ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে এসে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তোমার এই পরিশ্রম যদি অপূর্ব কোনো ক্ষমতা অর্জনের জন্য হয়, তাহলে সেই ক্ষমতা বা শক্তিকে বিশ্বশ্লোকের মতো অপদার্থের হাতে কখনো সঁপে দিও না। বিশ্বশ্লোকের কাহিনি বললে তোমার শুনতে ভালো লাগবে আর পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল বিশ্বশ্লোকের কাহিনি বলতে শুরু করল:
প্রাচীন কালে বিশ্বশ্লোক নামে এক ব্রাহ্মণ ছিল। মন্ত্রশক্তির উপর তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। সেই শক্তিকে অর্জন করার জন্য সে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে সিদ্ধপুরুষের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এইভাবে বহুদিন ধরে খোঁজাখুঁজি করার পর বিন্ধ্যপর্বতে সে এক সিদ্ধপুরুষের সন্ধান পেল। বিশ্বশ্লোক দিনরাত সেই সিদ্ধপুরুষের সেবা করে তাঁর কাছ থেকে একসঙ্গে দুটো রূপ ধারণ করার শক্তি পেল।
'এটা তুমি যাকে-তাকে শিখিও না। যাকে শেখালে জগতের মঙ্গল হবে এমন লোককেই শেখাবে।' বলে তার গুরু বার বার তাকে উপদেশ দিল।
গুরুর কাছে বিদায় নিয়ে বিশ্বশ্লোক দেশে দেশে ঘুরে নিজের এই দুই রূপ ধারণের অসীম ক্ষমতা দেখিয়ে যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করল।
এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে সে গেল কলিঙ্গ দেশে। তখনকার কলিঙ্গদেশের রাজা ছিলেন দানশীল। রাজা বিশ্বশ্লোককে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, 'হে মহাত্মা, আপনার এই দুই রূপ ধারণ করার ক্ষমতা দেখে আমি অবাক হয়েছি। আপনি তো দেখেছেন আমি প্রজাদের কত সুখে রেখেছি। আপনার এই অসীম ক্ষমতা আমি যদি পেতাম তাহলে আমি আমার প্রজাদের আরও বেশি করে সেবা করতে পারতাম।'

এই ঘটনার কিছুদিন পরে অন্য এক দেশে বিশ্বশ্লোকের খেলা দেখে সেই দেশের রাজকুমারী তাকে বলল, 'হে মহাপুরুষ, আপনি আমার পিতার তুল্য। আমি নিজের একটি সমস্যা নিবেদন করছি। আমাদের আশেপাশে দুটো দেশের দুই যুবরাজ আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে আমাকে বিয়ে করতে চায়। একজনকে বিয়ে করলে অন্য যুবরাজ ভীষণ চটে যাবে। তার ফলে হয়তো ওরা আমাদের আক্রমণ করবে। আমাদের চেয়ে আশেপাশে দুটো দেশই যুদ্ধের ব্যাপারে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই অবস্থায় দুটো রূপ ধারণ করার বিদ্যা যদি আমাকে শিখিয়ে দেন তাহলে আমি এই সমস্যার সমাধান করতে পারি।'
'আমি ছ-মাসের মধ্যে আমার মত জানাব।' বলে বিশ্বশ্লোক সেখান থেকে চলে গেল।
কাশ্মীরের এক রাজবৈদ্য বিশ্বশ্লোকের হাতে-পায়ে ধরে বলল, 'আপনার মতো মহান পুরুষ আমি আর দেখিনি। আপনি যদি অনুগ্রহ করে আমাকে দুই রূপ ধারণ করার ক্ষমতা দেন তাহলে আমি বিশেষভাবে উপকৃত হব।'
বিশ্বশ্লোক ছ-মাসের মধ্যে নিজের মত জানানোর কথা দিয়ে ফিরে গেল।
তারপর বহুদিন পরে সে একটি দেশে গেল। সে দেশের নাম ছিল চন্দনদেশ। সেখানকার লোক খেতে পাচ্ছিল না। যখন-তখন ওদের উপর চোর-ডাকাতরা অত্যাচার চালাত। সেই দেশের নামকরা ডাকাতের নাম ছিল গঙ্গোত্রী। তাকে লোকে বাঘের মতো ভয় করত। তাকে ধরার জন্য সেদেশের রাজা অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনো ফল হল না। চন্দনদেশের রাজা বিশ্বশ্লোকের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রজাদেরও ওই খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করলেন। একই লোককে দুটো চেহারা ধারণ করতে দেখে প্রজারা খুবই অবাক হয়ে গেল।
কিন্তু সেদিন রাত্রেই বিশ্বশ্লোকের ঘরে ডাকাত গঙ্গোত্রী ঢুকল। সে সোজা তার সামনে এসে বলল, 'জানো, আমি কে? আমার নাম গঙ্গোত্রী। তোমার খেলা আমি দেখেছি। ওই খেলা আমাকে শিখিয়ে দাও, নাহলে আমি তোমার মুণ্ডু কেটে ফেলব।'
বিশ্বশ্লোক হেসে বলল, 'ওই একটা খেলা শেখালেই কি হবে? না অন্যগুলোও তুমি শিখতে চাও?'
'অন্যগুলো শিখে কী হবে? ওই একটাতেই আমার কাজ চলে যাবে।' বলল গঙ্গোত্রী ডাকাত।
'একটা শর্তে শেখাতে পারি। এই বিদ্যা শিখে তুমি কী করবে তা আমাকে জানাতে হবে।' বিশ্বশ্লোক বলল।
'প্রত্যেক দিন চুরি করতে বেরোতে হয়। এ আমার আর ভালো লাগছে না। আমি চাই মারি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার। একবার রাজার খাজনা খালি করতে পারলে সারাজীবন সুখে বসে খেতে পারব। এই ধরনের কাজ করতে হলে ভীষণ বিশ্বাসী লোক চাই। কিন্তু আমি কাউকে বিশ্বাস করি না। তাই তোমার এই বিদ্যা আমি শিখতে চাই।' গঙ্গোত্রী বলল।
'তুমি যা পাবে তার চার ভাগের এক ভাগ আমাকে দিতে হবে। তবে জেনে রাখো— তোমার একটি শরীর ব্যথা পেলে তুমি অন্য শরীরেও ব্যথা পাবে। আমার বিনা অনুমতিতে তুমি এই বিদ্যা অন্য কাউকে শেখাতে পারবে না। আমার এই সব শর্ত তুমি মেনে চলতে রাজি আছ?' বিশ্বশ্লোক জিজ্ঞাসা করল।
'অত শর্তের কী আছে! আমার তো এই বিদ্যা দরকার শুধু একদিনের জন্যে।' গঙ্গোত্রী চটপট জবাব দিল।
বিশ্বশ্লোক ওই ডাকাতকে দুই রূপের বিদ্যা শিখিয়ে দিয়ে রাজার কাছে গেল। ডাকাত গঙ্গোত্রী যে তাঁর কোষাগার লুণ্ঠন করার তালে আছে তা রাজাকে জানিয়ে বিশ্বশ্লোক নিজের পথে ফিরে গেল।
বেতাল এই কাহিনি বলে রাজা বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞেস করল, 'রাজা, বিশ্বশ্লোক যে-বিদ্যা কলিঙ্গের রাজা, রাজবৈদ্য ও রাজকুমারীকে শেখাল না তা একটা ডাকাতকে শেখাল কেন? প্রাণের ভয়ে? নাকি চার ভাগের এক ভাগ পাওয়ার আশায়? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'টাকাপয়সার লোভ থাকলে বিশ্বশ্লোক রাজা, রাজকুমারী অথবা রাজবৈদ্যকে ওই বিদ্যা শিখিয়ে দিত। ডাকাতকে শিখিয়ে সে ভাগ নেওয়ার আশায় সেখানে অপেক্ষা করেনি। সে চন্দনদেশের রাজাকে গোপনে জানিয়ে নিজের পথে চলে গেল। তার কোনো প্রাণের ভয় ছিল না। সে রকম অবস্থায় সে অন্য রূপ ধারণ করে বেঁচে যেতে পারত। ডাকাতকে শিখিয়ে সে দেশের উপকারই করেছে। ঠিক সময়ে গঙ্গোত্রী ডাকাতকে ধরার জন্যই সে রাজাকে আগেভাগে সব কিছু জানিয়ে দিল। রাজা, রাজকুমারী বা রাজবৈদ্যকে শিখিয়ে দেশের কোনো উপকার হত কি না সন্দেহ। ঠিক সময়ে ধরতে না পারলে গঙ্গোত্রী যখন ভাগ দিতে বিশ্বশ্লোকের কাছে আসত তখন সে তাকে রাজার লোকের হাতে তুলে দিতে পারত। এইভাবে একজন ভয়ংকর ডাকাত ধরা পড়ত।'
রাজা বিক্রমাদিত্য উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন