রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, অপ্রিয় কথা বলতে নেই, তবে তুমি যে পরিমাণ পরিশ্রম করছ এত পরিশ্রম করা বোধ হয় রাজার ধর্ম নয়। ঠিক তোমারই মতো রাজা নিরঙ্কুশ রাজধর্ম পরিত্যাগ করার মতো কাজ করেছিল। রাজার কখনোই এমন কাজ করা উচিত নয় যার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। আমি ওই নিরঙ্কুশ রাজার কাহিনি বলছি। শুনতে শুনতে হাঁটলে পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল এই কহিনি বলল—

কোনো এককালে নিকুঞ্জদেশের রাজা ছিল নিরঙ্কুশ। ওই দেশের প্রান্তে যে অরণ্য ছিল সেই অরণ্যে একটি রাক্ষসের দেখা পেল কোনো কোনো লোক। যারা দেখল তারা ছুটে এসে নিরঙ্কুশ রাজাকে জানাল। ভয়ে আর কেউ ওই অরণ্যে ঢুকল না।

রীতি অনুসারে কলিযুগে রাক্ষস থাকা স্বাভাবিক নয়। রাক্ষস থাকতে পারে না। তাই রাজা ওদের কথা বিশ্বাস করেনি। ওদের কাছ থেকে রাজা জানতে পারল যে রাক্ষসের তাড়া খেয়ে ওরা অরণ্য ছেড়ে পালিয়ে আসেনি। ওরা অরণ্য ছেড়ে পালিয়ে এসেছে ভয়ে। রাজা ওদের একজনকে প্রশ্ন করল, 'যাকে তুমি দেখেছ সে যে রাক্ষস এটা তুমি বুঝলে কী করে?'

ওই লোকটা বলল, 'মহারাজ, ওই লোকটা অনেক লম্বা আর খুব চওড়া।'

রাজা আবার ওদের প্রশ্ন করল, 'অনেক লম্বা এবং চওড়া লোককে রাক্ষস বলছ কেন?'

তখন ওরা বলল, 'মহারাজ, আমরা অত লম্বা এবং চওড়া লোককে এর আগে কোনোদিন দেখিনি। আমরা নিজেদের চোখে দেখেছি, একটা বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওই লোকটার ওপর। লোকটা ওই বাঘটার পেছনের পা ধরে একটা গাছের গোড়ায় আছাড় মেরে বাঘটাকে মেরে ফেলল। রাক্ষস ছাড়া আর কে এইধরনের কাজ করতে পারে মহারাজ? ওর হাতে কোনো অস্ত্র নেই। যখন-তখন সে হরিণ থেকে বাঘ পর্যন্ত মেরে, পুড়িয়ে খেয়ে নেয়। এর পরেও কি ওকে রাক্ষস বলা যায় না মহারাজ?'

রাজা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'তোমাদের কথা শুনলাম। এখন আমার কথা হল অকারণ ভয়ে তোমরা ছোটাছুটি করছ। ও যদি তোমাদের কোনো ক্ষতি করে তখন আমাকে বলবে। তোমাদের সাহায্যের জন্য আমার কাছে যা চাইবে তাই পাবে।'

রাজার কথা শুনে ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কিন্তু রাজার ওই কথার জবাবে কেউ কোনো কথা বলার সাহস করল না। যে যার আস্তানায় ফিরে গেল।

ওদের চলে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে মন্ত্রী হাঁক পাঁক করে বলল, 'এ কী করলেন মহারাজ? আপনি কি ওই রাক্ষসটাকে ধরার বা মেরে ফেলার কথা ভাবছেন না?'

'না ভাবছি না। কেন, ভাবতে হবে?' রাজা বলল।

'যে একটা বাঘকে খালি হাতে মারে সে কি মানুষের ক্ষতি করবে না? এটা ভাবতে পারলেন কী করে?' মন্ত্রী বলল।

'অত্যন্ত হিংস্র জন্তুও বিনা কারণে কারও কোনো ক্ষতি করে না। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি এই রাক্ষসও মানুষের ক্ষতি করবে না।' রাজা বলল।

রাজা বলল, 'এই যদি আপনি ভেবে থাকেন তাহলে অবিলম্বে ওই রাক্ষসকে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করুন।'

মন্ত্রী রাজার কথায় উৎসাহিত হয়ে সেনানায়ককে ডেকে বলল, 'তুমি অরণ্যে ঢুকে রাক্ষসকে মেরে সোজা ওই মৃতদেহ নিয়ে চলে আসবে।'

সেনানায়ক তৎক্ষণাৎ হাতির পিঠে চেপে রাক্ষসকে ধরার জন্য রওনা দিল। সঙ্গে নিল বাছাই করা কুড়ি জন সৈনিক। সৈনিকদের হাতে ছিল ভালো অস্ত্র। অরণ্যে ঢুকে কিছুক্ষণ খোঁজার পরেই ওরা রাক্ষসের আভাস পেল। বাঘের আর্তনাদ ওরা শুনতে পেল। যেদিক থেকে আর্তনাদ শোনা গেল সেদিকে ওরা এগিয়ে গেল। ওরা দেখতে পেল লম্বা-চওড়া একটি লোক একটা বাঘকে তুলে আছড়ে মেরে ফেলছে। ওদের চোখের সামনে বাঘ রক্তবমি করতে করতে মারা গেছে। বাঘ মারার পর রাক্ষসটা ওই সেনাপতি ও তার লোকজনের দিকে তাকাল। রাক্ষসকে দেখেই সৈনিকদের মনে খুব ভয় ঢুকেছিল। তারপর রাক্ষস যখন ওদের দিকে তাকাল তখন ওরা ভয়ে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। সেনাপতি একা রাক্ষসকে মোকাবিলা করার জন্যে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। রাক্ষসটা ছিল অনেক লম্বা আর ওই সৈনিকটা ছিল তার হাঁটুর কাছে। রাক্ষসটা বাঘটাকে মেরে ফেলে ওই সেনাপতির কাছে এসে বলল, 'কী ব্যাপার? কেন এসেছ এখানে?' রাক্ষসটা মানুষের ভাষায় এই প্রশ্ন করল।

তার কথা শুনে সেনাপতির মনে হল আর যাই হোক, এ তো রাক্ষস নয়, এ তো সাধারণ মানুষ। একে মেরে ফেলা এমন কী শক্ত কাজ। সে বলল, 'আমি এখানে এসেছি তোমাকে মেরে ফেলতে রাজার নির্দেশে।'

'না, তুমি আমাকে মেরে ফেলতে আসনি। তুমি নিজেই মরে যেতে এসেছ।' বলে রাক্ষসটা সেনাপতির তরবারি কেড়ে নিয়ে পায়ের তলায় চেপে বলল, 'ফিরে যাও।'

ফিরে গিয়ে সেনাপতি মন্ত্রীকে সমস্ত ঘটনা বলল। মন্ত্রী রাজাকে জানিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'মহারাজ এখন কী করি?'

রাজা বলল, 'আর আপনাকে কিছু করতে হবে না।' রাজা এমনভাবে বলল যেন মন্ত্রী আর কোনোদিন ওই রাক্ষসের প্রসঙ্গ না তোলে।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, রাক্ষসের ব্যাপারে রাজা নিরঙ্কুশ প্রথম থেকেই উদাসীন ছিল কেন? রাক্ষসের সঙ্গে পেরে উঠবে না— এই ভয়ে? রাক্ষস মানুষের শত্রু বলে? লোকের কথায় বিশ্বাস না হলেও নিজের সেনাপতির কথা তার বিশ্বাস করা উচিত ছিল। সব জেনে-শুনে এ-রকম শক্তিশালী শত্রুকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয়? রাজা এ-রকম করল কেন? জানা সত্ত্বেও আমার এই প্রশ্নের জবাব যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রাক্ষসরাও মানুষের মতো একটি প্রাণী। বলা চলে একই জ্ঞাতিগোষ্ঠী। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জাতি বাস করে। পুরাণকালে মানুষের ক্ষতি যেসব রাক্ষস করেছিল তাদের বিষু� নাকি মানুষের রূপ ধরে মেরে ফেলেছিল। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া রাজার ধর্ম। যে রাক্ষস তাকে মেরে-ফেলতে-আসা-মানুষকে কোনো ক্ষতি না করে ছেড়ে দেয়, ফিরে যেতে বলে তাকে আর যাই হোক অপরাধী বলা চলে না। মন্ত্রীর কথায় রাজা পরীক্ষামূলকভাবে মন্ত্রীকে রাক্ষসটাকে ধরে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মন্ত্রী মৃত অথবা জ্যান্ত রাক্ষসের দেহ আনার জন্য সেনাপতিকে পাঠিয়েছিল। কার্যত মন্ত্রী যা করতে চেয়েছিল তা রাজনীতি বর্জিত কাজ। স্বয়ং রাজা তাকে অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু তারপর রাজা আর অনুমতি দেয়নি।'

রাজা বিক্রমাদিত্য এই কথা বলার জন্য মুখ খোলার সঙ্গেসঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%