা বলে না। যা করার ভেবে নিয়ে করে ফেলে। অপরপক্ষে নন্দ যা বুঝেছে তাই করেছে।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন