ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি কার জন্য এত পরিশ্রম করছ তা আমি জানি না। ভালোভাবে পরীক্ষায় ফেলে দেখা যাবে কেউ কারও জন্য ত্যাগ স্বীকার করে না। আমার বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ আমি শ্রীপুর রাজার ছেলের কাহিনি বলছি। এই রাজকুমারের নাম কামপাল। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
শ্রীপুর রাজার নাম ছিল গুনবর্ধন। তার ছেলে কামপাল অসুখে পড়ল। রাজবৈদ্যরা অনেক রকমের ওষুধ খাওয়াল। ওঝা ঝাড়ফুক করল। নানারকমের চেষ্টা চলল রাজকুমারকে সারিয়ে তোলার। কিন্তু দিন দিন রাজকুমার কামপাল আরও বেশি করে ক্ষীণ হতে লাগল।
সেই সময় এক বৌদ্ধ ভিক্ষু এমনভাবে রাজপ্রাসাদে এল যেন তাকে কেউ পাঠিয়েছে। রাজা তাকে সানন্দে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, 'হে মহাত্মা! আপনি আমার আকাঙ্ক্ষিত সময়ে এসেছেন। যেন স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ আপনাকে পাঠিয়েছেন। আমার ছেলে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। অনুগ্রহ করে ওকে আপনি বাঁচান।'
'রাজা, আমি শুনলাম আপনার ছেলে মৃত্যুশয্যায় থাকায় রাজকর্মচারীরা রাজকার্য করছে না। ওরা করছে কী করছে না তা দেখাও আপনি প্রয়োজন বোধ করছেন না। এর ফলে সারা দেশের বহু কাজ স্তব্ধ হয়ে আছে। আপনার ছেলে বাঁচুক— এটা যেকোনো লোক কামনা করে। যেকোনো লোক কামনা করলে আপনার ছেলে যে বাঁচবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।' বলল বৌদ্ধ ভিক্ষু।
'কী বলছেন প্রভু, আমার দেশের প্রত্যেকেই তো কামনা করে আমার ছেলে বাঁচুক। তা সত্ত্বেও আমার ছেলে কেন সেরে উঠছে না।' রাজা বলল।
'শুধু কামনা করলেই তো হবে না, যে কামনা করবে তাকে নিজের আয়ু দিতে হবে। শুধু তাই নয়, রাজকুমারকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।' বৌদ্ধ ভিক্ষু বলল।

রাজা ভাবল, 'সেধে কেউ কি মৃত্যুবরণ করতে চায়। এটা কি বিশ্বাস করতে পারা যায়? কেউ যদি এগিয়ে না আসে, আমি যদি আমার আয়ু দিই তাহলে কি ছেলে বেঁচে যাবে? আমার যদি আয়ু ছেলেকে দিই, তাহলে ছেলে কবে বড়ো হবে, কবে যে সিংহাসনে বসবে তা তো আমি জানতে পারব না। আমার মৃত্যুর পর আমার এই ছেলেকে কে দেখাশোনা করবে? আমার মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গে চক্রান্ত করে ওকে যদি কেউ মেরে ফেলে তাহলে তো সব শেষ। এই অবস্থায় ছেলেকে বাঁচানোর জন্য আমার মৃত্যুবরণ করা অনুচিত হবে।'
বৌদ্ধ ভিক্ষুর কথা শুনে রানি মনে মনে বলল, 'আমার ছেলে যদি আমার আয়ু নিয়ে বেঁচে ওঠে তাহলেই ভালো হয়। কিন্তু আমি যে মৃত্যুবরণ করব সেটা কি ঠিক হবে। আমার মরার পরের দিনেই তো রাজা আর একটা বিয়ে করবে। আমার ছেলে কি বিমাতার কাছে ভালো ব্যবহার পাবে। রাজা নতুন রানির কথামতো চলতে গিয়ে আমার ছেলেকে কি অবহেলা করবে না। আমার সতীনের কি আর ছেলে হবে না। সে কি চেষ্টা করবে না তার ছেলেকে রাজা করার। নিজের ছেলেকে রাজা করার জন্য আমার ছেলেকে তো মেরে ফেলতে পারে। এই অবস্থায় আমার আয়ু আমার ছেলেকে দান করে আমার কী লাভ? আমি তো বুড়ি হয়ে যাইনি। বেঁচে থাকলে আমার আরও ছেলে হতে তো পারে।'

বৌদ্ধ ভিক্ষুর কথা শোনার পর মন্ত্রী ভাবল, 'আমাদের রাজার যা অবস্থা, আমি ছাড়া উনি তো এক পাও চলতে পারেন না। রাজার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য আমি যে আমার আয়ু দান করে মৃত্যুবরণ করব কোন ভরসায়? আমি মারা যাওয়ার পরের দিনই তো দেশ আক্রান্ত হবে। তা ছাড়া, আমাদের দেশে তো বটেই; এমনকী বিদেশেও মন্ত্রী হিসেবে আমার কত নাম। দিনের পর দিন আমার নাম ছড়িয়ে পড়ছে। আমার ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবস্থায় সামান্য রাজকুমারের জন্য আমি কেন প্রাণ বিসর্জন দেব?'
রাজা, রানি, মন্ত্রীর মতো সেনাপতিও ভাবল, 'আমার মারা যাওয়ার পরের দিনই তো দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। আমি চাই বীরের মতো মৃত্যুবরণ করতে।'

এ ছাড়া বড়ো বড়ো রাজকর্মচারী এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল যেন তারা খুব দুঃখ পেয়েছে।
বৌদ্ধ ভিক্ষু বলল, 'দেখলেন তো মহারাজ আপনার দেশে এমন একজনও নেই যে আপনার ছেলের জন্য প্রাণদান করতে পারে।' বলেই বৌদ্ধ ভিক্ষু উধাও হয়ে গেল।
এই কাহিনি শুনিয়ে বেতাল বলল, 'রাজা, এত বড়ো দেশে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল রাজকুমার অসুস্থ হওয়ার ফলে। অন্যদের কথা ছেড়ে দিলাম অন্তত রাজকুমারের মা, বাবা, ওরাও কি পারল না নিজেদের আয়ু দান করতে। সবাই কি অভিনয় করে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না-দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'যার প্রতি টান থাকার তার টান ঠিকই আছে। একজনের জন্য আর একজনের যে দুঃখ পাওয়া, ছোটোদের জন্য বড়োদের স্নেহ, বড়োদের জন্য ছোটোদের শ্রদ্ধা, ভক্তি সবই আছে। মানুষের জীবনে এসবের দাম অসীম। এগুলোই হল জীবনের অপরিহার্য গুণাবলি। তবে এসবই বিদ্যমান জীবিত মানুষের মধ্যে। তবে মানুষ নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। পরের জন্য জীবনদান করা বিশেষ আবেগের মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে দেখতে গেলে ওইভাবে জীবনদানের কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। নিজের জীবনদান সম্পর্কে রাজা ও রানি যেভাবে ভেবেছিল তা কি অসঙ্গত?'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন