ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, দেশ শাসনের কাজ ছেড়ে দিয়ে শিকারের কাজে নামলে অরণ্যকুমারের মতো তোমারও অভিজ্ঞতা হত। রাজা, সেই অরণ্যকুমারের কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনলে তোমার পথচলার শ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
চন্দ্রগিরির রাজা অমরপালের সঙ্গে কোনো রাজাই যুদ্ধে কখনো এঁটে উঠতে পারত না। অমরপালের প্রত্যেকটি যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মূল কারণ হল তার সেনাবাহিনীতে ছিল অসংখ্য শিকারি। ওই শিকারিদের একজন নেতা ছিল। চন্দ্রগিরির রাজা যা করতে বলত ওরা তাই করত।
এইভাবে বছরের পর বছর চলছিল। নেতার ছেলে, অরণ্যকুমার বড়ো হয়ে লক্ষ করল তাদের দলের লোকজনকে রাজা ইচ্ছামতো সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে নিচ্ছে।
এই ধরনের প্রশ্ন মনে জাগার পর একদিন অরণ্যকুমার তার বাবাকে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা বাবা, আমরা রাজাকে কর দিই কেন? আমাদের সম্পদ রাজা নিয়ে যায়। আমাদের ছেলেদের রাজা নিজের সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। রাজাকে এসব করার অধিকার কে দিল?'
অরণ্যকুমারের বাবা হেসে বলল, 'রাজার সেনাবাহিনীতে আমাদের লোক আছে এ তো আমাদের গর্বের কথা। রাজার বলে আমরা বলীয়ান।'

তারপর অরণ্যকুমারের বাবা সবাইকে ডেকে ঘোষণা করল, 'এরপর থেকে তোমাদের নেতা হবে অরণ্যকুমার। তোমাদের কী মত?' সঙ্গেসঙ্গে সবাই নেতার কথা মেনে নিল।
অরণ্যকুমারের নেতা হওয়ার পর রাজার লোক এসে চাল, চন্দনকাঠ, বাঘের চামড়া, কয়েকটি হাতি এবং পঁচিশ জন যুবককে নিয়ে যেতে চাইল।
অরণ্যকুমার রাজার লোককে পরিষ্কার বলে দিল, 'আমরা তোমাদের কোনো কর দেব না। আমরা কোনো রাজার অধীন নই। আমাদের এই অঞ্চলের উপর তোমাদের রাজার কোনো অধিকার নেই। আমরা কারও অধীন নই। আমরা এখন থেকে স্বাধীন। রাজা যদি তেমন খাদ্যের অভাবে পড়ে তাহলে আমরা তাকে সাহায্য করতে পারি। রাজার যদি কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন হয় তাহলে আমরা লোক দিতে পারি।'
অরণ্যকুমার যেন রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। এর পেছনে একটা কারণ ছিল। অরণ্যকুমার ভেবেছিল, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যথারীতি তাদের স্বজাতির ব্যাধরাও আসবে। তখন কায়দা করে তাদের আটকে রাখা যাবে। কিন্তু কার্যত তা হল না। ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যারা এল তাদের মধ্যে একজনও ব্যাধ ছিল না। রাজার সেনাদের কৌশলে বন্দি করতে পারল অরণ্যকুমারের দল। বন্দিদের প্রশ্ন করায় ওরা বলল, 'আমাদের সেনাবাহিনীতে যত ব্যাধ ছিল প্রত্যেককে রাজা কারাগারে ফেলে রেখেছেন।'
এই অবস্থায় কী যে করা যায় তা ভাবতে লাগল অরণ্যকুমার। ঠিক সেইসময় এমন একটি ঘটনা ঘটল যা তার আগে কোনোদিন ঘটেনি।

অরণ্যকুমারের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে মন্ত্রীর পাঠানো লোকদের বলল, 'দেখ, তোমরা রাজকুমারীকে মেরে ফেলতে পারবে না। এখন থেকে তোমাদের রাজকুমারী আমাদের শিবিরের লোক। রাজকুমারীকে এনে তোমরা আমাদের উপকার করেছ। তাই তোমাদের ছেড়ে দিচ্ছি। মন্ত্রী যা হতে চান আমিও তাই চাই। তোমাদের মন্ত্রীকে সিংহাসনে বসানোর ব্যাপারে আমিও সাহায্য করতে পারি। তোমরা তোমাদের মন্ত্রীকে একবার আমাদের কাছে পাঠিয়ে দাও। আমাদের দু-জনের মধ্যে কথা হলে উভয়পক্ষেরই লাভ হবে।'
এই খবর পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে মন্ত্রী গোপনে অরণ্যকুমারের সঙ্গে দেখা করতে এল। আসার সঙ্গেসঙ্গে অরণ্যকুমার মন্ত্রীকে মেরে ফেলল। রাজকুমারীকে সঙ্গে নিয়ে অরণ্যকুমার রাজার কাছে চলে গেল।
সমস্ত ঘটনা জেনে রাজা অরণ্যকুমারকে বলল, 'তোমার জাতের লোকজন আমার সেনাবাহিনীতে থাকার ফলে আমি অনেক যুদ্ধে জয়ী হতে পেরেছি। তবে এতদিন আমি তোমাদের কাছ থেকে যত উপকার পেয়েছি তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো উপকার করেছ তুমি। তুমি আমার একমাত্র মেয়েকে বাঁচিয়েছ, বিরাট চক্রান্ত থেকে আমাকে উদ্ধার করেছ। তুমি যে প্রশ্ন তুলেছ তোমার বাবা যতদিন নেতা ছিলেন ততদিন সেই প্রশ্ন ছিল না। আসলে তোমার বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমার যখন যা দরকার পড়ত আমি চেয়ে নিতাম। তবে তোমার আমলে যে প্রশ্ন তুলেছ সেটা আমি অমূলক মনে করি না। আর একটি কথা তোমার স্বজাতিদের কারাগারে নিক্ষেপ করার পেছনে মন্ত্রীরই হাত ছিল। মন্ত্রী ওদের বন্দি করার পর আমাকে জানিয়েছিল। এখন আমি চাই আমাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকুক। তোমার লোকজন রাজধানীতে থাকতে যদি অনিচ্ছুক হয়, অরণ্যে থাকতে পারে। তুমি ইচ্ছে করলে আজকেই ওদের নিয়ে যেতে পার।'
'না মহারাজ, ওরা আপনার কাছেই থাকুক। আপনার কাছে থাকলে ওরা সুশিক্ষা পাবে।' বলে অরণ্যকুমার রাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, অমরপাল যে দূত পাঠিয়েছিল সেই দূতের সঙ্গে অরণ্যকুমার ওই ধরনের ব্যবহার করল কেন? অত শক্তিশালী রাজার সেনাবাহিনী অরণ্যকুমারকে পরাজিত করতে পারল না কেন? রাজকুমারীকে অরণ্যকুমার উদ্ধার করল কেন? মন্ত্রী যে রাজার পতন চায়, রাজসিংহাসনে বসতে চায় এটা অরণ্যকুমার জানতে পারল কী করে? রাজার শত্রু অরণ্যকুমার মন্ত্রীকে মেরে ফেলল কেন? সবশেষে অরণ্যকুমার রাজার সঙ্গে মিটমাট করে ফেলল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা এক্ষুনি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'অরণ্যকুমারের বাবার সঙ্গে রাজার যে সুসম্পর্ক ছিল তার ভিত্তিতেই যে আদান-প্রদান ঘটত সেটা অরণ্যকুমারের জানা ছিল না। জানার সুযোগও অরণ্যকুমার পায়নি। কারণ প্রত্যেক বছর যা নিয়ে যেত তা রাজার লোক যথারীতি নিয়ে যেত এবং সেটা তারা কর আদায়ের মতোই নিয়ে যেত। ফলে অরণ্যকুমারের রাজার বিরুদ্ধ মনোভাব গড়ে উঠেছিল। তারপর রাজার লোক যখন জানাল যে কর না দিলে তাদের জাতের যেসব লোকজন সেনাবাহিনীতে আছে তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে, তখন অরণ্যকুমারের মনে রাজার বিরুদ্ধে ভীষণ রাগ জাগল। ডাকাত ধরার পর তার স্বজাতির লোককে রাজা যে বন্দি করেনি এ-রকম একটা সন্দেহ তার মনে জাগল। তার কাছ থেকে আহ্বান পেয়ে মন্ত্রী চলে আসার সঙ্গেসঙ্গে অরণ্যকুমার বুঝতে পারল মন্ত্রী কত বড়ো রাজদ্রোহী। তাই সে মন্ত্রীকে মেরে ফেলে রাজকুমারীকে রাজার কাছে ফেরত দিল। তাদের সঙ্গে রাজার সম্পর্ক যে কীসের ভিত্তিতে ছিল তা জানার পর অরণ্যকুমার নিজের জাতের লোককে ফিরিয়ে আনতে চাইল না।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন