ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি এই মাঝরাত্রে যেভাবে পরিশ্রম করছ তাতে আমার মনে তোমার প্রতি করুণা জাগছে। শারীরিক শক্তিতে মানুষ দেবতাদের সঙ্গে পারে না, কিন্তু বুদ্ধির বলে দেবতাদের হারিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ জগতে কিছু আছে। এই ধরনের এক তীক্ষ্ন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কথা শোনাব। শুনতে শুনতে হাঁটতে থাকলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
প্রগলভ নামে এক গন্ধর্ব মর্ত্যভূমিতে কী ঘটছে তা দেখতে দেখতে আকাশপথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ঘুরতে ঘুরতে সে একটি অরণ্যে একটি লোককে দেখতে পেল। লোকটার পরণে জরাজীর্ণ পোশাক। লোকটা রীতিমতো রুগণ এবং শীর্ণ। সে গাছ থেকে ঝরে পড়ে যাওয়া ফল কুড়িয়ে খাচ্ছিল। আর মাঝে মাঝে কোনো হিংস্র জন্তুর আক্রমণের আশঙ্কায় উদবিগ্ন হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল।
গন্ধর্ব ওই লোকটার দিকে তাকিয়ে, তার হাবভাব দেখে তার প্রতি দয়ার উদ্রেক হওয়ায় তাকে সমস্ত দিক থেকে সমৃদ্ধ করার কথা ভাবল। এই কথা ভেবে গন্ধর্ব আকাশ থেকে ঝট করে ওই লোকটার সামনে নামল। দরিদ্র লোকটা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, 'প্রভু, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি মানুষ নন। আপনি অনুগ্রহ করে আমাকে জানান আপনি কে?'
গন্ধর্ব হাসিমুখে বলল, 'আমি গন্ধর্বলোক থেকে আসছি। সুখ যে কাকে বলে তা গন্ধর্বলোকে থাকলে বোঝা যায় না। আমি জানি, তুমি আজন্ম দরিদ্র। আমার নাম প্রগলভ। আমার শক্তি অসীম।'
দরিদ্র লোকটা মুখ টিপে টিপে হেসে বলল, 'অসীম শক্তি থেকে কী লাভ? আমি তো দেখিনি। তোমার সেই অসীম ক্ষমতা দিয়ে কার কতখানি উপকার করতে পারো দেখাও। নিজের চোখে দেখে বুঝব তুমি ক্ষমতাবান।'

দরিদ্র লোকটা অদূরের একটা গাছ দেখিয়ে বলল, 'ওই গাছটাকে হাতি করে ফেলতে পারো?'
গন্ধর্ব তৎক্ষণাৎ ওই গাছটার দিকে তর্জনী দেখিয়ে কী যেন বলল। পরক্ষণেই সেই গাছ হাতি হয়ে ডাকতে ডাকতে সেখান থেকে চলে গেল।
'বাঃ! চমৎকার তো!' বলতে বলতে দরিদ্র লোকটা হাততালি বাজাল। গন্ধর্ব বলল, 'আর কী করতে হবে বলো?'
দরিদ্র লোকটা গন্ধর্বকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। নিজের কুঁড়ে ঘরটা দেখিয়ে বলল, 'এই কুঁড়ে ঘরটাকে অট্টালিকায় রূপান্তরিত করতে পারো?' পরক্ষণেই গন্ধর্ব ওই কুঁড়ে ঘরটাকে অট্টালিকা করে ফেলল।
লোকটা নিজের নোলো ভাইটাকে দেখিয়ে বলল, 'এর পা নেই। একে পা দিয়ে দাও।' কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোটো ভাইয়ের পা গজিয়ে উঠল। লোকটা খুব খুশি হয়ে ছোটো ভাইয়ের পিঠ চাপড়াল।
এসব দেখে গন্ধর্ব খুব রেগে গিয়ে বলল, 'অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছি, তুমি একটার পর একটা বলে যাচ্ছ আর আমিও তাই করে যাচ্ছি। আমার সহ্যের একটা সীমা আছে। এমন হাবভাব করছ যেন বোকা লোককে ঠকিয়ে তুমি অনেক কিছু করে ফেলছ। আর যাই হোক আমি বোকা নই।' বলেই গন্ধর্ব ওই অট্টালিকাকে আবার কুঁড়ে আর ছোটো ভাইকে করে ফেলল নোলো।
দরিদ্র লোকটা অবাক হয়ে গেল।
তার দিকে রক্তচক্ষুতে তাকিয়ে গন্ধর্ব বলল, 'তুমি যা বলেছিলে তাই করতে পেরেছি। এবার তোমাকে কুকুর করে আমি নিজের লোকে ফিরে যাচ্ছি।'
দরিদ্র লোকটা তৎক্ষণাৎ বলে উঠল, 'আর একটি ইচ্ছা তুমি যদি পূরণ করো তাহলেই বুঝব, তোমার ক্ষমতা অসীম। সেটা যদি পেরে যাও তাহলে আমি কুকুর হতে রাজি আছি।'
'তাড়াতাড়ি বলো।' গন্ধর্ব বলল।
'ইচ্ছা আমার সামান্য! তোমার সমস্ত শক্তি আমাকে দিয়ে দাও। আমার দারিদ্র্য তুমি নিয়ে নাও।' লোকটা বলল।
গন্ধর্ব কিছুক্ষণ ভেবে কাঁপা গলায় বলল, 'শোনো, তুমি হেরে যাওনি। আমারই হার হয়েছে।' বলে ওই কুঁড়ে ঘরকে আবার অট্টালিকা ও লোকটার ছোটো ভাইয়ের পা ঠিক করে দিয়ে সেখান থেকে গন্ধর্ব চলে গেল।
বেতাল ওই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে। শুধু এই একটি প্রশ্নের জবাব দিলেই চলবে। অত অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন গন্ধর্ব দরিদ্র লোকটার শেষ ইচ্ছার কথা শুনে গলা কাঁপিয়ে নিজের পরাজয় স্বীকার করল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'অত অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন গন্ধর্ব দরিদ্র লোকটার কাছে পরাজিত হওয়ার কারণ লোকটার বুদ্ধিবল। গন্ধর্ব ভেবেছিল লোকটা অর্থের দিক দিয়ে যেমন দরিদ্র তেমনি বুদ্ধির দিক থেকেও। গন্ধর্বের অহংকার ছিল সে সমস্ত দিক থেকে দরিদ্র লোকটার চেয়ে উন্নত। কিন্তু যে মুহূর্তে দরিদ্র লোকটা গন্ধর্ব হতে চাইল। সেই মুহূর্তে তার মনে ভয় ঢুকল, যদি একবার দরিদ্র লোকটা অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয় তাহলে সে গন্ধর্বকেই কুকুর করে ফেলবে। সেইজন্যেই দরিদ্র লোকটার গোড়ার দিকের ইচ্ছেগুলো পূরণ করে ভয়ে ফিরে গেল।'
রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন