ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। এমন সময় শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি স্বার্থের জন্য এত পরিশ্রম করছ, না বিনা স্বার্থে তোমার এই পরিশ্রম আমি তা জানি না। তবে আমি একজনের কথা জানি সে নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে কঠোর পরিশ্রম করেছিল। তার নাম পর্বত। সে অচেনা অজানা লোককে এত সাহায্য করেছিল সে বলার নয়। তার কাহিনি শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম কমে যাবে। শোনো বলছি।' এই বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে একটি গ্রামের শেষপ্রান্তে পর্বত নামে একটি গরিব লোক ছিল। তার বউ আর সে একটি কুঁড়ে ঘরে থাকত। তার কুঁড়ের পাশে ছিল আর একটি ঘর। একদিন ওই ঘরে ঢুকল এক বুড়ো। বুড়োর আত্মীয়স্বজন কেউ ছিল না। বুড়ো অসুস্থ ছিল। এসব লক্ষ করে তাকে সাহায্য করার ইচ্ছা জাগল পর্বতের মনে। কিন্তু ইচ্ছা জাগলেও পর্বতের ক্ষমতা ছিল না। সাহায্য করতে না পারায় পর্বত মনে মনে দুঃখ পেয়েছিল।
তার মনের অবস্থা বুঝে তার বউ বলল, 'এত মাথামুণ্ডু কী ভাবছ? বুড়োটার কপালে কষ্ট পাওয়া আছে তাই পাচ্ছে। কর্মফল বলে একটা জিনিস আছে। যে আজ বাদে কাল মরবে তাকে নিয়ে তোমায় এত ভাবতে হবে না।'
বউ যা বলল তার একটি কথাও মিথ্যা নয়। তবু বুড়োর কষ্ট দেখে পর্বতের বড়ো কষ্ট হয়। বুড়ো সারারাত কাশে। এক-এক দিন পর্বত ভাবে বুড়োটার গলা টিপে মেরে ফেললে কেমন হয়। এত কষ্ট পেয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। ভাবে বটে, কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। একদিন পর্বত ঘরের বাইরে একটি গাছের নীচে ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে দেবে ঠিক করল। গাছের নীচে শুতে না শুতেই একটা বিরাট ছায়ামূর্তি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি?'

'আমি ভূত।' বলল ওই মূর্তি।
শুনে পর্বতের গোটা শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে অনেক কষ্টে বলল, 'কী চাও তুমি?'
'তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। এই পোঁটলাতে টাকা আছে। এই টাকা ওই বুড়োকে দিয়ে তাকে নগরে নিয়ে গিয়ে সারাতে হবে।' আমার কথা বুঝতে পেরেছ? ভূত বলল।
এমন পরোপকারী ভূতকে দেখে পর্বতের মন থেকে ভয় মুছে গেল। সে ভূতের সঙ্গে কথা বলল, 'এই বুড়োর উপর তোমার এত দয়া কেন? কোনো জ্যান্ত লোক বুড়োকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসছে না আর তুমি কোন স্বার্থে তাকে টাকা দিচ্ছ?'
ভূত বলল, 'এই বুড়োটা যে কত বড়ো ধনী লোক তা তুমি জানো না। অবশ্য সে আজকের কথা নয়। অনেক দিন আগে এই বুড়োটা ধনী ছিল। দানধর্মও করত। আমি তখন এক লক্ষপতির বাড়িতে কাজ করতাম। আমার ওই বাড়ির মালিক আমাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে নগর থেকে একটা জিনিস আনতে বলেছিল। আমি যাওয়ার সময় একটি ধর্মশালায় রাত কাটিয়েছিলাম। রাত্রে আমার সমস্ত টাকা চুরি হয়ে যাওয়ার কথা আমার মালিক বিশ্বাস করেনি। বিচার হল। বিচারক আমাকে চোর বলে ঘোষণা করল। আমার ভীষণ দুঃখ হল। আমি সোজা গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে গেলাম। কিন্তু সে যাত্রা মরতে পারলাম না। চার জন ধরে আমাকে বাঁচাল। তারপর সবাই আমায় জিজ্ঞেস করতে লাগল আমার আত্মহত্যার কারণ। সবাই শুনত আমার দুঃখের কথা। কে কতটা বিশ্বাস করত কে জানে! তবে আমাকে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। আমার থাকার জায়গা নেই, খাবার নেই। এই অবস্থায় একজন যুবক আমাকে ধরে নিয়ে গেল তার বাড়িতে। আমাকে গোপনে দশ হাজার টাকা দিল। এত টাকা নিয়ে ধর্মশালায় উঠতে বারণ করল। এত টাকা পেয়ে আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল। তারপর অনেক বছর পরে আমি দশ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ওই যুবককে খুঁজেছিলাম, পাইনি। অনেক খোঁজ করে জানতে পেরেছি যে এই বুড়োই সেই যুবক। তুমি যদি এই টাকাটা বুড়োকে দিয়ে দাও তাহলে আমি মুক্তি পেতে পারি।' বলে টাকার থলি পর্বতের হাতে দিয়ে ভূত উধাও হয়ে গেল।
টাকাটা নিয়ে পর্বত ঘরে ঢুকল। মনে মনে বলল, 'যা করার কাল সকালে করব। এখন টাকাটা থাক।'
এমন সময় দরজায় কে যেন আঘাত করতে লাগল। দরজা খুলে দেখে ভূত।
'কী হল, আবার এলে কেন?' পর্বত ভূতকে জিজ্ঞেস করল।
'আবার এলাম মানে। আমি তো এই প্রথম আসছি। তোমার পাশের বাড়ির বুড়োর কাছে আমি ঋণী। এই নাও, ধর। এই টাকার থলিটা বুড়োকে দাও। এই টাকা দিয়ে তার চিকিৎসা করাও।' বলে নতুন ভূতটা টাকার থলি পর্বতের হাতে দিল।
পর্বতের মনে কৌতূহল জাগল। সে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি বুড়োর কাছে কীভাবে ঋণী হলে?' তার প্রশ্নের জবাবে দ্বিতীয় ভূত বলল, 'একবার আমার পাঁচ বছরের মেয়ের ভীষণ অসুখ করেছিল। স্থানীয় বৈদ্যরা দেখে তাকে নগরের চিকিৎসালয়ে নিয়ে যেতে বলল। আমি সপরিবারে নগরে গেলাম। চিকিৎসকদের মতে ছ-মাস ধরে তার চিকিৎসা চলবে। পাঁচ-ছ-হাজার টাকা খরচ হবে চিকিৎসার জন্য। এত টাকা পাব কোথায়? দুঃখে আমি বসে বসে কাঁদতে লাগলাম। এমন সময় একজন এসে ''মেয়ের জীবন আগে বাঁচুক'' বলে আমাকে দশ হাজার টাকা দিল। মেয়ে বাঁচল। কিন্তু আমি ওই লোকটার ঋণ শোধ করতে পারিনি। মরেও মুক্তি পাচ্ছি না। অনেক খোঁজ করে জানতে পেরেছি এই বুড়োই সেই লোক। তুমি দয়া করে এই টাকাটা বুড়োকে দিয়ে দাও। এই ঋণ শোধ করতে পারলেই আমি এই ভূতের জীবন থেকে মুক্তি পাব।' দ্বিতীয় ভূতও টাকার থলি পর্বতকে দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
পর্বত বউকে জাগিয়ে বলল, 'কি গো, এত টাকা জীবনে কখনো দেখেছ? দেখে নাও কত টাকা।'
বউ অত টাকা দেখে প্রথমে অবাক হয়ে গেল। তারপর স্বামীকে বলল, 'দেখ বুড়োর যা অবস্থা বেশ বুঝতে পারছি একে আর বাঁচানো যাবে না। তার চেয়ে এই টাকা নিয়ে আমরা আমাদের ছেলেদের মানুষ করতে পারব।'
'না তা হয় না, এ টাকা আমি ওই বুড়োকে দিয়ে দেব।' পর্বত বলল।
'দিতে চাও দাও। একটা থলির টাকা দাও। অন্য থলিটা রেখে দাও।' পর্বতের বউ বলল।
পর্বত প্রথমে ভাবল কথাটা মন্দ নয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তার মনে হল তা করা তার অন্যায় হবে। সে বউকে বলল, 'না, আমি দুটো থলিই বুড়োকে দিতে চাই।' বলে সে পরের দিন ওই দুটো থলি বুড়োকে দিয়ে দিল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, পর্বত এ-রকম করল কেন? সে যা করল তা কি বিনা স্বার্থে? নাকি ভূতদের টাকা হজম করতে তার ভয় করল? আমার এই প্রশ্নের জবাব যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'ব্যাপারটা অত জটিল নয়। পর পর দু-জন ঋণী থাকার ফলে যে ভূত হয়েছে তা জেনে পর্বতের ঋণী হয়ে ভূত হতে ইচ্ছা করল না। সেইজন্যেই ওই দু-জনের টাকা পর্বত নিজের কাজে খরচ করতে ভয় পেল।'
রাজা এই কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই বেতাল শবসহ আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন