ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, সৎকাজ করে জগতে আদর্শ পুরুষ হিসেবে অনেকেই চিহ্নিত হয়। কিন্তু আমি জানি অসৎ বা পাপকাজ করেও কিছু লোক আদর্শ হয়ে আছে। আমার কথার প্রমাণ স্বরূপ আমি রাজা গুণসিংহের কাহিনি শোনাব। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
প্রাচীন কালে বিদর্ভের রাজা ছিল জয়সিংহ। জয়সিংহের ছিল দুই ছেলে। বড়োটির নাম বীরসিংহ আর ছোটোটির নাম ছিল গুণসিংহ। গুণসিংহের বাচ্চাবয়স থেকেই এমন সব ঝোঁক ছিল যাতে মনে হত সে রাজা হতে চায়। অল্পবয়স থেকেই দেশ শাসন কীভাবে করতে হবে, কোন অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা গভীর মনোযোগের সঙ্গে শিখেছিল। সে মন্ত্রী, মাণিক্যবর্মার কাছে রাজনীতি এবং সেনাধিপতি সুরসেনের কাছে অস্ত্রচালনা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে শিখেছিল। বীরসিংহ ছিল চরিত্রের দিক থেকে গুণসিংহের বিপরীত। সে আনন্দে সুখে দিন কাটাতে চায়। দেশ শাসনের কুটিল কৌশল তার ভালো লাগে না।
যথাসময়ে জয়সিংহ ঠিক করল বীরসিংহকে সিংহাসনে বসাবে। তারজন্য আয়োজন চলছিল। এসব লক্ষ করে গুণসিংহ মন্ত্রী এবং সেনাধিপতির সঙ্গে শলাপরামর্শ করল। তারপর যেদিন বীরসিংহকে অভিষিক্ত করার কথা তার আগের দিন রাত্রে গুণসিংহ নিজের বাবা এবং দাদাকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করল। তারপরের দিন নিজে সিংহাসনে বসল।
গুণসিংহ যখন অভিষিক্ত হওয়ার জন্য ব্রাহ্মণদের নির্দেশ অনুযায়ী মন্ত্র উচ্চারণ করছিল সেইসময় মন্ত্রী মণিমুক্তোখচিত মুকুট এনে গুণসিংহের মাথায় পরিয়ে দিতে গেল।

'একী!' গুণসিংহ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
'মহারাজ? কোটি কোটি টাকায় তৈরি এই মুকুট। বংশপরম্পরায় আপনার পূর্বপুরুষগণ এই মুকুট মাথায় দিয়ে আসছেন। আজ থেকে এই মুকুটের অধিকারী হলেন আপনি। আপনি অনুগ্রহ করে এই মুকুট মস্তকে ধারণ করুন।' মন্ত্রী বলল।
'মণিমুক্তোখচিত এত দামি মুকুট না পরলে কি দেশ শাসন করা যায় না?' গুণসিংহ বলল।
মন্ত্রী চোখ ছানাবড়া করে গুণসিংহের দিকে তাকিয়ে রইল। তার অবাক হওয়া দেখে গুণসিংহ আবার বলল, 'কাল থেকে রাজার ভোগের ব্যাপারে যে বিরাট খরচ হয় তা বন্ধ করে দিতে হবে। দেশের সাধারণ কর্মী যেমন নিজের খাওয়াপরার জন্য অর্থ পায় আমিও তেমনি সামান্য কিছু অর্থ নেব। রাজা হয়েছি বলে প্রজাদের অর্থ খেয়ালখুশি মতো খরচ করার অধিকার আমার নেই। এসব যখন ছিল তখন ছিল এখন আর এই অপচয় হতে দেব না।'
গুণসিংহের কথা শুনে মন্ত্রী-সহ সবাই অবাক হয়ে গেল। তারপর থেকে রাজকর্মচারীদের মতো রাজাও নির্দিষ্ট বেতন নিত এবং অনাড়ম্বর জীবনযাপন করত। প্রজাদের বিভিন্ন সমস্যা রাজা গুণসিংহ কান পেতে শুনত এবং প্রজাদের মঙ্গলের জন্য যথাসম্ভব বেশি খরচ করত। এইভাবে কিছুকালের মধ্যেই রাজা গুণসিংহ খুব নাম করেছিল।
বিদর্ভের পাশে ছিল বিরূপ দেশ। ওই দেশের রাজা ছিল চিত্রসেন। রাজা চিত্রসেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বিজয়সেনকে সমস্তরকমের অস্ত্রবিদ্যা এবং রাজনীতি শিখিয়ে সিংহাসনে অভিষিক্ত করবে ঠিক করল। অভিষেকের আগে চিত্রসেন পুত্র বিজয়সেনকে বলল, 'তোমার পুঁথিগত বিদ্যা শেষ হয়েছে। রাজনীতি তুমি যা শিখেছ তা শুনে এবং পড়ে। রাজনীতি হল অভিজ্ঞতার বিষয়। তুমি কিছুকাল ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ো। বিভিন্ন দেশে ঘুরে তোমার চোখে যাকে আদর্শ পুরুষ মনে হবে তার কাছে থেকে কিছু শিখে নাও।'
বাবার কথামতো বিজয়সেন দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। কোন দেশে কীভাবে শাসনকাজ চলছে তার খবর নিতে নিতে ভ্রমণ করতে লাগল। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন সে বিদর্ভদেশে এল। বিদর্ভদেশের শাসনকার্য সম্পর্কে সে যা শুনল তাতে অবাক হয়ে রাজা গুণসিংহের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করল।
বিজয়সেন কিছুকাল গুণসিংহের কাছে থেকে নিজের দেশে ফিরে গেল। তারপর তার রাজ্যাভিষেক পর্ব সম্পন্ন হল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, রাজ্যাভিষেকের আগে যে যুবরাজ বিজয়সেন বাপের কথায়, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দেশভ্রমণ করতে বেরুল সেই বিজয়সেন দাদা এবং বাপকে কারাগারে নিক্ষেপকারী গুণসিংহকে আদর্শ পুরুষ হিসেবে গ্রহণ করল। কী করে এটা সম্ভব হল? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'গুণসিংহ সুখভোগের জন্য, বাবা ও দাদাকে বন্দি করে সিংহাসনে বসেননি। তিনি যেভাবে ভোগবিলাসের খরচ বন্ধ করে দিয়ে, নিজে সাধারণ রাজকর্মচারীর মতো জীবনযাপন করে দেশ শাসন করলেন তাতে তাঁকে আদর্শ রাজা না-বলে পারা যায় না। গুণসিংহ সিংহাসনে না বসে যদি তার দাদা সিংহাসনে বসত তাহলে আর চারজন রাজার মতো সেও ভোগবিলাসের মধ্যে ডুবে থাকত। যে রাজা নিজের জন্য অত্যন্ত কম খরচ করেন, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য দু-হাতে খরচ করতে চান তাকেই তো আমরা আদর্শ রাজা মনে করি। বিজয়সেন সঠিক লোককে আদর্শ পুরুষ হিসেবে গ্রহণ করেছে।'
রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন