ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সেইসময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, মানুষ শুধু যে অনেক বিষয়ে অজ্ঞ তাই নয়, অনেক সময় জ্ঞানের মর্যাদাও দিতে জানে না। উদাহরণস্বরূপ একজন সত্যিকারের জ্ঞানী পুরুষের প্রতি কত বড়ো অন্যায় অবিচার যে হয়ে গেল সে সম্পর্কে আমি একটি কাহিনি বলব। আমার এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে হাঁটার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—
দিবাকর নামে এক রাজা কাঞ্চনপুর শাসন করতেন। কাঞ্চনপুরে এল এক সাধু। সাধু এসে নগরের শেষপ্রান্তে নির্জন অঞ্চলে একটি ঘর বানিয়ে নিল। সাধুর আসার খবর পেয়ে, নগরপাল সাধুর কাছে ছুটে গিয়ে তাকে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা বিস্তারিতভাবে বলল। তার কাছে কী করলে তার উন্নতি হবে এবং কী না করলে তার উন্নতির পথে বাধা আসবে না তা বিস্তারিতভাবে জানতে চাইল। নগরপালের পর একে একে অনেকেই ওই সাধুর কাছে গিয়ে নিজেদের সমস্যা বলে সমাধান জানতে চাইল। সাধু ওদের বিভিন্ন জনকে নিয়ে পৃথক পৃথক ভাবে বসে কার ভাগ্যে কী আছে, কার কীভাবে চলা উচিত, কী করা উচিত তা বুঝিয়ে বলতে লাগল। প্রত্যেকে যে যার অতীতের কথা সাধুর মুখে শুনে অবাক হয়ে যেতে লাগল এবং সাধু যে প্রকৃত জ্ঞানী সেকথা প্রত্যেকে একবাক্যে স্বীকার করল। কেউ কেউ তাকে দিব্যজ্ঞানী বলল।
একজন দিব্যজ্ঞানী নগরে একপ্রান্তে আছে— এই কথা মুখে মুখে ছড়াতে ছড়াতে অবশেষে রাজার কানেও গেল। রাজা দিবাকর ভেবে পেল না ওই দিব্যজ্ঞানীকে দিয়ে কোন প্রয়োজনীয় কাজ করানো যায়। রাজার কানে আরও অনেক খবর গেল। যেমন সাধু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যাকে যা লিখে দিয়েছে তার জীবনে তাই ঘটছে। কেউ তার বাইরে কিছু ঘটাতে পারছে না। সাধু যেন নিজের হাতে প্রত্যেকের ভবিষ্যৎ জীবন ছকে দিয়েছে। দিবাকর ভাবল, সাধু একবার যা লিখে দিচ্ছে তা যখন ফলে যাচ্ছে তখন সেটা পরিবর্তন করা বা নিজের ভাগ্যকে বদলাবার চেষ্টা করেও তো কোনো কাজ হবে না।
রাজা দিবাকরের মন্ত্রীর নাম ছিল সুদর্শন। সুদর্শনের ইচ্ছা ছিল রাজার এবং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানার। এ ছাড়া সুদর্শনের ছেলে জন্মাবার পরই নানা ধরনের অসুখে ভুগছে। এই ছেলেটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সাধুর কাছে জেনে নেওয়ার ইচ্ছা মন্ত্রীর মনে মনে ছিল। বিশেষ করে বৈদ্যেরা ওই ছেলেটির রোগ আর সারাতে পারছিল না। কিন্তু ইচ্ছা করলেই মন্ত্রী তো আর সাধুর কাছে যেতে পারে না। রাজা যেমন সবসময় নিজের ইচ্ছামতো কাজ করে না, ঠিক তেমনি মন্ত্রীও রাজার সঙ্গে পরামর্শ না-করে কোনো কাজে হাত দেয় না। আলাপ আলোচনার পরে মন্ত্রী দিব্যজ্ঞানীর কাছে গেল। দিব্যজ্ঞানী সাধু বলল, 'তোমার ছেলে গ্রহের দোষ পেয়েছে। আমি যেভাবে যা করতে বলব তা করলে ছেলের গ্রহদোষ কেটে যাবে এবং তার অসুখবিসুখ হবে না।'
সাধু যা বলেছিল সুদর্শন তাই করল। একমাসের মধ্যেই সুদর্শনের ছেলে সম্পূর্ণ সেরে উঠল। এই ঘটনায় মন্ত্রী সুদর্শন খুব খুশি হয়ে সাধুকে দু-হাতে উপহার দিতে গেল।
বিভিন্ন উপহার মন্ত্রীর হাতে দেখে সাধু মুখ টিপে হেসে বলল, 'আমি সাধু। আমার এসব জিনিসে কী হবে? আমি এসব কিছু চাই না।' বলে সাধু মন্ত্রীকে একটি ওষুধ দিয়ে বলল, 'কোনো জাত সাপ যদি কাউকে ছোবল মারে এই ওষুধে সেরে যাবে। একটুও বিষ থাকবে না। বিষ তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। মানুষ প্রাণে বাঁচবে।'
মন্ত্রীর ক্ষেত্রে যা ঘটল সমস্ত বিষয় জেনে সাধুর প্রতি রাজা দিবাকরের কৌতূহল বাড়ল। ইচ্ছা জাগল নিজের ভবিষ্যৎ জানার। মন্ত্রীর ছেলে যখন সেরে উঠেছে তখন ওই সাধু নিশ্চয় অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই কথা ভেবে দিবাকর একদিন শিকারে যাওয়ার সময় পথে ওই দিব্যজ্ঞানী সাধুর আস্তানা পড়ায় সেখানে থেকে সাধুর কাছে গিয়ে বলল, 'সাধুজি, আমি শিকারে যাচ্ছি। ভালো শিকার পাব?'
সাধু বলল, 'আজ তুমি একটি জন্তুও মারতে পারবে না।'

এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই পাশের দেশের রাজার সঙ্গে দিবাকরকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হল। পাশের দেশের রাজা ছিল অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং তার সৈন্যসংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পরাজয় যে বরণ করতেই হবে এ ব্যাপারে দিবাকরের কোনো সন্দেহই ছিল না। তবু কৌতূহলবশত রাজা দিবাকর সাধুর কাছে গিয়ে যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। সাধু বলল, 'শোনো বাবা, পাশের দেশের রাজা যতই বড়ো হোক তোমার জয় নিশ্চিত। তুমি এগিয়ে যাও।'
এবারেও দিব্যজ্ঞানী সাধুর কথা বর্ণে বর্ণে সত্য হল। অত যে বলশালী, অহংকারী, ক্ষমতাবান রাজা, সেও তার ওই অহংকারের জন্যই পরাজিত হল। সে যেভাবে ব্যূহ রচনা করেছিল, যেভাবে সৈন্য সাজিয়েছিল, দিবাকর অত্যন্ত অল্প পরিশ্রমে শত্রুসৈন্যকে তছনছ করে দিতে পারল। পাশের দেশের রাজা অগত্যা প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেল।
এ সমস্ত ঘটনার পর রাজা একদিন মন্ত্রী সুদর্শনকে বলল, 'মহামন্ত্রী, আমি পরীক্ষা করে দেখেছি সাধু শুধু ভবিষ্যৎ বলতে পারে। ভবিষ্যতকে বদলাবার ক্ষমতা এই সাধুর নেই। আপনার ছেলে যে সেরে উঠেছে তার পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই। একটিমাত্র কারণ ছিল, সেটা হচ্ছে সাধু ভালোভাবেই জানত যে ছেলে সেরে যাবে। আপনার সাপের ছোবল খেয়ে মৃত্যুর ফাঁড়া আছে সেটা জেনে সাধু আপনাকে ওষুধ দিল। কিন্তু আমার ধারণা ছোবলে মৃত্যু আপনার কপালে নেই। বহু রোগীকে সাধু সারাতে পারেনি।'
মন্ত্রী রাজার কথা শুনে প্রজাদের প্রশ্ন করে যা বুঝল তাতে রাজার কথাই সত্য মনে হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, যে সাধু মন্ত্রীর ছেলেকে সারিয়ে তুলল, যে সাধু বহু প্রজার উপকার করল সেই সাধুর প্রতি মন্ত্রীর ব্যবহার এ-রকম হল কেন? উপকৃত হয়েও মন্ত্রী তাকে সরিয়ে দিল কেন? এই প্রশ্নের জবাব জেনেও যদি না-দাও, তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'দিব্যজ্ঞানী সাধুর কারও ভবিষ্যৎ বদলাবার ক্ষমতা ছিল না। রাজা দিবাকর ভেবেছিলেন সারা দেশের লোক যদি সাধুর কথার উপর নির্ভর করে চলতে থাকে তাহলে প্রজাদের কর্মক্ষমতা কমে যাবে। সারা দেশের প্রজারা যদি বুঝতে পারে, এবছর ফসল ভালো হবে না, তখন তারা ফসল ভালো করার চেষ্টাও করবে না। রাজার এই ধরনের কথা ভেবেই মন্ত্রী দিব্যজ্ঞানী সাধুকে সরিয়ে দিয়েছিল।'
রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন