অরণ্যবাসী

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কার উপকার করার জন্য এত পরিশ্রম করছ আমি তা জানি না। তবে এমন কিছু লোক আছে যারা উপকারীকে চিনতে পারে না। এমনকী উপকারীকে শত্রু হিসাবে সন্দেহ করে থাকে। আমার কথা যে সত্য তার প্রমাণ স্বরূপ আমি বামন নামক একধরনের শিকারিদের কাহিনি বলছি। কাহিনিটি শুনতে ভালো লাগবে এবং তোমার পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:

হিমগিরির অরণ্যে বামন নামে একজাতের লোক বাস করত। ওরা পেট ভরানোর জন্য যা প্রয়োজন তা ওই অঞ্চলেই পেত। ফলে ওদের অরণ্যের বিশেষ গণ্ডির বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হত না। এইভাবে হাজার হাজার বছর ওই জাতির জীবন সেখানে কেটে যেতে লাগল। ফলে ওদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। নগর সভ্যতার কোনো স্বাদ তারা পায়নি।

তবে ওদের নেতা বাঘার ছেলে পাহাড়ি মাঝে মাঝে দূরের একটি নগর, বিজয়পুরে যেত। সেখানে নগর সভ্যতার নানা জিনিস দেখত। যেগুলো তার ভালো লাগত সেগুলো সে নিজেদের মধ্যে শুরু করতে চাইত। শুধু নিজে নয়, গোটা জাতিকে নগরসভ্যতার আলোকে আনার কথা ভেবে সে বিজয়পুরের রাজা চন্দ্রসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করল।

চন্দ্রসেন পাহাড়িকে সযত্নে রেখে তার প্রয়োজনীয় বস্তু জোগাতে লাগল এবং তার জাতিকে সভ্য করে তোলার ক্ষেত্রে যা করার দরকার হবে তা করতে রাজি হল।

কিছুদিন থাকার পর পাহাড়ির মনে হল বাবাকে একবার দেখে আসা দরকার। এবারে অরণ্যে তার মন টিকছিল না। স্বজাতির চালচলন পরিবর্তনের জন্য কী কী করা যায় তা নিয়ে সে ভাবতে লাগল।

পাহাড়ি তার বাবাকে না জানিয়ে বিজয়পুরে চলে যাওয়ায় তার বাবা বাঘা মনে মনে খুব দুঃখ পেয়েছিল। ছেলের ওপরে তার অনাস্থার ভাব জাগল। ছেলে যে বাপ-ঠাকুরদার নাম রাখবে এই বিশ্বাস তার মন থেকে মুছে গেল। এই ধরনের কথা ভাবতে ভাবতে অনাগত দিনের আশঙ্কায় সে অসুখে পড়ে গেল। সেই যে পড়ল আর উঠল না। মৃত্যুর আগে বাঘা ছেলেকে বলে গেল, 'বাবা, বাপ-ঠাকুরদা যেভাবে এদের পরিচালনা করেছে ঠিক সেইভাবে আমার মারা যাওয়ার পর তুমি এদের পরিচালনা করবে।'

বামনরা বাঘার মৃত্যুর পর তার ছেলে পাহাড়িকেই নেতা করল।

নেতা হয়েই পাহাড়ি অরণ্যের গাছপালাগুলো একধার থেকে কাটার নির্দেশ দিল। পাহাড়ির মুখে এই ধরনের কথা শুনে বামনরা ভাবল, পাহাড়ি উন্মত্ত হয়ে অথবা পাগল হয়ে এই ধরনের কথা বলছে। ওরা নিজেদের কথাগুলো বলাবলি করলেও নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কোনো কথা বলতে পারেনি।

অরণ্য কাটিয়ে গাছ এবং অন্যান্য জিনিস বিজয়পুরে বিক্রি করিয়ে সেই টাকায় আধুনিক কায়দায় ওই অঞ্চলে বামনদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করাল পাহাড়ি। শুধু যে সে বাড়ি করাল তাই নয়, শহর থেকে বহু জিনিস কিনে এনে বামনদের মধ্যে বণ্টন করে দিল। বাঘার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বামনদের সভ্য করে তোলা। এই সব কিছু করার ফলে হিমগিরি অরণ্যের চেহারা বদলে গিয়ে যেন হিমপুর নগর হয়ে গেল। এ ছাড়া পাহাড়ি নিজের জাতের লোককে বিজয়পুর নগরে গিয়ে খেটে টাকা রোজকার করতে বলল।

এত কিছু করার পরেও বামনরা কিন্তু মনে-প্রাণে এসব গ্রহণ করতে পারল না। তারা নগরের জিনিস ব্যবহার করতে অস্বস্তি বোধ করল। আবার নিজেদের অতীত কথা ভেবে দুঃখ পেতে লাগল। তাদের জীবন এমন হয়ে গেল যেন তারা না ঘরকা, না ঘাটকা। নগর সভ্যতা গ্রহণের ফলে তাদের প্রতিটি ব্যাপারে টাকার দরকার হতে লাগল। গাছপালা কেটে ফেলার ফলে আগের মতো মুক্ত জীবনও যাপন করতে পারল না। পোশাক থেকে শুরু করে সব কিছু দরকার পড়ে গেল। যত জিনিসের দরকার পড়ল তত টাকার অভাব দিনকে দিন তীব্র রূপ ধারণ করল।

এইভাবে কিছুকাল চলার পর বামনদের মধ্যে একজন যুবক মল্লনাথ এগিয়ে এসে নানা অভাব অভিযোগের কথা পাহাড়িকে বলল। দেখে-শুনে পাহাড়ি, অবস্থা সুবিধার নয় ভেবে বিজয়পুর থেকে বিভিন্ন জিনিস এনে বামনদের অভাব পূরণ করল। শুধু তাই নয়, বিজয়পুরের জিনিস হিমপুরে যাতে বিক্রি করা যায় তারজন্য কিছু দোকানও পাহাড়ি বসাল। এত করার পরেও বামনরা খুশি নয়। ওদের অভাব রয়ে গেল। অভাবের কথা মল্লনাথ পাহাড়িকে বলল।

শেষে সবাইকে যাতে সমানভাবে জিনিস বণ্টন করা যায় তারও ব্যবস্থা করল। তখন দেখা গেল প্রয়োজনের তুলনায় প্রত্যেকেই কম পাওয়ায় প্রত্যেকের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকে গেল।

এসব লক্ষ করে মল্লনাথের মনে একটা প্রশ্ন জাগল, 'অরণ্যের সম্পদ গাছপালা ইত্যাদি অনেকদিন আগে বিক্রি হয়ে গেছে। আমাদের সম্পদ বলতে আর কিছুই রইল না। আমাদের নেতা পাহাড়ি কী করে নগর থেকে এতগুলো জিনিস আনতে পারছে।

বিজয়পুরের কাছেই ছিল মন্দগিরি নামে একটি অরণ্য। মল্লনাথের আহ্বানে বামনরা সেই অরণ্যের দিকে পা বাড়াল। নিজের অধীন থেকে এতগুলো বামনকে মল্লনাথের নেতৃত্বে চলে যেতে দেখে পাহাড়ি ওদের সকলের উদ্দেশ্যে বলল, 'একী আমাকে ফেলে চললে কোথায়? আমিও সঙ্গে যাব।'

তখন ওরা একবাক্যে চিৎকার করে পাহাড়িকে বলল, 'আমরা যাচ্ছি অরণ্যে। তুমি কোনোদিন অরণ্যে থাকতে পারবে না।' বলে ওরা মল্লনাথের নেতৃত্বে চলে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, পাহাড়ি বামনদের অত অভাবে ফেলে দিল কেন? সে কি স্বজাতির জীবনধারা পছন্দ করত না? বামনরাই বা নগর সভ্যতাকে গ্রহণ করতে চাইল না কেন? যতই হোক নগর সভ্যতা তো তুলনামূলকভাবে ভালো। পাহাড়ির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার পরিবর্তে ওরা কেন চলে গেল মল্লনাথের অধীনে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা স্বত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'পাহাড়ি লক্ষ করেছিল যে নগর সভ্যতা অনেক ভালো। ভালো জিনিস স্বজাতির মানুষের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা সে করেছিল। স্বজাতিকে সে গভীরভাবে ভালোবাসত বলেই তাদের উন্নত করার প্রয়াস পেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বজাতের লোক তাকে ত্যাগ করে চলে গেল। ওরা ভাবতে পারে যে ওরা পাহাড়িকে উচিত শিক্ষা দিল। ওরা তা ভাবতে পারে কিন্তু পাহাড়ি জলে পড়ে গেল না। সে প্রয়োজন হলে নগরে গিয়ে থাকতে পারে। পাহাড়ি যে ভুল করেনি তা নয়, একটি জাতিকে তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে, বহু বছরের অভ্যাসগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। যতই হোক মানুষ অভ্যাসের দাস। এই কথাটা বুঝতে না পেরে সবাইকে নগরের সভ্যতার দিকে ঠেলে দেওয়ায় পাহাড়ি যা করতে চাইল তা করতে পারল না।'

রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%