ব্যাবসার ভাগ্য

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, সবাই সব কাজ পারে না, কেউ কেউ পারে। আর কিছুটা পাওয়ার ভাগ্যও থাকা চাই। ভাগ্যে নেই জানা সত্ত্বেও রতনশেঠ জিদ ধরে না থেকে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। আমার ধারণা, যা পারা যাবে না, যা পাওয়া যাবে না, তার বিষয়ে আশা ছেড়ে দেওয়াই ভালো। উদাহরণস্বরূপ আমি রতনশেঠের কাহিনি বলছি। শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল এই কাহিনি বলল:—

প্রাচীন কালে রত্নগিরিতে রতনশেঠ ও গোবিন্দশেঠ নামে দুই বন্ধু ছিল। জাতব্যাবসা না হলেও রতনশেঠ চাষ-আবাদের দিকেই ঝুঁকল। সে ব্যাবসার দিকে গেল না। গোবিন্দশেঠ ব্যাবসা করে ভালো পয়সা করেছিল।

গোবিন্দ একবার তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'আচ্ছা রতন, তোমার চোদ্দোপুরুষ ব্যাবসা করল আর তুমি চাষ করতে শুরু করে দিলে কেন?

'ব্যাবসা সইছে না ভাগ্যে?' রতন বলল।

বন্ধুর কথা শুনে রতনের মতিভ্রম ঘটল। সে গোবিন্দের সঙ্গে ব্যাবসায় অর্ধেক টাকা ঢালতে রাজি হয়ে গেল। স্ত্রীর বারণও রতন শুনল না। সে অর্ধেক জমিজায়গা বিক্রি করে সেই টাকা ব্যাবসায় ঢেলে দিল। ব্যাবসায় ঢালার পর তার ইচ্ছা করল গোবিন্দর সঙ্গে সমুদ্রে পাড়ি দিতে। বেরোনোর আগে হঠাৎ তার ইচ্ছা করল ছেলেদেরও সঙ্গে নিতে। শেষপর্যন্ত রতনের চারটি ছেলেও রওনা দিল।

সুগন্ধি জিনিসে জাহাজ বোঝাই হল। মাঝসমুদ্রে ঝড় উঠল। সেই ঝড়ে সমস্ত সুগন্ধি দ্রব্য ভিজে নষ্ট হয়ে গেল। ঝড়ের ঝাপটায় কোনোরকমে জাহাজটা একটা তীরে ভিড়ল। গোবিন্দ, রতন কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে সমুদ্রের অজানা এক তীরে উঠল। তারপর ভেজা সুগন্ধি জিনিস জলের দামে বিক্রি করে ওরা বাড়ি ফিরল।

রতনের বউ বার বার ঠাকুরদেবতার নাম করে বলছিল, 'টাকা যায় যাক ঠাকুর, আমার স্বামী ও ছেলেরা যে প্রাণে বেঁচে এসেছে এটাই আমার সৌভাগ্য।'

ব্যাবসার একটা নেশা আছে। ব্যাবসাদারকে মাঝে মাঝে এই নেশা পেয়ে বসে। ফলে তার জিদ চেপে যায়। রতন বাকি যে জমিজায়গা ছিল তা বিক্রি করে দিয়ে আবার সুগন্ধি জিনিস কিনে সমুদ্রে পাড়ি দিতে তৈরি হয়ে গোবিন্দকে বলল, 'কি হল, তুমি সমুদ্রে যাবে না?'

'আবার! না বাবা, আর যাব না।'

এবারেও রতন নিজের ছেলেদের সঙ্গে নিল। যথারীতি স্ত্রীর বারণ ছিল। কিন্তু রতন গোঁ ধরে রওনা দিল।

এবারে রতন অনেক টাকা লাভ করতে পারল। যেখানে চার গুণ লাভ করার কথা সে দশ গুণ লাভ করল। ফিরে এসে যে যত জমি বিক্রি করে দিয়েছিল তার দ্বিগুণ পরিমাণ জমি কিনে আরও অনেক জিনিস এবং গয়নাগাঁটি কিনে নিল।

রতনের লাভের অঙ্ক শুনে গোবিন্দ দুঃখে মাথা চাপড়াতে লাগল। সে অনুতপ্ত হয়ে বলল, 'যা হয়ে গেছে তার দুঃখ ভুলে যাওয়া অত সহজ নয়, তবে এখন থেকে বলে রাখছি, তুমি আগামী বারে যখন যাবে আমি অবশ্যই তোমার সঙ্গে যাব।'

'তুমি যে আমার সঙ্গে যাবে বলছ, তার আগে আমি আর যাব কি না জিজ্ঞেস করবে তো। শোনো গোবিন্দ, ব্যাবসা আমাদের চোদ্দোপুরুষের কাজ হলেও ঠাকুরদাদার আমল থেকে আমাদের ভাগ্যে সইছে না। তাই আর ব্যাবসায় নামছি না।' রতন বলল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, রতন হঠাৎ এ কী করল! সে যখন জানত যে ব্যাবসা তাদের ভাগ্যে সইছে না তখন দু-দু বার টাকা ঢালল কেন? প্রথম বারে অত টাকা খুইয়ে দ্বিতীয় বার ব্যাবসা করতে গেল কেন? আর দ্বিতীয় বার দশগুণ লাভ করেও ঝট করে ব্যাবসা করব না বলল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'চাষ এবং ব্যাবসা দু-রকমের কাজ। মানুষ যে ধরনের কাজ করে তার মনও সেই ধরনের হয়ে যায়। ব্যাবসার একটা মানসিকতা আছে। একটা জুয়াড়ির যত সাহস থাকে তার চেয়ে বেশি সাহস রাখে ব্যাবসাদার। শুধু সাহস নয়, ধৈর্য এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতাও থাকা চাই। রতন বুঝেছিল ব্যাবসাদারের ধৈর্য এবং সাহস তার মধ্যে নেই। এই বোধ থেকে সে ব্যাবসা ছেড়ে দিল। গোবিন্দর কথায় বাপঠাকুরদাদার মানসিকতা একবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। তাই সে হঠাৎ গোবিন্দর সঙ্গে ব্যাবসা করতে রাজি হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা পর পর দু-বার ঘটে না। তাই দ্বিতীয় বারে সমস্ত টাকা ঢেলে রতন ব্যাবসায় নেমে গেল। এটা তার একটা জুয়ো খেলা। এই জুয়োতে সে ভালোভাবেই জিতল। জীবনে জুয়ো খেলার ঝুঁকি দু-একবার নেওয়া যায়, সারাজীবন ঝুঁকি নেবার মানসিক অবস্থা রতনের ছিল না। সে আর একবার বুঝল সারাজীবন ধৈর্য এবং সাহস রেখে তার পক্ষে ব্যাবসা করা সম্ভব নয়। তাই সে আবার চাষের কাজ শুরু করে দিল।'

রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%