ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি কাঁধে ফেলে শ্মশানের দিকে নীরবে হাঁটতে লাগলেন। এমন সময় শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, উন্নত ধরনের আদর্শ স্থাপনের জন্যই তুমি হয়তো এত পরিশ্রম করছ। পরিশ্রম করলেই হয় না। একটা আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে দক্ষতার দরকার। তা না থাকলে পিতৃসত্য পালনের জন্য শেখরের যে অবস্থা হয়েছিল তোমারও সেই অবস্থা হবে। আমি শেখরের কাহিনি বলছি, শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—
শেখর ছিল বিদেহী দেশের উচ্চপদ অধিকারী এক কর্মচারীর ছেলে। তার বাবার নাম ছিল বৈশাখ। বৈশাখের যেমন একটি ছেলে ছিল তেমনই সেই দেশের রাজারও একটি ছেলে ছিল। ওই রাজকুমারের নাম ছিল বিজয়। বাল্যকাল থেকেই শেখরও বিজয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। একই শিক্ষকের কাছে ওরা লেখাপড়া করেছিল। ওরা এমনভাবে চলাফেরা করত যে দেখে মনে হত ওরা দুই ভাই। যদিও বিজয়ের ভবিষ্যতে রাজা হওয়ার কথা; তবু সে শেখরের সঙ্গে এমনভাবে মিশত যা দেখে মনে হত না যে, তার মধ্যে রাজা হওয়ার কোনো অহংকার আছে।
শেখরের বাবা বৈশাখ মৃত্যুশয্যায় ছেলেকে কাছে ডেকে গোপনে বলল, 'বাবা, তুমি যদি তোমার বাবার ঋণ শোধ করতে চাও তাহলে আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। তুমি আমাকে কথা দাও, তুমি আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করবে?'
'নিশ্চয় করব বাবা। বাবার ইচ্ছা যে ছেলে পূরণ করে না সে ছেলে ছেলেই নয়। এখন তুমি তোমার ইচ্ছা আমাকে জানাও।'
বৈশাখ বলল, 'তুমি বিদেহী রাজবংশকে নির্মূল করো।'
শেখর এই কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল। বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে হলে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে এবং রাজার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এমনকী প্রয়োজন হলে নিজের বন্ধু বিজয়কেও মেরে ফেলতে হবে। অর্থাৎ বন্ধুর বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে।
শেখর বাবার এই ইচ্ছার কথা শুনে ভীষণ অস্বস্তিবোধ করে বলল, 'বাবা, তোমার এই ধরনের ইচ্ছার নিশ্চয় কোনো কারণ আছে সেটা কি আমাকে জানাবে?'

তৎক্ষণাৎ শেখর বাপের ইচ্ছা পূরণ করার শপথ করল। বৈশাখ পরিতৃপ্তির হাসি নিয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
বৈশাখের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেখর রাজার অধীনে চাকরি পেল। ঠিক সেই সময় বিদেহী দেশের রাজসিংহাসনে বসল বিজয়। নিজের অধীনের কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও বিজয় কিন্তু শেখরকে আগে যেভাবে দেখত সেইভাবেই দেখতে লাগল। আগের মতোই শিকার অথবা কোথাও বেড়াতে গেলে শেখরকে সঙ্গে নিয়ে যেত।
রাজসিংহাসনে বসার পর বিজয়ের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা না দিলেও শেখর কিন্তু আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে লাগল। শেখর ভাবত, এই রাজবংশ নির্মূল করতে হলে শুধু বিজয়কেই মেরে ফেললেই হবে। বিজয়ের কোনো সন্তান নেই। এখনই কোনো সন্তান হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এই কথা ভেবে সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

একবার বিজয় শিকারে বেরোনোর সময় শেখরকে সঙ্গে নিল। শিকার করতে করতে এমন একটা সময় এল যখন ওদের দু-জনের কাছাকাছি রাজার কোনো প্রহরী ছিল না। বিজয়ের দেহরক্ষীও দূরে ছিল। হঠাৎ শেখর বিজয়কে আক্রমণ করার জন্য অস্ত্র তুলতেই রাজার প্রহরীরা কাছাকাছি এসে গেল। শেখরের অস্ত্র তোলা বিজয়ের নজরে না পড়লেও সে যাত্রায় শেখরের চেষ্টা ব্যর্থ হল।
আর একবার শেখর ও বিজয় পাহাড়ে উঠেছিল। সেখান থেকে চারদিকের দৃশ্য খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচের দিকে তাকালে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল। পাহাড়টা অনেক উঁচুতে থাকায় সেখান থেকে নীচে পড়ে গেলে কারও বাঁচার উপায় ছিল না। বিজয় কথায় কথায় শেখরকে পাহাড়ের ধারে নিয়ে গেল। শেখর ভাবল, 'এখান থেকে আমি যদি বিজয়কে ঠেলে ফেলে দিই তাহলে তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যাবে না।' শেখর এই কথা ভেবে বিজয়কে ঠেলে ফেলে দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বিজয় পেছনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'চলো এখান থেকে নীচে যাওয়া যাক।'
গাড়িতে করে নামছিল ওরা। রাত পেরোনোর পরে ভোরে বিজয় বলল, 'বুঝলে শেখর, কাল রাত্রে আমি খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।'
'কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছ?' শেখর প্রশ্ন করল।
'তুমি নাকি আমাকে ছোরা মারলে, আমার প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আমি নাকি একদৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমাদের বন্ধুত্ব কত গভীর তা সত্ত্বেও এই ধরনের স্বপ্ন কেন দেখলাম তা বুঝতে পারলাম না।' বিজয় বলল।

এই কথা শুনে শেখরের মুখে কোনো কথা সরল না। তার মুখ ক্রমশ রক্তহীন হয়ে উঠছিল। সেটা লক্ষ করে বিজয় বলল, 'শোনো শেখর, তুমি বেশ কিছুদিন ধরে চেষ্টা করছ আমাকে মেরে ফেলার। প্রাণ খুলে বলতো আমি সত্যি কথা বলছি কি না? কিছু না-ঢেকে বলো।'
বন্ধুর কাছে মিথ্যে কথা বলতে শেখরের ঠোঁট কাঁপল। সে অত্যন্ত অস্বস্তিবোধ করে মৃত্যুশয্যায় তার বাবা যা বলেছিল তা অকপটে বিজয়কে বলে দিল।
তার কথা শুনে বিজয় বলল, 'তুমি শ্রীরামচন্দ্রের মতো পিতৃসত্য পালনের জন্য যদি প্রতিজ্ঞা করে থাকো তাহলে নিঃসন্দেহে প্রশংসার্হ। ঠিক আছে, তুমি তোমার তরবারি দিয়ে আমাকে মেরে ফেলে তোমার প্রতিজ্ঞা তুমি রাখো।'
শেখর বন্ধুর কথা শুনে তরবারি বের করে বিজয়কে আক্রমণ করতে গেল। তৎক্ষণাৎ বিজয়ও খাপ থেকে তরবারি বের করে আক্রমণের মোকাবিলা করে বলল, 'দেখো শেখর, আমি যদি কিছু না করি, আর তুমি যদি আমাকে নিরস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ করো, মেরে ফেলো, তাহলে তোমার পাপ হবে। নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে। তার চেয়ে এসো আমরা পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। এই যুদ্ধে যে মরে যাবে সেই বরণ করবে বীরের মৃত্যু। আর বীরের মৃত্যু বরণ করার অর্থ স্বর্গলাভ।'
তারপর ওরা দু-জনে যুদ্ধে লিপ্ত হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেখর মাটিতে পড়ে গেলে তার হাতের তরবারি ছিটকে পড়ে গেল দূরে। তখন বিজয় বলল, 'শেখর, তুমি পিতৃসত্য পালন করতে পারলে না। তবে বীরের মতো যুদ্ধ করে তুমি স্বর্গে যেতে পারছ।' বলেই সে তৎক্ষণাৎ শেখরের মুণ্ড কেটে ফেলল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, বিজয়ের কি উচিত হয়েছে তার প্রাণের বন্ধুকে মেরে ফেলা? আর যাই হোক, শেখর তো নিছক হত্যাকারী হতে চায়নি? সে একটা আদর্শ স্থাপনের জন্য, শপথ রক্ষার্থে বিজয়কে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। শেখরকে বিজয় কারাগারে রাখতে পারত। একেবারে মেরে ফেলা বিজয়ের কি উচিত হয়েছে? তাহলে কি বিজয় শেখরকে গভীরভাবে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেনি? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'পিত্যসত্য পালনের জন্য শেখর বিজয়কে হত্যা করতে গিয়েছিল, কিন্তু বিজয় শেখরকে গোপনে হত্যা করার চেষ্টা করেনি। সে শেখরকে যুদ্ধে আহ্বান করে তাকে মেরে ফেলার সুযোগ দিয়েছিল। যুদ্ধে বিজয়কে পরাজিত করার মতো ক্ষমতা শেখরের ছিল না। শুধু পিতৃসত্য পালন করাই নয়— একটা মানুষকে অনেক কিছু পালন করতে হয়। রাজভক্তি, কৃতজ্ঞতা, বন্ধুর প্রতি কর্তব্যপালন প্রভৃতির কথাও তাকে মনে রাখতে হয়। যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আগে উন্নত ধরনের কর্তব্যের কথাও মানুষকে ভাবতে হয়।
শেখরের বাবা নিশ্চয় এমন কিছু করেছিল যে জন্য রাজা তাকে অপমান করেছিলেন। বিজয় যখন স্বপ্নের কথা বলল তখন শেখর নিজের কথা জানিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলে হয়তো ক্ষমা পেত। শেখর কোনো কথা না বলে একাই তরবারি বের করে বিজয়কে মেরে ফেলতে গেল। এতে তার নীচতাই প্রকাশ পেয়েছে।'
রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন