ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন আবার সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল রাজা বিক্রমাদিত্যকে বলল, 'রাজা, এই দুনিয়ায় বিনয়ী এবং বিশ্বাসী মানুষের স্থান নেই। বিনয়ী এবং বিশ্বাসীরাও কীভাবে যে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে তার প্রমাণস্বরূপ একটি কাহিনি আপনার কাছে নিবেদন করছি। আমার কাহিনি রবীন্দ্রকে নিয়ে। কাহিনি শুনতে শুনতে পথ চললে হাঁটার পরিশ্রম কমে যাবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—
কোনো এক গ্রামে পদ্মনাভ এবং বাসুদেব নামে দুই বন্ধু ছিল। তাদের বয়সও ছিল প্রায় সমান। দু-চারদিন আগে-পিছে ওরা বিয়ে করেছিল। ওদের মধ্যে বাসুদেবের ভাগ্যটা ছিল মন্দ। তাদের একটা ছেলে হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেল বাসুদেবের বউ। ছেলের নাম রাখা হল রবীন্দ্র। ঋণে জর্জরিত অবস্থা হল বাসুদেবের। ধারদেনায় ডুবে, অসুখে পড়ে ধুঁকতে ধুঁকতে বাসুদেব মারা গেল। মারা যাওয়ার আগে সে রবীন্দ্রকে দেখাশোনার ভার দিয়ে গেল পদ্মনাভের হাতে।
পদ্মনাভের একটি ছেলে ছিল। নাম শেখর। পদ্মনাভ রবীন্দ্র এবং শেখরকে সমানভাবে দেখত। ওদের বিদ্যালয়ে পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। রবীন্দ্র এবং শেখর একই মায়ের সন্তানের মতো বাড়তে লাগল। এভাবে ওরা গ্রামের লেখাপড়া শেষ করল।
পদ্মনাভ ওদের দুজনকেই উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানীতে পাঠিয়ে শেখরের নামে নিয়মিত টাকা পাঠাতে লাগল।
গ্রামের জীবন থেকে শহরে পা রেখে, শেখর শহরে নতুন স্বাদ পেয়ে পরিবর্তিত হল। লেখাপড়া থেকে ওর মন উঠে গেল। ঘোরাফেরা আনন্দ ফুর্তির দিকে ওর মন চলে গেল। এমনকী মদ্যপানও সে শুরু করে দিল। বাপের কাছ থেকে যে টাকা আসত তা সে জুয়ো খেলে আনন্দ ফূর্তি করে উড়িয়ে দিত। অপরপক্ষে রবীন্দ্র পড়াশুনায় মন দিয়ে শেখরকে ঠিক পথে রাখার চেষ্টা করত, কিন্তু পারত না। একবার ভেবেছিল শেখরের সম্পর্কে পদ্মনাভকে সব কিছু জানাবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল ওইভাবে জানালে শেখর এখনও যে দু-চার টাকা দেয় তাও দেবে না, ফলে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। শেখর ও রবীন্দ্র ঘুরে আসতে দেশে গেল। পদ্মনাভ ওদের লেখাপড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। সঙ্গেসঙ্গে শেখর জানিয়ে দিল লেখাপড়া তার ভালোই হচ্ছে। সেই সুযোগেও রবীন্দ্র শেখর সম্পর্কে কিছু জানাল না পদ্মনাভকে।

শেখর ও রবীন্দ্র আবার শহরে ফিরে যাওয়ার দু-দিন আগে হঠাৎ পদ্মনাভের কিছু টাকা খুঁজে পাওয়া গেল না। সে সবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করল টাকার কথা। সেই সুযোগে শেখর বলল, 'টাকাগুলো রবীন্দ্র নেয়নি তো, ওকে জিজ্ঞেস করেছ?'
পদ্মনাভ রবীন্দ্রকে সন্দেহ করতে পারল না। তার স্বভাব চরিত্র নিজের ছেলের চেয়ে ভালো। তবু পদ্মনাভ রবীন্দ্রকে ডেকে একবার জিজ্ঞেস করল। এই ধরনের প্রশ্ন শুনে রবীন্দ্র হতবাক হয়ে গেল। তার কারণ সে ভালোভাবেই জানত যে টাকাটা শেখর নিয়েছে। তা সত্ত্বেও সে মুখ খুলে বলেনি। পদ্মনাভ যখন রবীন্দ্রকে জিজ্ঞেস করছিল ঠিক সেইসময় শেখর বলল, 'দেখো রবীন্দ্র, এটা আমি সমর্থন করতে পারলাম না। টাকাপয়সার দরকার থাকলে বাবার কাছে চাইলেই দিত। এভাবে চুরি করা তোমার মস্তবড়ো অপরাধ হয়েছে।'

রবীন্দ্র কিছুক্ষণ ভাবল, 'কী করি? যে চুরি করেছে সেই বড়ো গলা করে কথা বলছে। শেখরকে যদি তার বাবা সন্দেহ করে ফলে তাকে সারাজীবন ফলভোগ করতে হবে।' এই কথা ভেবে সে মাথা নীচু করে পদ্মনাভকে বলল, 'টাকাটা আমিই চুরি করেছি।'
শুনেই পদ্মনাভ অবাক হয়ে গেল। এই প্রথম রবীন্দ্রর উপর তার ঘৃণা জাগল। ভীষণ রেগে গিয়ে সে বলল, 'তোমাকে মানুষ করার জন্য আমি দিনের পর দিন এত ঢালছি, তোমার উন্নতির জন্য আমি এত টাকা খরচ করছি আর তুমি আমারই টাকা চুরি করেছ? এতদিনে আমার সব কিছু দেখছি, ফুটো পাত্রে ঢেলেছি।'
রবীন্দ্র মাথা নীচু করে সেখান থেকে নীরবে চলে গেল।
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই শেখর শহরের একটি জুয়োখেলার ঘরে একজনের সঙ্গে ঝগড়া করে তাকে মারল। মার খেয়ে লোকটা তৎক্ষণাৎ মারা গেল। শেখর ভয় পেয়ে পালাল। কিন্তু বেশিদূর পালানোর আগেই শেখর রাজার প্রহরীদের হাতে ধরা পড়ল। খবর পেয়ে পদ্মনাভ অবিলম্বে রাজধানীতে ছুটে এল।
শেখরের বিচার শুরু হল। শেখরকে বাঁচানোর জন্য রবীন্দ্র চেষ্টা করল। সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে সে জানাল যে, যে সময় ঘটনাটা ঘটেছিল সেই সময়ে শেখর রবীন্দ্রর ঘরে ছিল। রবীন্দ্র এই কথা বললেও যেহেতু জুয়োর ঘরে, ঘটনার সময়ে, অনেকে ছিল সেইহেতু অনেকের সাক্ষ্যপ্রমাণাদির ফলে শেখরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল।

রাজধানীতে এসে পদ্মনাভ জানতে পারল যে শেখর অনেকদিন ধরে নানা কুকাজ করে বেড়াচ্ছে। লোকের মুখে ছেলের বিরুদ্ধে খারাপ কথা শুনে পদ্মনাভ রবীন্দ্রর উপরে ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, 'তোমাকে আমি ছেলের মতো দেখতাম, কিন্তু আজ দেখছি তোমার মতো বিশ্বাসঘাতক আর কেউ নেই। আমি আর কোনোদিন তোমার মুখ দেখতে চাই না।' বলে পদ্মনাভ নিজের গ্রামে ফিরে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, পদ্মনাভ নিজের ছেলের অপরাধের জন্য রবীন্দ্রর উপরে দোষ চাপাল কেন? ছেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার পর রবীন্দ্রকে আরও কাছে টেনে নিয়ে ছেলের অভাবের দুঃখ ভোলাই তো স্বাভাবিক ছিল। তা না-করে রবীন্দ্রকে মুখ দেখাতে বারণ করল কেন? তাহলে সে কি নিজের ছেলে ও রবীন্দ্রকে এক চোখে দেখেনি? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি তাড়াতাড়ি না-দাও তাহলে এক্ষুনি তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'পদ্মনাভ রবীন্দ্র ও শেখরকে সমান চোখেই দেখতেন। রবীন্দ্র শেখরের অধঃপতন যখন লক্ষ করল তখন পদ্মনাভকে তা জানানো উচিত ছিল। শহরে যাওয়ার পর একমাত্র রবীন্দ্রই পারত শেখরকে ঠিক পথে রাখতে। কিন্তু পদ্মনাভকে জানালে পাছে টাকাপয়সা বন্ধ হয়ে যায়, লেখাপড়া সেখানেই থেমে যায়— এই ভয়ে রবীন্দ্র জানায়নি। এখানেই তার স্বার্থবুদ্ধি কাজ করেছে। এমনও হতে পারত রবীন্দ্রের কাছ থেকে জানতে পেরে শেখরের বাবা হয়তো শেখরকে গ্রামে ফিরিয়ে আনত আর রবীন্দ্রর লেখাপড়া চালিয়ে যেত। সঙ্গে থেকে শেখরকে সঠিক পথে চালিত করার চেষ্টা করে অধঃপতন লক্ষ করেও তাকে থামানোর চেষ্টা না-করে শেষমুহূর্তে শেখরকে বাঁচানোর জন্য সাক্ষী দিয়ে কোনো উপকার সে করল না।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন