পদের লোভ নেই

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, সাধারণভাবে মানুষ ভাবে জগতে তার শক্তি যতটা থাকা উচিত ততটা নেই। আবার লক্ষ করা যায় কোনো চাকর তার প্রভুর কাছে কাজের জন্য প্রশংসা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়। কিন্তু দয়ানিধির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ করেছি। রাজা তার কাজে খুশি হয়ে তাকে উন্নত পদ দিলে সে কুণ্ঠাবোধ করে। এহেন লোককে কী বলা যায়? যদি মন দিয়ে শোনো তাহলে আমি তোমাকে এই দয়ানিধির কাহিনি বলব। এই কাহিনি শুনতে শুনতে পথ চললে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল দয়ানিধির কাহিনি শুরু করল:—

কলিঙ্গদেশের রাজা ছিল মার্তণ্ড। এই রাজার অধীনে যে সেনাবাহিনী ছিল তাতে দয়ানিধি কত বড়ো ছিল তা প্রমাণ করার একটাও সুযোগ না এলেও যুদ্ধের বিভিন্ন পর্বে কখন কোথায় কোন কৌশল অবলম্বন করতে হয় তা দয়ানিধির খুব ভালোভাবে জানা ছিল এবং সে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করত।

একদিন রাজা সদলবলে শিকারে বেরোল। রাজপ্রাসাদ দেখাশোনার এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দয়ানিধিকে দিয়ে গেল। প্রতিবেশী রাজার নজর ছিল কলিঙ্গদেশের উপর। রাজার সঙ্গে বড়ো বড়ো যোদ্ধা, সেনাপতি এবং বিরাট বাহিনীও গেছে শুনে প্রতিবেশী রাজা বীরবর্মা হঠাৎ এসে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে। এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। এই ধরনের আক্রমণের পূর্বপ্রস্তুতি কিছু না থাকলেও শত্রুর আক্রমণের সঙ্গেসঙ্গে দয়ানিধি যে কজন সৈনিককে কাছে পেল তাদের দেয়ালের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে শত্রুর উপর পাথর, তির, আগুন নিক্ষেপ করার আদেশ দিল। এত ধরনের আক্রমণ যে হবে তা অনুমান করতে না পেরে শত্রুপক্ষের সৈনিকরা হকচকিয়ে গেল। ওরা বিভ্রান্ত হয়ে কেউ নিহত হল কেউ পালিয়ে গেল। অবশেষে বাধ্য হয়ে বীরবর্মা নিজের, যে কজন সৈন্য তখনও বেঁচে ছিল তাদের নিয়ে ফিরে গেল। এদিকে দয়ানিধি মৃত সৈনিকদের মাটিতে পুঁতে আহত সৈনিকদের প্রাসাদের ভেতরে চিকিৎসার ব্যবস্থা করল।

তারপর মার্তণ্ড সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ সাজে সাজিয়ে প্রতিবেশী শত্রুরাজা বীরবর্মাকে আক্রমণ করতে রওনা হল।

এই ধরনের একটা কিছু যে ঘটবে সে বিষয়ে বীরবর্মার একটা আশঙ্কা ছিল। সে অন্যান্য রাজাদের সাহায্য নিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিল। ফলে রাজা মার্তণ্ডের আক্রমণের মোকাবিলা করতে তার কষ্ট হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যে মার্তণ্ডের সেনাবাহিনী পর্যুদস্ত হল। রাজা মার্তণ্ড বীরবর্মার হাতে বন্দি হল। মার্তণ্ডের সেনাবাহিনী লোককে বীরবর্মার দাস বানিয়ে নিল। পরিশেষে বীরবর্মা কলিঙ্গ দেশের রাজা হল।

দয়ানিধি নিজেকে শেষ মুহূর্তে কোনোরকমে বাঁচিয়ে কলিঙ্গ নগরে গা-ঢাকা দিয়ে সাধারণ নাগরিকের জীবনযাপন করছিল।

বীরবর্মা কলিঙ্গদেশ জয় করে প্রজাদের উপর অত্যন্ত অত্যাচার করতে লাগল। শত্রুর উপর যেভাবে আক্রমণ করে, কলিঙ্গদেশের প্রজাদের উপর বীরবর্মার সৈনিকরা সেইভাবে আক্রমণ করত। ওরা এত অমানুষিক অত্যাচার করত যে দেখে দয়ানিধির অসহ্য লাগল। তখন দয়ানিধি কিছু যুবকদের নিয়ে একটা দল গঠন করে গোপনে এবং পরিকল্পিতভাবে রাজা বীরবর্মা ও তার মুখ্য কর্মচারীদের বন্দি করে রাজা মার্তণ্ডকে মুক্ত করল।

রাজা মার্তণ্ডের মুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গেসঙ্গে গোটা কলিঙ্গ দেশের প্রজাদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্দীপনা দেখা দিল এবং তারা বীরবর্মার সৈনিকদের কুকুর-বিড়ালের মতো তাড়া করে মারতে লাগল।

রাজা সিংহাসনে বসেই বীরবর্মাকে মৃত্যুদণ্ড দিল। তার অধীনস্থ কর্মচারীদেরও চরম শাস্তি দেওয়ার পর রাজা মার্তণ্ড দয়ানিধির কার্যাবলীর প্রশংসা করে তাকে সর্বাধিনায়ক করা হবে বলে ঘোষণা করল।

সেইদিন রাত্রে দয়ানিধি বলল, 'মহারাজ, আপনি আমাকে আপনার সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ দেবার কথা ঘোষণা করেছেন। এই পদ গ্রহণ করার ক্ষমতা আমার নেই।' দয়ানিধি সবিনয়ে নিবেদন করল।

রাজা মার্তণ্ড তীক্ষ্নদৃষ্টিতে দয়ানিধির দিকে তাকিয়ে বলল, 'ঠিক আছে, কাল সকালের আগে তুমি দেশ ছেড়ে চলে যাবে।'

'ঠিক আছে মহারাজ, আমি চলে যাচ্ছি।' বলে দয়ানিধি চলে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, দয়ানিধি অত বড়ো পদ পেয়েও ত্যাগ করল কেন? দয়ানিধি কী দোষ করল যে রাজা তাকে দেশ ছেড়ে যেতে বলল? যে দয়ানিধি বীরবর্মার আক্রমণ থেকে রাজপ্রাসাদ রক্ষা করল, মার্তণ্ডকে সিংহাসনে বসাল তাকে কোন বিবেচনায় রাজা দেশ থেকে বের করে দিল? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রাজা মার্তণ্ডের ধারণা ছিল, দয়ানিধির রাজভক্তি গভীর। এই কথা ভেবে রাজা মার্তণ্ড তাকে সর্বাধিনায়কের পদ দিতে চাইলেন। কিন্তু দয়ানিধি ওই পদ নিতে না চাইলে রাজা মার্তণ্ড বুঝলেন যে দয়ানিধির মনে রাজভক্তির চেয়ে দেশভক্তি বেশি আছে। দয়ানিধি মানবতাবাদী। সেইজন্যেই সে শত্রুপক্ষের আহত সৈনিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। বীরবর্মা প্রজাদের অত্যাচার করেছিল বলেই দয়ানিধি তাকে সরিয়ে দিল। পরে মার্তণ্ড প্রজাদের উপর অত্যাচার চালালে দয়ানিধি তাকেও সরিয়ে দিতে পারে। এই ভয়ে দয়ানিধিকে রাজা বহিষ্কার করে দিলেন।'

রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%