ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছোড়বান্দা বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি স্বেচ্ছায় এই পরিশ্রম করছ কি না জানি না। তবে অনেকে স্বেচ্ছায় বিপদের বোঝা কাঁধে তুলে নেয়। হাতের কাছে লাভের সুযোগ এলেও ওরা তা পায়ে ঠেলে দেয়। এই ধরনের এক বোকার কাহিনি বলব। তার নাম চন্দ্রহাস। আমার কাহিনি শুনলে পথ চলার পরিশ্রম কমে যাবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে রবিবর্মা ও শিববর্মা নামে দু-জন রাজা পাশাপাশি ছিল। ওই দুটো দেশের মধ্যে যখন-তখন ঝগড়া বিবাদ এমনকী যুদ্ধও হত। আবার দু-জনের মধ্যে কোনো রাজাই যোগ্য ছিল না।
রবিবর্মার মেয়ের স্বয়ংবর সভায় আমন্ত্রণ করে ডেকে পাঠাল শিববর্মার ছেলে চন্দ্রহাসকে। বিশেষ দূতের মাধ্যমে রবিবর্মা তাকে আমন্ত্রণ জানাল। দূত আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলে এল। তার কথার মূল সুর ছিল, যদি এর ফলে উভয় দেশের রাজার মধ্যে আত্মীয়তা স্থাপিত হয় তাহলে ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল হবে।
এই কথা শুনে শিববর্মা খুব খুশি হল। কারণ তার ছিল একটি মাত্র ছেলে। আবার রবিবর্মার ছিল একটি মেয়ে। চন্দ্রহাসের সঙ্গে যদি রবিবর্মার বিয়ে সত্যি সত্যি হয় তাহলে ভবিষ্যতে দুটো দেশেরই রাজা হবে চন্দ্রহাস। চোদ্দোপুরুষ যুদ্ধ করে যা পারেনি চন্দ্রহাস রবিবর্মার মেয়েকে বিয়ে করে তাই পারবে।

বনপথে দুই বন্ধুতে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ ওরা শিকারিদের খপ্পরে পড়ে গেল। ওরা তাদের বন্দি করে সর্দারের কাছে নিয়ে গেল।
সুবুদ্ধি ওদের সর্দারকে বুঝিয়ে বলল, ওরা কোথায় কোন উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। ওদের কথায় কান না দিয়ে সর্দার বলল, 'তোমরা যেই হও, যে উদ্দেশ্যে যেখানেই যাও, আমাদের খপ্পরে যখন পড়ে গেছ তখন আমাদের দেবীর কাছে বলি দেবই। আর যদি বলি হতে না চাও আমাদের কুস্তিগিরের সঙ্গে লড়তে হবে। লড়ে যদি জিতে যাও তারপর এখান থেকে যেতে পারবে।'
'ঠিক আছে আমি তোমাদের ওই বীরপুরুষের সঙ্গে লড়ব।' বলল চন্দ্রহাস।
'ওরে, এদের চোখ খুলে দে। এরা ঘুরে বেড়াক। কাল সকালে লড়াই হবে।' বলল সর্দার।
শুধু যে চন্দ্রহাস ও সুবুদ্ধিকে বেড়াতে দিল তাই নয় সেই রাত্রে ওদের দু-জনের ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করল সর্দার।
খাওয়া-দাওয়ার পর শুয়ে সুবুদ্ধি চন্দ্রহাসকে বলল, 'চন্দ্রহাস, আমি লক্ষ করেছি কেউ আমাদের পাহারা দিচ্ছে না। চল পালাই। তুমি জানো না, এরা এই বনেই থাকে। এদের গায়ে অনেক জোর। এদের সঙ্গে লড়ে তুমি কোনোক্রমেই জিততে পারবে না।'
'কাপুরুষের মতো পালানোর চেয়ে বীরের হাতে মরা ভালো। ওরা আমাদের বিশ্বাস করে ছেড়েছে বলে ওদের আমরা ধোকা দিয়ে পালাব? আমার তো মনে হচ্ছে আমাদের আর কোনো ভয় নেই।' চন্দ্রহাস বলল।
পরের দিন সকালে যথাসময়ে চন্দ্রহাস ও একজন বীর শিকারির মধ্যে লড়াই শুরু হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চন্দ্রহাস জয়ী হল। তৎক্ষণাৎ সর্দার চন্দ্রহাস ও সুবুদ্ধিকে সসম্মানে বিদায় দিল।

রবিবর্মা চন্দ্রহাসকে দেখে খুব খুশি হল। স্বয়ংবর সভায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা ছিল। রবিবর্মা চন্দ্রহাসকে বলল, 'কাল তোমার এবং কমলনাথের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে। যে জয়ী হবে তার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে হবে।'
রাত্রে সুবুদ্ধি চন্দ্রহাসকে বলল, 'এই রাজার ব্যাপারটা আমার কাছে খুব পরিষ্কার নয়। যেসব রাজকুমার স্বয়ংবর সভায় এসেছে তাদের প্রত্যেককেই তো তুমি আজকে পরাজিত করেছ। কালকে আবার কমলনাথের সঙ্গে লড়তে হবে কেন? কমলনাথ কে? আজকে সে আসেনি কেন? তুমি বললে আমি এসব প্রশ্ন রাজাকে গিয়ে করে আসতে পারি। বল যাব?'
'না, না যেতে হবে না, আসল ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরেছি,' বলে চন্দ্রহাস পাশ ফিরে শুল।
মাঝরাত্রে উঠে চন্দ্রহাস সুবুদ্ধিকে জাগিয়ে বলল, 'সুবুদ্ধি চল পালাই। সকালের আগেই আমাদের এই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।'
এই কথা শুনে সুবুদ্ধির ঘুম ছুটে গেল। সে বলল, 'সে কী! তুমি কালকে কমলনাথের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে না? এত রাজকুমারকে হারিয়েছ আর তাকে হারাতে পারবে না? নিশ্চয় পারবে। রবিবর্মার মেয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবেই হবে।'
কিন্তু চন্দ্রহাস সুবুদ্ধির কথা কানে তুলল না। সে এগিয়ে গেল। অগত্যা সুবুদ্ধিকেও যেতে হল তার পেছন পেছন।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, চন্দ্রহাস আসলে কি? বোকা? সাহসী? না কাপুরুষ? শিকারিদের সর্দারকে সে ভয় পেল না। ওদের বীরের সঙ্গে লড়ে জয়ী হল। স্বয়ংবর সভায় যেসব রাজকুমার এসেছিল তাদের সে পরাজিত করল। আবার সে-ই রাত্রের অন্ধকারে সুবুদ্ধিকে নিয়ে পালিয়ে গেল। পরের দিন সকালে কমলনাথের বিরুদ্ধে তাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হত। চন্দ্রহাস কি ভয় পেয়েছিল না অন্য কোনো কারণ ছিল?'

বেতালের প্রশ্নের জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'চন্দ্রহাস আসলে বুদ্ধিমান, সাহসী ও গভীর আত্মবিশ্বাসী ছিল। তার রাতারাতি পালিয়ে আসার একটি মাত্র কারণ হল রবিবর্মার বিশ্বাসঘাতকতা। স্বয়ংবর সভায় যারা এসেছিল তাদের প্রত্যেককে পরাজিত করার পর, পরের দিন আর একটি প্রতিযোগিতা করার কোনো কারণ ছিল না। তবু রবিবর্মা যখন তা করল তখন চন্দ্রহাস বুঝে নিল যে তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা রবিবর্মার নেই। শিববর্মার মতো চন্দ্রহাসও ভেবেছিল আত্মীয়তা উভয় দেশের মধ্যে স্থাপিত হলে দু-দেশের মধ্যে যুদ্ধ হবে না। চন্দ্রহাসও শান্তি চেয়েছিল। কিন্তু শেষে সে বুঝল রবিবর্মার উদ্দেশ্য। বুঝে সে রাতারাতি নিজের দেশের দিকে রওনা দিল।'
রাজা এইভাবে কথা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন