ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ওই গাছের কাছে ফিরে গেলেন। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, কোনো এক অদ্ভুত শক্তির অধিকারী হওয়ার জন্য তুমি হয়তো চেষ্টা করছ। তোমার এই নিষ্ঠাপূর্ণ প্রয়াস অভিনন্দনযোগ্য। তার কারণ মানুষকে সৎপথে রাখতে হলে সাম্য, দানদক্ষিণা, বিভেদসৃষ্টি প্রভৃতি নানা পন্থার চেয়ে অদ্ভুত শক্তির প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি কার্যকরী! আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে আমি ভীম নামক একজনের অদ্ভুত শক্তি অর্জনের কাহিনি বলব। আমার এই কাহিনি শুনতে শুনতে পথ চললে পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
এক চাষির নাম ছিল ভীম। বাপের মৃত্যুর পর নিজে চাষ-আবাদের কাজে নামল। নিজেই লাঙল চালাত, বীজ বুনত। হঠাৎ একদিন লাঙলের ফলায় কী যেন ঠেকল। ভীমের কৌতূহল জাগল। সে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে জিনিসটাকে বের করার চেষ্টা করল। প্রথমে কোদালে ঠেকল একটা পাথর। তারপর সে পেল একটা কলসি। কলসির নীচে একটি বিচিত্র ধরনের হার এবং একটি তালপাতার পুঁথি।
ভীম লাঙল চালানো বন্ধ করে ওই গর্ত থেকে হার এবং পুঁথি নিয়ে বাড়ি ফিরল। পুঁথি পড়ে জানতে পারল ওই হারের বিষয়ে অনেক কিছু।
ওই হার গলায় দিয়ে যার সামনে দাঁড়াবে তার মনের কথা জানা যাবে। অনেক বছর আগে দয়ানিধি নামে একজন যোগীর কাছ থেকে ওই হার সংগ্রহ করতে পেরেছিল। ওই যোগীর কাছ থেকে দয়ানিধি ওই হারের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারল। দয়ানিধি ওই হার গলায় দিয়ে বহু বড়ো বড়ো লোকের সঙ্গে দেখা করেছিল। ওদের মনের কথা জানতে পেরে ওদের শাসিয়ে বলেছিল, 'তুমি এইসব কথা ভাবছ! আমি সবাইকে তোমার এই মনের কথাগুলো জানিয়ে দেব।' ওইসব বড়লোক দয়ানিধির কথা শুনে ভয় পেয়ে তাকে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করত। দিনের পর দিন একইভাবে অর্থ রোজগার করে সেটাতেই তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। সেই হার গলায় দিয়ে একদিন সে আবিষ্কার করল তার স্ত্রী তাকে ভালোবাসে না। রাগে, অভিমানে, ক্ষোভে সে স্ত্রীকে হত্যা করল। তারপর কিছুদিন পরে তার জীবনে পরিবর্তন এল। জীবনের প্রতি তার ঘৃণা এবং বিরক্তি জাগল। ওই হার গলায় পরে কার মনের কথা জানতে পেরেছে এবং জানতে পেরে সে কী করেছে ইত্যাদি বিষয়ে ওই তালপাতার পুঁথিতে লিখে মাটিতে পুঁতে দিল।
এইসব কথা তালপাতায় লেখা ছিল। পড়ে ভীমের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। হার সম্পর্কে কিছুক্ষণ ভেবে সে আপন মনে বলল, 'আচ্ছা! এই হার গলায় দিয়ে আমি তো এমন কিছু করতে পারি যাতে দেশের মানুষের উপকার হয়।' যাই হোক, হারের আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য ভীম গলায় ওই হার পরে কৃষ্ণের বাড়িতে গেল। কৃষ্ণ ভীমের কাছে কিছু পেত। সেটা ফেরত দেওয়ার জন্য ভীম তার বাড়িতে গেল।
কৃষ্ণ ছিল জমিদার রতনলালের ছোটো ভাই। ভীম যখন কৃষ্ণের কাছে গেল তখন কৃষ্ণ ভাবছিল কী করে তার দাদাকে হত্যা করবে। ব্যাপারটা জানতে পেরে ভীম কৃষ্ণকে বলল, 'কৃষ্ণ, যদি তুমি কিছু মনে না করো তাহলে একটা কথা বলছি। তোমার দাদা ধর্মাত্মা লোক, তাকে মেরে ফেলার পাপচিন্তা করছ কেন? তুমি তোমার এই চিন্তা ত্যাগ করো।'
কৃষ্ণ মুহূর্তকাল নীরব রইল। তার মুখ ক্রমশ সাদা হয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে মুখে হাসি এনে ভীমকে বলল, 'কী যে বলছ ভীম, আমি কোন দুঃখে দাদাকে মেরে ফেলতে যাব। এসব আজেবাজে কথা তোমাকে কে বলেছে?'
'যেই বলুক, তুমি কিন্তু পাপচিন্তা ত্যাগ করো। আর এই নাও তোমার পাওনা টাকা।' বলে ভীম কৃষ্ণের প্রাপ্য টাকা তাকে ফেরত দিল।
ফেরার পূর্ব মুহূর্তে ভীমের মনে হল, কৃষ্ণ তার পেছনে দুটো লোক পাঠিয়ে তাকে মেরে ফেলার চিন্তা করছে। এটা জানার পর ভীম আঁকাবাঁকা পথে অন্ধকারে ছুটে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল।
কৃষ্ণ যাদের পাঠিয়েছিল ভীমকে হত্যা করতে তারা কিছুদূর গিয়ে তাকে আর খুঁজে না পেয়ে ভাবল, ভীম তাহলে সোজাপথে যায়নি। অগত্যা ওরাও আঁকাবাঁকা পথে, পা চালিয়ে হেঁটে ভীমকে ধরার চেষ্টা করল।
ভীম অন্ধকারে লুকিয়ে ওই দু-জনকে সুযোগ বুঝে এক এক করে দু-জনকেই মেরে গাছে বেঁধে জমিদারের কাছে খবর পাঠাল!

তারপর থেকে ভীম ওই হার দিয়ে বহু লোকের প্রাণ বাঁচাল। সে ওই হার গলায় দিয়ে একদিন বিজয়লক্ষ্মীর সামনে দাঁড়িয়েছিল। ভীম জানতে পারল যে সে তাকে ভালোবাসে। তারপর বিজয়লক্ষ্মীর বাবার সঙ্গে দেখা করে নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করল। পরে ওদের বিয়ে হল।
কিছু কিছু ঘটনা লক্ষ করে গ্রামের লোক বুঝতে পারল ভীম অনেকের মনের কথা জানতে পারে। ওই হার পরে ভীম যখন চোরদের সামনে দাঁড়াত সে তাদের মনের কথা বুঝতে পারত। কবে, কোথায় ওরা চুরি করবে তা সে জানতে পারত। জানতে পেরে রাজ-প্রহরীদের জানিয়ে দিত। ফলে চোরগুলো ধরা পড়ত।
আরও কিছুদিন পরে এমন অবস্থা হল যে ভীমের সামনে দাঁড়াতে লোক ভয় পেত। দেখতে দেখতে লোকে খারাপ চিন্তা করা কমিয়ে ফেলল। তাদের মনে সবসময় একটা ভয় থাকত এই বুঝি ভীম এসে মনের সব কথা জেনে গেল। কারও কারও ইচ্ছে করছিল ভীমকে মেরে ফেলবে। কিন্তু ওই চিন্তা নিয়ে ভীমের সামনে গেলেই তো সে টের পাবে— সেই ভয়ে কেউ তার সামনে যেত না।
ভীমের ওই অসীম ক্ষমতার মূলে যে ওই হার ছিল তা কেউ জানত না। আরও কিছুদিনের মধ্যে ভীমের এই অসীম ক্ষমতার কথা আরও বহুলোক জানতে পারে। কেউ কেউ ভীমকে জিজ্ঞাসা করে তাদের সম্পর্কে কে কী ভাবছে। একজন সম্পর্কে আর একজন কী ভাবছে সেটা জানতে পারত ভীমের মাধ্যমে।
এভাবে কিছু লোকের কথামতো চলার পর ভীম বুঝতে পারল সে যা করছে তাতে বিপদের আশঙ্কা আছে। কারণ, অভিজাত পরিবারের লোক একে অন্যকে শত্রু ভাবে, একজন অন্যজনকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে, একের কথা অন্যকে জানালে শেষ পর্যন্ত তাতে যে কার লাভ হবে সেটা ভীম বুঝে উঠতে পারল না। এইভাবে কিছুকাল চলার পর ভীম আর একের কথা অন্যকে জানাত না। ওকে যারা অন্যের কথা জেনে বলার জন্য টাকা দিয়ে নিয়ে যেত তাদের সে এলোমেলো কথা বলে যেত।
গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে ভীমের বিষয়ে জানতে পারল মোড়ল, মোড়লের কাছ থেকে কোতোয়াল, সেনাপতি, মন্ত্রী এবং পরিশেষে রাজা। রাজার কানে ভীমের এই অসীম ক্ষমতার কথা যেতেই সে ভীমকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, 'বলতো ভীম, আমি এখন কি ভাবছি?'
'মহারাজ! আপনি এখন ভাবছেন যে আমি এখন আপনার মনের কথা বলতে পারব কি না?' ভীম সগর্বে বলল। রাজা অনুধাবন করল ভীমের সত্যি সত্যিই একটা ক্ষমতা আছে।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে রাজা আবার ভীমকে ডেকে পাঠিয়ে বলল, 'বলতো, আজকে আমি কেন তোমাকে ডেকেছি?'
ভীম বলল, 'রানির বিষয়ে আপনি আমার কাছে বিশেষ কিছু জানতে চান।'
'তুমি এক কাজ কর, তুমি এই চিঠি রানিকে দিয়ে, চিঠির জবাবে উনি কী বলেন সেটা শুনে আর ঠিক সেইসময় ওনার মনের কথা কি ছিল তা জেনে আমাকে গোপনে জানিয়ে দাও।' রাজা বলল।
ভীম রাজার চিঠি রানিকে দিল; চিঠি পড়ে রানি বলল, 'ঠিক আছে।'
ওই চিঠিতে লেখা ছিল: 'আজ সন্ধের সময় গানের ব্যবস্থা করব।'
ভীম রানির মনের কথা বুঝতে পারল। রাজার প্রতি রানির একটুও ভালোবাসা ছিল না। রানির ভালোবাসার পাত্র ছিল অন্য।
ভীম রাজার কাছে এসে বলল, 'মহারাজ, রানি পতিব্রতা নারী।'
রাজা খুশি হয়ে গলার হার ভীমকে দিল।
সেদিন রাত্রে ভীম নিজের হার উনুনে আগুনে ফেলে দিল; কিছুক্ষণের মধ্যেই পুড়ে গেল।
ভীম সেই রাত্রেই ধনীদের দেওয়া ধনসম্পত্তি নিয়ে অন্য দেশে রওনা দিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, অমন অদ্ভুত শক্তি সম্পন্ন হার ভীম কি করে উনুনে ফেলে দিতে পারল? আর যাই হোক হারটা তো ভীমের এবং অন্যের অনেক উপকার করেছিল। হারের রহস্য সে ছাড়া অন্য কেউ তো জানত না। গলায় ওই হার ধারণ করলে ভীমের এমন কি অসুবিধা হত? কেন সে পুড়িয়ে দিল রাজা? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'যেকোনো শক্তিকে ধনীরা নিজেদের ইচ্ছাপূরণের জন্য ব্যবহার করতে পারে। যারা দুর্বল তারা যদি ওই অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন হারের ভয়ে মিথ্যা কথা বলাও বন্ধ করে তা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত হারের ক্ষমতা ধনীদের মর্জির গোলাম হতে বাধ্য। সে যা করতে চেয়েছিল তা তার পক্ষে সম্ভব হল না। ভীম সোজা সরল মানুষ। ওই হারের ফলে ভীম আবিষ্কার করল তার জীবনের সারল্য চলে যাচ্ছে। তাই সে ওই হারটাকে আগুনে দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল!'
রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন