ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, কথায় বলে পাত্র বুঝে দান করতে হয়। কিন্তু অনেক সময় অনেক সত্যবাদীর ভাগ্যেও দান জোটে না। উদাহরণস্বরূপ মণিগুপ্তের কাহিনি বলব। শুনলে পথ চলার শ্রম লাঘব হবে।' বেতাল কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে এক সিদ্ধসাধু তার শিষ্যদের নিয়ে একটি নগরে এসেছিল। সেই নগরে একজন ধনী ছিল। তার নাম মণিগুপ্ত। তাকে লোকে দাতা কর্ণ নামে অভিহিত করত। সাধু মণিগুপ্তের বাড়িতে গেল। তার আশা ছিল মণিগুপ্ত তাকে নিশ্চয়ই অতিথি হিসাবে গ্রহণ করবে।
সাধু দেখল মণিগুপ্তের বাড়ির সামনে হাজার হাজার গরিব মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তার লোকজন তাদের দানদক্ষিণা দিচ্ছে। একদিন থাকার পর সাধু ফেরার আগে মণিগুপ্তকে বলল, 'আমি তোমার অতিথিসেবায় মুগ্ধ হয়েছি। তুমি যেকোনো বর চাইতে পার। তবে নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে পরার্থে যদি বর চাও তবেই আমার সেই বরে তোমার কাজ হবে।'
মণিগুপ্ত সবিনয়ে প্রণাম করে সাধুকে বলল, 'প্রভু, আপনি এমন বর দিন যাতে আমি সারাজীবন এভাবে দানধর্ম করে যেতে পারি।' সাধু মনে মনে হেসে মাথা নেড়ে বর দিয়ে শিষ্যসহ ফিরে গেল।
ফেরাপথে শিষ্য প্রশ্ন করল, 'গুরুদেব, আপনি যে বর মণিগুপ্তকে দিয়েছেন তা কি ফলবতী হবে?'
মাথা নেড়ে সাধু বললেন, 'না।'
এই ঘটনার কিছুকাল পরে দেখা গেল মণিগুপ্তের সেই দানধর্ম করার ক্ষমতা নেই। সে তখন কোনোরকমে কালযাপন করছে এতই খারাপ অবস্থা।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, সাধুর দেওয়া বর ফলল না কেন? সাধুর কি বর দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে যাবে।'
বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'মণিগুপ্ত যদি পরার্থে বর চাইত তাহলে সে কামনা করত দেশের সবাই যাতে সুখে থাকে। কিন্তু সে দাতা হিসেবে অমর হয়ে থাকার জন্য বর চাইল। নিজের স্বার্থে চাওয়ায় সাধুর বর ফলবতী হল না।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন