ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, এই মধ্যরাত্রে তুমি যে শ্মশানের দিকে যাওয়া ঠিক করেছ, শব কাঁধে ফেলে যাচ্ছ, এতে আমার বলার কিছু নেই। আমি শুধু বলতে চাই, রাজাদের সিদ্ধান্ত সবসময় যে সঠিক হয় তা নয়। আমার কথাকে প্রমাণ করার জন্য আমি জ্ঞানশীল নামক এক রাজার দুটো চোরকে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে জানাচ্ছি। আমার এই কাহিনি শুনতে শুনতে পথ হাঁটলে পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
জ্ঞানশীল যখন মগধের সিংহাসনে বসল তখন সেখানে দারুণ অরাজকতা চলছিল। নীতিহীন কাজ অনবরত হত। ফলে প্রজাদের জীবন যেকোনো সময়ে বিপন্ন হত। এই অবস্থায় জ্ঞানশীল শুধু শাস্তি দিয়ে দিয়ে দেশের বহু অপরাধীকে পর্যুদস্ত করল। ফলে অপরাধপ্রবণতা অনেকখানি কমে গেল। প্রজাদের জীবনধারা অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে এল।
অপরাধপ্রবণতা কমে গেলেও দেশে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হল না। ঘন ঘন ছোটো ছোটো চুরির পরিবর্তে কিছুদিন অন্তর বড়ো বড়ো চুরি হতে লাগল। এসব চুরি সাধারণ প্রজাদের বাড়িতে হত না। ধনীদের বাড়িতে চুরি হত।
কিছুদিন পরে রাজা জানতে পারল যে মাত্র দু-টি চোর বিভিন্ন ধনীর বাড়িতে চুরি করছে এবং চুরির কিছু অর্থ গোপনে গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছে। এটা যে দু-জন করছে তা জানতে পারল ঘটনা বিশ্লেষণ করে। একই রাত্রে দুটো বাড়িতে একই সময়ে চুরি হত। চুরির পদ্ধতি ঠিক এক ধরনেরই ছিল। তাই সহজেই অনুমান করা গিয়েছিল যে চুরিটা একজন করেনি।
রাজা জ্ঞানশীল ঠিক করল এই দুটি চোরকে ধরার। কিন্তু চোর দুটো এত চতুর ছিল যে ওদের ধরা রাজপ্রহরীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কীভাবে যে চোর দুটোকে ধরা যায় সেই বিষয়ে রাজা মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করল।
'যারা চোর ধরে দেবে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা যেতে পারে। চোরগুলো যেহেতু গোপনে গরিবদের অর্থ দিচ্ছে সেইহেতু একমাত্র গরিবরাই বলতে পারবে চোর দুটো কোথায় গা-ঢাকা দিয়ে আছে। পুরস্কারের লোভে গরিব মানুষগুলো ধরিয়ে দিতে পারে।' মন্ত্রী বলল।
রাজার কাছে মন্ত্রীর এই প্রস্তাব ভালো না লাগায় রাজা মন্ত্রীকে বলল, 'আমরা পুরস্কার দেবো মাত্র একবার। এই একটি বার মাত্র পুরস্কার পাওয়ার লোভে গরিব মানুষগুলো চোরের সন্ধান দেবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ চোর দুটো প্রত্যেকদিন ওদের সাহায্য দিয়ে থাকে। অর্থের দিক থেকে গরিব হলেও গরিব মানুষগুলো বিশ্বাসঘাতক হয় না। আর একটি বিষয় হল প্রজাদের মধ্যে পুরস্কারের লোভ ছড়িয়ে পড়লে কিছুকালের মধ্যেই ঘুস খাওয়ার লোভ ছড়িয়ে পড়বে। তৃতীয় বিষয় হল, পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হয়ে যাবে যে রাজার প্রহরীরা চোর ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভয় পেয়ে ধনীরা চোর ধরার কথা ভাবতে পারবে না। আর গরিবরা চোর ধরিয়ে দেবে না। প্রজাদের মঙ্গলের জন্য এর আগে অনেক কাজ করা গেছে। এবারেও আমি চেষ্টা করব। চোরকে ধরার শ্রেষ্ঠ উপায় হল নিজে চোর সাজা। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়।'
মন্ত্রীকে এই কথা বলে রাজা ছদ্মবেশে গভীর রাত্রে ঘোরাঘুরি করতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে রাজা জানতে পারল চোর দুটোর নাম রসরাজ ও নারান। দু-জনেই অভিজাত পরিবারের সন্তান। দুটো পরিবারেরই সমাজে নাম আছে। এক ডাকে ওই দুটো পরিবারকে লোকে চেনে। দেশে যখন চরম অরাজকতা চলছিল তখন তারা এই পথে পা বাড়িয়েছে।
ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে এক রাত্রে রাজা তার দেহরক্ষীদের সহযোগিতায় ওদের ধরে ফেলল। ভরা রাজসভায় রসরাজ ও নারানের বিচার হল। দু-জনেই স্বীকার করল যে তারা চুরি করেছে। নারান বলল, 'মহারাজ, আপনি যখন সিংহাসনে সবে বসলেন তখন চুরি করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। চুরি করি। খাই-দাই ভালোয় আছি। এই হল আমার কথা। কিন্তু এই রসরাজ আমার মতো চোর নয়। যা চুরি করে, পারলে সবটাই গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। নিজের সুখের জন্য সে খরচ করে না।'
রাজা বেশি সময় নষ্ট না-করে নারান ও রসরাজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল।

বেতাল এই কাহিনি বলে শেষ করল এইভাবে, 'আচ্ছা রাজা, আমার একটা প্রশ্ন আছে। রাজা জ্ঞানশীল ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে রসরাজ ও নারান দু-জনেই চোর হলেও দু-জনে একই ধরনের অপরাধী নয়, তা সত্ত্বেও দু-জনকে একই ধরনের শাস্তি দিল কেন? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'যেকোনো রাজার চোখে চুরি করাটাই অপরাধ। চুরি করা অর্থ গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেশের উন্নতি হয় না। সারা দেশে যখন অপরাধীদের দমন করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন সেইসময় জ্ঞানশীল জানতে পারলেন যে, দু-টি চোর নিয়মিত চুরি করে। তিনি যে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান তার পথে বাধার সৃষ্টি করছে। প্রজাদের মধ্যে গোপনে অর্থ বণ্টন করার ফলে তাদের মনে ধারণা হচ্ছিল রাজার চেয়ে চোর বড়ো উপকারী। এই অবস্থা কোনো রাজা মেনে নিতে পারেন না। সেইজন্যই রাজা একই ধরনের শাস্তি দিয়েছিলেন। আমার মতে রাজার বিচার সঠিক ছিল।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন