ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছোড়বান্দা বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি তিনি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। এমন সময় শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি হয়তো কোনো পাপ করেছ। সেই পাপের ফল যাতে ভোগ করতে না হয় তারজন্যই তুমি হয়তো এত পরিশ্রম করছ। এই ধরনের একটি ঘটনা আমি জানি। শরভকুমারের কাহিনি বললে আমার বক্তব্য পরিষ্কার হবে এবং তোমার পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বেতাল কাহিনি শুরু করল:
শরভকুমার ছিল কোটিপতির ছেলে। বাপের মৃত্যুর পর দু-হাতে টাকা ছড়িয়ে সে নানা ধরনের সুখের আয়োজন করল। বেশি সুখ আনন্দ ভোগ করার জন্য সে কিছু কিছু পাপ কাজও করেছিল। এইভাবে কয়েক বছর একটার পর একটা পাপ কাজ করে কাটানোর পর, বয়স পড়ে যাওয়ার পর তার মনে অনুতাপ এল।
একদিন সে ঠিক করল, আর কোনো পাপ কাজ সে করবে না। বাকি জীবনটা সে দানধর্ম করে পুণ্য অর্জনের চেষ্টা করবে।
কিছুকাল দু-হাতে দান করার পর অনেকে তাকে দেবতা হিসাবে গণ্য করতে লাগল। ভিখিরিরা শরভকুমারের এই পরিবর্তিত আচরণ দেখে অবাক হয়ে যেত। শরভকুমারের ছেলেরা বাপকে এত অপচয় করতে বারণ করল। তার বউ ভাবল, স্বামী পাগল হয়ে গেছে। দিনরাত দান করতে দেখে শেষে ছেলেরা তাদের নিজেদের ভাগ চেয়ে বসল। শরভকুমারের স্ত্রীও ছেলেদের পক্ষ নিল। শেষে ভাগ করতে হল।
যে যাই বলুক শরভকুমার যথারীতি দান করে যেতে লাগল। এইভাবে বেশ কিছুকাল দান করার পর তার ভাগের সমস্ত সম্পত্তি শেষ করল। এমনকী সে নিজের থাকার ঘরটাও বিক্রি করে দান করল। তারপর সে বেরিয়ে পড়ল তীর্থযাত্রায়। তীর্থযাত্রায় বেরোনোর পর একদিন এক গভীর বনে ব্রহ্মদৈত্য তার পথ আগলে বলল, 'আপনি দয়া করে আমার একটা উপকার করবেন?'

শরভকুমার ব্রহ্মদৈত্যের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, 'কীভাবে তোমার উপকার করতে হবে?'
'আমি অনেক পাপ করেছি। তারই ফলে এই ব্রহ্মদৈত্যের জীবনযাপন করছি। আপনি আপনার পুণ্য আমাকে দান করলেই আমার মুক্তি হবে।' ব্রহ্মদৈত্য বলল।
'নিশ্চয় দান করব।' বলে শরভকুমার নিজের অর্জিত পুণ্য অবলীলাক্রমে তাকে দান করল।
কিন্তু দেখা গেল ব্রহ্মদৈত্যের রূপ বদলায়নি। তখন ওই ব্রহ্মদৈত্য বলল, 'ওহে শরভকুমার, তোমার কোনো পুণ্য অর্জিত হলে তো তুমি আমাকে দান করবে। তোমার অর্জিত কোনো পুণ্য নেই।'
ঠিক সেইসময় আকাশপথে একটি বিমান ওদের সামনে নামল। ব্রহ্মদৈত্য পরমানন্দে ওই বিমানে উঠতে গেল। কিন্তু বিমান চালক ব্রহ্মদৈত্যকে ঠেলে ফেলে দিয়ে শরভকুমারকে বিমানে তক্ষুনি তুলে নিল। ব্রহ্মদৈত্যের চোখের সামনে বিমান আকাশপথে উড়তে লাগল।
এই কাহিনি বলে বেতাল বলল, 'রাজা, সব কিছু দান করার পরেও শরভকুমারের পুণ্য অর্জিত হল না কেন? নাকি সে যা পাপ করেছিল তার সঙ্গে তার অর্জিত সুনামের সমান হয়ে গেল? পুণ্য দান হিসাবে পেয়েও ব্রহ্মদৈত্যের মুক্তিলাভ হয়নি। অথচ পরমুহূর্তেই শরভকুমারকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিমান এসে গেল। আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হবে।'

বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'শরভকুমারের পুণ্য অর্জিত হয়নি এই ধারণা ভুল। যে মুহূর্ত থেকে শরভকুমার অতীত জীবন সম্পর্কে অনুতপ্ত হল সেই মুহূর্ত থেকেই তার পুণ্য অর্জন শুরু হল। শরভকুমারের তুলনায় ব্রহ্মদৈত্য অতি নীচ। তা না হলে সে অন্যের অর্জিত পুণ্য দিয়ে মুক্ত হতে চাইত কেন। তার এই স্বার্থবুদ্ধির জন্যই তাকে ব্রহ্মদৈত্য হিসাবেই থাকতে হল। তাই শরভকুমারকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিমান পাঠিয়ে দেবতারা সঠিক কাজই করেছেন।'
রাজার উত্তর শুনেই বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন