ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। এমন সময় শব থেকে বেতাল বলল, 'রাজা, বার বার ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও তুমি যে বিরক্ত হচ্ছ না তাতে আমি অবাক হচ্ছি। ভাগ্য বিরূপ হলে অনেকে বিফল মনে, হতাশ হয়ে অরণ্যের দিকে পাড়ি দেয়। আমার কথার প্রমাণ স্বরূপ তোমাকে আমি ধনগুপ্তের কাহিনি শোনাব। সেই কাহিনি শুনে তোমার খুব ভালো লাগবে এবং তোমার পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
ধনগুপ্ত ছিল এক ব্যাবসাদারের ছেলে। বাপের অনেক সম্পত্তি সে পেয়েছিল। তার ঝোঁক ছিল ভোগবিলাসের দিকে। কিন্তু ব্যাবসা এমন একটা জিনিস যা করতে হলে ভোগবিলাসে গা ভাসানোর সময় তেমন থাকে না। ফলে ধনগুপ্তের কিছুদিনের মধ্যেই বিরক্তি জাগল। সে ভাবল, অত কষ্ট করে ব্যাবসা না করে জুয়ো খেলে টাকা রোজগার করবে। ধনগুপ্ত আস্তে আস্তে ব্যাবসা ছেড়ে চুটিয়ে জুয়ো খেলা শুরু করল। খেলতে খেলতে সে যেমন মোটা টাকা হারত আবার তেমনি জিততও। কিছুদিন এইভাবে চলার পর একদিন সে হঠাৎ সমস্ত ধনসম্পত্তি খুইয়ে রাস্তার ভিখারি হল।
এই ঘটনার ফলে ধনগুপ্তের মনে জীবনের প্রতি বিরক্তি জাগল। তার আর ইচ্ছা করল না সমাজে বাস করতে। সে হিংস্র জন্তুর কথা ভেবেও, জীবনের মায়া ছেড়ে অরণ্যের দিকে পা বাড়াল। কিছুকাল পরে তার চুল দাড়ি বেড়ে গেল, চুলে জট ধরল। তাকে তখন ঠিক একটা পাগলের মতো দেখাচ্ছিল।

অদূরে বহু অরণ্যবাসী ছিল। সে বছর ফসল না হওয়ায় ওরা দূরে দূরে গিয়ে শিকারে লাগল। হঠাৎ ওদের নজর পড়ল ধনগুপ্তের ওপর। তার বিরাট বিরাট দাড়ি গোঁফ দেখে তারা অবাক হল। তারা আরও অবাক হল এই দেখে যে ধনগুপ্তের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। যে বনে এত বাঘ ভালুক সেখানে নিরস্ত্র মানুষকে দেখে ওদের অবাক হওয়ারই কথা। ওরা ভাবল এ মানুষ নয়, দেবতা নিশ্চয়। ওরা তার পায়ে পড়ে প্রণাম করল। তখন ওদের দিকে তাকিয়ে ধনগুপ্ত হাসি হাসি মুখে বলল, 'কী চাও তোমরা?'
'আপনি আমাদের আস্তানায় এলে আমাদের ভাগ্য খুলে যাবে।' ওরা বলল।
কথা না বাড়িয়ে ধনগুপ্ত ওদের ডেরায় চলে গেল। ধনগুপ্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এতদিন বাদে মুষলধারে বৃষ্টি হল।
অরণ্যবাসীরা ভাবল, এটা ধনগুপ্তের মাহাত্ম্যের ফলে হয়েছে। ভালো বৃষ্টি হওয়ায় সে বছর সমস্ত এলাকায় ভালো ফসল হয়েছিল। তার ফলে অরণ্যবাসীদের ঘরে ঘরে আনন্দ দেখা দিল।
সে দেশের রাজার সঙ্গে অরণ্যবাসীদের বিবাদ ছিল। ওদের সবসময় রাজা দাবিয়ে রাখতেন। রাজার কানে গেল যে অরণ্যবাসীদের অবস্থা ভালো হচ্ছে। তিনি তাদের দাবিয়ে রাখার জন্য বিরাট এক সেনাবাহিনী পাঠালেন। এদিকে অরণ্যবাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তারা যেহেতু একজন মহাপুরুষকে তাদের কাছে পেয়ে গেছে সেহেতু তারা হেরে যেতে পারে না। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে রাজার সেনাবাহিনীকে তারা হটিয়ে দিল।

রাজার সেনাবাহিনী হেরে যাওয়ায় রাজা খুব অবাক হলেন। তিনি কারণ জানতে গুপ্তচর পাঠালেন। গুপ্তচর ফিরে এসে মহাপুরুষের আগমনের কথা জানাল। শুনে রাজারও বিশ্বাস হল যে নিশ্চয় কোনো মহাশক্তি অরণ্যবাসীকে সাহায্য করছে। তাই তিনি ভাবলেন, অরণ্যবাসীকে জব্দ করার আগে ওই মহাপুরুষকে লাভ করা তাঁর পক্ষে উচিত হবে। রাজা গোপনে ধনগুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে তাঁর রাজ্যে আসার আহ্বান জানালেন।
ধনগুপ্ত ভাবল যে ওই অরণ্যে থাকার চেয়ে রাজার অধীনে থাকলে তার অনেক উন্নতি হবে। তাই সে অরণ্যবাসীদের না জানিয়ে সোজা রাজার কাছে চলে গেল।
রাজা সাদরে তাকে গ্রহণ করে তার নাম জানতে চাইলেন। জবাবে ধনগুপ্ত বলল, 'আমার নাম অনুভবানন্দস্বামী।'
ধনগুপ্তের এই রাজার কাছে আসার দু-এক দিনের মধ্যেই তাঁর একটি কঠিন রোগ সেরে গেল। রাজা যথারীতি রোগমুক্তির জন্য বৈদ্যদের প্রশংসা করলেও মনে মনে তিনি বুঝেছিলেন যে এ নিশ্চয় এই মহাপুরুষ অনুভবানন্দের মহিমা।
রাজা তাঁর অনুভবানন্দের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করালেন। দেখতে দেখতে রাজার কাছাকাছি যারা থাকে তারাও অনুভবানন্দের ভক্ত হয়ে গেল। ধনগুপ্ত অবস্থা বুঝে দু-চারটি করে কথা বলত। রাজধানীর মতো ধনবহুল স্থানে অনুভবানন্দ হয়ে থাকা যে কত কষ্টকর তা সে কিছুদিনের মধ্যে হাড়ে হাড়ে টের পেল।
কিছুদিন পরে ওই রাজার সঙ্গে ধনগুপ্তের দেশের রাজার বিরোধ বাধল। রাজা যুদ্ধে যাওয়ার আগে ধনগুপ্তের কাছে এসে আশীর্বাদ প্রার্থনা করল। ধনগুপ্ত বাধ্য হয়ে বলল, 'বিজয়োস্তু।' এইভাবে নিজের দেশের পরাজয় কামনা করে ধনগুপ্ত মনে মনে দগ্ধ হল। কিন্তু তখন এ ছাড়া আর তার করার কিছু ছিল না।
রাজা যুদ্ধে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধ জয় করে ফিরে এলেন। ফেরার পথেই রাজা ঠিক করলেন: এবার অনুভবানন্দস্বামীর আশ্রম বড়ো করব। আরও ঘটা করে তার পুজো দেব। কিন্তু ফিরে এসে রাজা আর অনুভবানন্দস্বামীর দর্শন পেলেন না। তারপর আর কেউ কোনোদিন এই অনুভবানন্দকে দেখেনি।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, অরণ্যবাসীর নজরে পড়ার পর ধনগুপ্তের মনে পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। জীবনের প্রতি তার যে বিরক্তি জেগেছিল সেটাও লোপ পেয়েছিল। কিন্তু আবার সে সংসারে ঝামেলায় কেন গেল? নিজের দেশকে যে রাজা পরাজিত করেছে তার কাছ থেকে সে কি প্রশংসা পেতে চায়নি? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি তুমি না দাও তাহলে জেনে রাখ তোমার মাথা এক্ষুনি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
রাজা বিক্রমাদিত্য জবাবে বললেন, 'ধনগুপ্ত জানত নিজের দেশ ও নিজের দেশের রাজাকে। সে বুঝেছিল যে তার দেশ হেরে যাবে। তার নিজের যে তেমন কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা নেই, তাও সে জানত। অত ক্ষমতা তার থাকলে সে জুয়ো খেলায় ধনসম্পত্তি হারাত না। তবু তার নিজের দেশের পরাজয়ের জন্য রাজাকে সে আশীর্বাদ করল। এতে সে মনে মনে খুবই দুঃখ পেল। আর তা ছাড়া একটি ভয় ছিল তার সবসময়। তা হল তার যে তেমন কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা নেই তা যেকোনো মুহূর্তে লোকের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে। এই ভয়ে এবং ওই দুঃখে সে রাজধানীর সুখ ছেড়ে একদিন বনপথে হারিয়ে গেল।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন