বুদ্ধিমান

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কী করে এত পরিশ্রম করছ তা জানি না। টাকাপয়সা, ধনসম্পত্তি বৃদ্ধির জন্য অনেক রকমের ঝগড়া হয়ে থাকে। তার ফলে শত্রুতাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বুদ্ধিতে যে কে বড়ো এবং কে ছোটো— এই নিয়ে বিরোধ এবং শত্রুতার এক বিচিত্র কাহিনি আমি বলছি, মন দিয়ে শোনো। আমার এই কাহিনি শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—

কোশল দেশের মাতঙ্গ নগরের খ্যাতি ছিল ব্যাবসাকেন্দ্র হিসেবে। সেই নগরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাবসাদারের নাম ছিল সুধাকর। প্রত্যেকেই বলাবলি করত যে ওর মতন বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী আর নেই। গোটা নগরের লোক ওর দোকান থেকেই সুগন্ধ দ্রব্য কিনত। বলতে গেলে সুগন্ধ জিনিসের সে একচেটিয়া ব্যাবসাদার ছিল।

এইভাবে তার ব্যাবসা চলছিল। কিছুকাল পরে সারঙ্গ নামে এক ব্যাবসাদার ওই নগরে এসে সুগন্ধি দ্রব্য বিক্রি করতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যেই তার ব্যাবসা বেশ জমে উঠল। তার ব্যাবসা যতই জমে উঠেছিল ততটাই ভাঁটা পড়ল সুধাকরের ব্যাবসায়। ভাঁটা পড়লেও সুধাকর কিন্তু সারঙ্গকে গুরুত্ব দিত না এবং তার বিক্রি যে কমে গেছে তারজন্য তার আক্ষেপও ছিল না। এমনকী তাকে দেখার আগ্রহও সুধাকরের মনে ছিল না।

প্রত্যেক বছর আরবদেশ থেকে ব্যাবসাদাররা এসে সুধাকরের কাছে সুগন্ধি দ্রব্যাদি কিনে নিয়ে যেত। তার কাছে কেনার ফলে আরবের লোক একসঙ্গে অনেকখানি জিনিস অল্প দামে পেয়ে যেত। সেই জিনিস ওরা নিজেদের দেশে বিক্রি করে অনেক লাভ করত।

একদিন এক বৃদ্ধ সারঙ্গের সঙ্গে দেখা করে বলল, 'দেখো বাবা, তোমার উপকারের জন্যই তোমাকে একটা উপদেশ দিচ্ছি। সুধাকর যে জিনিসের দাম যতটা রেখেছে তুমি কিন্তু তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করো না। এর ফলে শুধু তুমিই যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাই নয়, তোমার ওই কাজে সুধাকরেরও ক্ষতি হবে। শেষ পর্যন্ত দেশেরও ক্ষতি হবে। আমি যতদূর জানি, সুধাকর ভালো লোক। তোমরা দু-জনে এক জায়গায় বসে, ভালোভাবে আলোচনা করে ঠিক করে নাও আরবের ব্যাবসাদারের কাছে কোন জিনিসটা কত দামে বিক্রি করবে। এর ফলে কিন্তু তোমরা দু-জনেই উপকৃত হবে। ফলে দেশেরও মঙ্গল হবে।'

সারঙ্গ হেসে বলল, 'তোমাকে কি সুধাকর পাঠিয়েছেন? কেন, উনি তো ব্যাবসার ক্ষেত্রে খুব বুদ্ধিমান লোক বলে শুনেছি। আমার বুদ্ধির কাছে উনি কি হেরে যাবার আশঙ্কা করছেন?'

বৃদ্ধ ওই কথায় উত্তেজিত না-হয়ে শান্ত গলায় বলল, 'তুমি একটা পাগল। একটা কথা মনে রেখো, ব্যাবসার ক্ষেত্রে সুধাকরের যতটা বুদ্ধি আছে তা অন্য কারোর নেই। এই বছর তোমার কাছে সস্তায় পেয়ে, আরবের লোক যদি জিনিসপত্র কেনে তা সত্ত্বেও লোকে সুধাকরকেই প্রশংসা করবে। এই নগরের যদি কেউ তোমার প্রশংসা করে তাহলে মনে রেখ সুধাকরই করবে। সুধাকর যেমন যোগ্যতার সঙ্গে নিজের ব্যাবসা বাড়াতে পারে তেমনই অন্যকে প্রশংসাও করতে পারে।'

সারঙ্গ ভালোভাবেই জানে, সুধাকরকে এই নগরের বিখ্যাত লোক প্রশংসা করে। সারঙ্গের নিজের ধারণা, সে খুব বুদ্ধিমান। তার বুদ্ধির কাছে অন্যদের বুদ্ধির দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। একই ধরনের ব্যাবসা করে সুধাকরকে ছাড়িয়ে যাওয়াই হল সারঙ্গের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য।

অনেকক্ষণ বৃদ্ধের কথা শুনে সারঙ্গ বলল, 'আচ্ছা, সুধাকরের কাছে প্রশংসা পেতে হলে আমাকে কী করতে হবে?'

'সুধাকর যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, সে পারে না এমন কাজও আছে। যে সেই কাজ করে সুধাকর তাকেই প্রশংসা করে।' বৃদ্ধ বলল।

একদিন সে সুধাকরের কাছে গিয়ে বলল, 'শুনেছি আপনি নাকি খুব বুদ্ধিমান। বুদ্ধিতে আপনার নাকি নাগাল পাওয়া যায় না। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে আপনার এবং আমার মধ্যে কার বুদ্ধি যে বেশি সেটা পরীক্ষা করার। এখন আপনিই বলুন কোন কাজটা পারেন না। আপনার কথা শুনে আপনি যা পারেননি আমি তাই করব।'

সুধাকর সারঙ্গকে সাদরে বরণ করে বলল, 'আমি পারিনি এ-রকম কাজ তো অনেক আছে। আমি যেগুলো পারিনি সেগুলোর মধ্যে আপনি কিছু কাজ পারবেন। তবে আমিও পারব না, আপনিও পারবেন না এই ধরনের কাজ একটি আছে। সেই কাজ হল শ্রবন্তিনগরের মুত্যগুপ্তের বাড়ি থেকে সবুজ হার নিয়ে আসা।'

'নিয়ে আসা মানে? কিনে, না চুরি করে?' সারঙ্গ প্রশ্ন করল।

'কোনোটাতেই এখন আমার আপত্তি নেই। আমি সেটা চাই, এই যা। ছলে, বলে, কৌশলে যেভাবে আনতে পারবেন, আনবেন।' সুধাকর বলল।

সারঙ্গ বেরিয়ে পড়ল সেই হারের সন্ধানে। টানা দু-দিন পায়ে হেঁটে শ্রবন্তিনগরে পৌঁছাল। সেখানে জনে জনে অনেকেই জিজ্ঞাসা করল, অনেক ব্যাবসাদারকেও জিজ্ঞেস করল। তবু মুত্যগুপ্তের সন্ধান কেউ দিতে পারল না। সারঙ্গ হতাশ হল। ফিরবে কিনা ভাবছে এমন সময় এক ব্যাবসাদার জানতে পারল সারঙ্গকে সুধাকর পাঠিয়েছে। এটা জানতে পেরে সেই ব্যাবসাদার সারঙ্গকে বলল, 'মুত্যগুপ্ত নামে একজন শিবমন্দিরের পাশের ঘরে থাকে। আমার ধারণা সে সুধাকরের বন্ধু।'

খবর পেয়েই সারঙ্গ মুত্যগুপ্তের বাড়ির সন্ধানে গেল। শিবমন্দিরের পাশেই ছিল মুত্যগুপ্ত। যেখানে সে ছিল সেটাকে বাড়ি বলা যায় না। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ছোটো একটা ভাঙাচোরা ঘরে সে ছিল। এ-রকম একটা গরিব লোকের যে কোনো দামি হার থাকতে পারে তা সারঙ্গের ধারণারও অতীত।

যাইহোক, সারঙ্গ মুত্যগুপ্তের সঙ্গে আলাপ জমাল। কিছু কথার পরে মুত্যগুপ্ত বলল, 'আমার আত্মীয়স্বজন সবাই ধনী। আমিই শুধু গরিব। এর ওর বাড়িতে খেয়ে কোনোরকমে দিন কাটাই। সারাদিন পেটের ধান্দায় ঘুরে রাত্রে শুধু এই ঘরে আসি ঘুমোতে।'

মনের কথা চাপতে না পেরে সারঙ্গ বলল, 'অনেকেই গরিব থাকে, কিন্তু কোনো কোনো গরিবের একটা দামি হারও থাকে।'

সঙ্গে সঙ্গে মুত্যগুপ্ত বলল, 'আমার এই ঘরে যা আছে তার থেকে যেকোনো জিনিস আপনি নিয়ে যেতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই।'

এই কথার পর আর তো কিছু বলার থাকে না। সারঙ্গ অনেক কৌশল করে দু-দিন হারটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পেল না। বিরক্ত হয়ে ফিরে গেল। আবার দু-দিন হেঁটে মাতঙ্গ নগরে পৌঁছে সুধাকরের কাছে গিয়ে তাকে বলল, 'আপনি আমাকে মিথ্যা কথা বলেছেন। মুত্যগুপ্ত অত্যন্ত দরিদ্র লোক। ওরা যা অবস্থা তাতে ওর কাছে হার থাকা স্বাভাবিক নয়। যার কাছে যা নেই তার কাছ থেকে সেটা আনব কী করে?'

'আমি মিথ্যা কথা বলিনি। মুত্যগুপ্তের কাছে হার আনতে বলেছি। তার কাছে ওই হার আছে কী নেই তা তো বলিনি।' সুধাকর বলল।

'যার কাছে যা নেই তা কি আনা যায়?' সারঙ্গ রেগে বলল।

'এমন সময় বেরিয়ে পড়লেন যে সময় আরবের খদ্দেররা এখানে এল। ওরা এসে যথারীতি আমার কাছে জিনিসপত্র কিনে নিয়ে গেল।' সুধাকর সবিনয়ে বলল।

'ওফ! আপনি যে এত বড়ো ধোকাবাজ তা জানতাম না।' সারঙ্গ বলল।

'এখন আমি একটা কথা বলছি যা আমি পারব না, তুমি পারবে।' সুধাকর বলল।

সারঙ্গ প্রশ্ন করল, 'কোন কাজ?'

'ইচ্ছে করলে তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে পারো।' সুধাকর বলল।

শুনে সারঙ্গ অবাক হয়ে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, সুধাকর যদি সত্যিই বুদ্ধিমান হয়ে থাকে তবে আরও আগে থেকে এমন কিছু করল না কেন যাতে সারঙ্গের ব্যাবসা মাটি হয়ে যায়। যাকে ঠকাল তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি ঠিক হয়েছে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'সুধাকর সারঙ্গকে জামাই করে নিজের বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। যে ধৈর্য এবং উদ্যোগ থাকলে একজন ব্যাবসা চালাতে পারে সেটা ছিল বলেই সারঙ্গ হারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিল। কোনো লোক যদি নিজেকে চালাক ভাবে সেটা খারাপ নয়, খারাপ হল নিজেকে বোকা ভাবা। সারঙ্গ জীবনে বুঝেছিল অন্য ব্যাবসাদারকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করা কোনো ব্যাবসাদারের ইচ্ছা নয়। সারঙ্গের উদ্যোগ, উদ্যম এবং তৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে সুধাকর তাকে জামাই করেছিল।'

রাজা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

অধ্যায় ৫৫ / ৫৫
সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%