ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, এই মাঝরাত্রে, না ঘুমিয়ে গাছ থেকে শ্মশান পর্যন্ত আর কতকাল হাঁটবে? মানুষের জীবনে সবসময় প্রতিজ্ঞায় অটল থাকা চলে না। মাঝে মাঝে প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে যাওয়া উচিত। নাগরাজের মতো যুবক একদিন প্রতিজ্ঞার বিষয় সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিল। তার কাহিনি শোনালে আমার কথা পরিষ্কার বোঝা যাবে। পথ চলতে চলতে ওই কাহিনি শুনলে পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল ওই যুবকের কাহিনি শুরু করল—
নাগরাজ ছিল ওই যুবকের নাম। নগরে ছিল তার চাকরি। তখনও তার বিয়ে হয়নি। ওর বাবা-মার ইচ্ছা ছিল জানাশোনা পরিবারের মেয়ে রত্নার সঙ্গে নাগরাজের বিয়ে দেওয়া। রত্না লেখাপড়া জানত না। পাড়াগাঁয়ে তার জন্ম। সেখানেই সে মানুষ হয়েছে। দেখতেও সে সুন্দর ছিল না। কীভাবে যেন নাগরাজের প্রতি রত্নার ভালোবাসা জেগেছিল। কিন্তু রত্নার প্রতি নাগরাজের আসক্তি ছিল না।
সেবারে পুজো উপলক্ষ্যে নাগরাজ নগর থেকে গ্রামে এল বাবা-মার কাছে। ওর বাড়িতে আসার দু-একদিন পরে কথা প্রসঙ্গে তার বাবা বলল, 'পুজোর পরেই ভাবছি, রত্নার সঙ্গে তোর বিয়ের পর্ব সেরে ফেলব। নগরে যাওয়ার সময় এবারে বউমাকে নিয়ে যাবি।'
বাপের এই কথা শুনেও না-শোনার মতো ঢং করে অন্য প্রসঙ্গে নাগরাজ চলে গেল।

ওই ঘরের জানলা দিয়ে নাগরাজকে দেখে একটি বুড়ি বলল, 'হায়, হায়, তুমি যে বাবা ভিজে গেলে! ঘরের ভেতরে এসো। বৃষ্টি এত সহজে থামবে না। এসো বাবা ঘরে এসো।'
নাগরাজ ওই ঘরের ভেতর ঢুকতে-না-ঢুকতেই বুড়ি উঁচু গলায় বলল, 'সন্ধ্যা, একটা কাপড় নিয়ে আয় তো, বেচারা বৃষ্টির জলে একদম ভিজে গেছে।'
নাগরাজ মনে মনে বলল, 'সন্ধ্যা নামটা তো সুন্দর।' এমন সময় নূপুরের শব্দ শোনা গেল। সেই শব্দ দরজা পর্যন্ত এসে যেন থেমে গেল। বুড়ি এগিয়ে গিয়ে কাপড় নিল। ভেজা কাপড় ছেড়ে, বুড়ির দেওয়া কাপড় পরার পর নাগরাজ নিজের পরিচয় দিল এবং বুড়িরও পরিচয় পেল। বুড়ি ওই গ্রামে নতুন এসেছে। চাষ-আবাদের কাজ নিজের তত্ত্বাবধানেই করছে। সন্ধ্যা নাকি তার একমাত্র মেয়ে। সন্ধ্যার বাবা অনেকবছর আগে মারা গেছে। বুড়ি সংক্ষেপে এই কথাগুলো বলল।
বুড়ির বিষয় জানার পর নাগরাজের প্রবল ইচ্ছা জাগল সন্ধ্যাকে দেখার। কিছুক্ষণ পরে সন্ধ্যা গরম দুধ এনে যথারীতি দোরগোড়ায় দাঁড়াল। বুড়ি এগিয়ে গিয়ে ওই দুধ নিল। এবারেও নাগরাজ সন্ধ্যাকে দেখতে পেল না।
সেদিন সন্ধ্যাকে দেখা আর হল না। পরের দিন কোনো একটা কাজের অজুহাতে ওই কুটিরের কাছে নাগরাজ গেল। লক্ষ করল, বুড়ি জানালায় পর্দা লাগাচ্ছে। হাতে বোনা পর্দা। নাগরাজকে দেখেই হাসিমুখে ডেকে বুড়ি বলল, 'যখনই সময় পায়, সন্ধ্যা পর্দা বোনে।'
নাগরাজ অনেকক্ষণ বুড়ির সঙ্গে একথা সেকথা বলতে বলতে সময় কাটাল। নানা কথা হল। এক সময় হঠাৎ বুড়ি হাত বাড়িয়ে সন্ধ্যার হাত থেকে কিছু খাবার নিল। সন্ধ্যার নিজের হাতে তৈরি জলখাবার বুড়ি নাগরাজকে খেতে দিল। জলখাবার সুস্বাদু ছিল। কিন্তু সেই বেলায়ও নাগরাজ সন্ধ্যাকে দেখতে পেল না।
পরের দিন নাগরাজ নিজের ক্ষেতের দু-টি ডালিম নিয়ে সন্ধ্যার বাড়িতে গেল। বাইরের দরজা যথারীতি বন্ধ ছিল। ঘরের ভেতর থেকে মধুর কণ্ঠে গান ভেসে আসছিল। নাগরাজ ঠায় দাঁড়িয়ে ওই গান শুনল। মন্দির থেকে সেই সময় বুড়ি ফিরছিল। নাগরাজ বুড়িকে দেখেনি।
বুড়ি কিন্তু নাগরাজকে দেখে নিল। 'কতক্ষণ এসেছ বাবা? মেয়ে আমার গান শুরু করলে সব ভুলে যায়। ঘরে আগুন লেগে গেলেও হুঁশ থাকে না। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো কে জানে!'

সন্ধ্যার হাতে তৈরি খাবার খেয়ে, সন্ধ্যার হাঁটার সময় নূপুরের ধ্বনি শুনে, আড়ি পেতে তার গান শুনে নাগরাজের মনে হল একমাত্র সন্ধ্যাই তার উপযুক্ত স্ত্রী হতে পারে। সন্ধ্যা যদি দেখতে সুন্দর না হয় তবুও বিয়ে করার ইচ্ছা নাগরাজের মনে প্রবল হয়ে দেখা দিল। নাগরাজ ঠিক করল পরের দিন বুড়ির কাছে নিজের ইচ্ছাপ্রকাশ করবে, সন্ধ্যাকে বিয়ে করার প্রতিজ্ঞা মনে মনে সে করে ফেলল।
পরের দিন নাগরাজ সন্ধ্যার বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই একটা ষাঁড় এসে হঠাৎ নাগরাজকে গুঁতিয়ে ফেলে চলে গেল।
নাগরাজ মাটিতে পড়ে গেল। তার হাতে চোট লাগল। আঘাত লাগার জায়গা থেকে রক্ত ঝরছিল। ঘটনাটা ঘটেছিল সন্ধ্যার বাড়ির সামনে। নাগরাজের আর্তনাদ শুনে বুড়ি বেরিয়ে এসে বলল, 'এ কী বাবা, এত রক্ত ঝরছে কেন?' বলে বুড়ি আঘাত-লাগা জায়গায় চেপে ধরে নাগরাজকে ঘরের ভেতরে আসতে বলল।
'আজকে আপনাকে একটা বিশেষ কথা বলার জন্য আসছিলাম। হঠাৎ একটা ষাঁড় গুঁতিয়ে পালিয়ে গেল।' নাগরাজ বলল।
বুড়ি নাগরাজকে ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়ে বসিয়ে, চিৎকার করে ডাক দিল, 'সন্ধ্যা, একটু জল নিয়ে আয় তো।'
এতক্ষণ যা ঘটছিল সন্ধ্যা আড়ালে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল। নাগরাজ যে আঘাত পেয়েছে তারজন্য তার চোখে-মুখে কোনো দয়া বা উদবেগের চিহ্ন দেখা গেল না। মা চিৎকার করে বলাতে সে একপাত্র জল নিয়ে নাগরাজ যেখানে বসেছিল সেখানে গেল।
এই প্রথম নাগরাজ সন্ধ্যাকে দেখল। অত সুন্দরী তরুণী নাগরাজ জীবনে দেখেনি। সন্ধ্যার আনা জল দিয়ে চোট লাগা জায়গায় ভালো করে ধুয়ে মুছে বুড়ি ওষুধ লাগিয়ে দিল। ওষুধ লাগিয়ে বুড়ি ভালো করে বেঁধে দিল। এতক্ষণ সন্ধ্যা ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে চলে গেল। বুড়ি নাগরাজকে বলল, 'তুমি বিশষ কথা বলবে বলছিলে বাবা, বলো।'
তৎক্ষণাৎ নাগরাজ বুড়িকে বলল, 'তেমন কিছু নয়। কিছুদিনের মধ্যেই রত্নার সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে। ওদের পরিবারের সঙ্গে বহুকালের আলাপ। সন্ধ্যাকে নিয়ে আপনাকে কিন্তু বিয়ের দিন আসতেই হবে।' বলে নাগরাজ বাড়ি ফিরে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'আচ্ছা রাজা, সন্ধ্যাকে দেখার আগে থেকেই নাগরাজ মনে মনে তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। তাকে বিয়ে করার প্রতিজ্ঞাও সে করে ফেলেছিল। কিন্তু সন্ধ্যাকে দেখার পর, হঠাৎ তার মত বদলে গেল কেন? অমন সুন্দরীকে বিয়ে না-করে সেই পাড়াগাঁয়ে, লেখাপড়া-না-জানা মেয়ে রত্নাকে বিয়ে করতে গেল কেন? এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না-দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই কথার জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'নাগরাজের নিজের মত বদলে ফেলার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। পুরুষের মধ্যে যেমন পৌরুষ, আত্মাভিমান, ধৈর্য, সাহস থাকা চাই তেমনই নারীর মধ্যেও দয়া, মায়া, করুণা এবং সেবা করার ইচ্ছা থাকা চাই। নাগরাজের হাত থেকে রক্ত ঝরা দেখেও সন্ধ্যার চোখে-মুখে করুণা বা সহানুভূতির ছাপ ফুটে উঠল না। এই অবস্থা লক্ষ করে নাগরাজ, নিজের মত বদলে, ঠিকই করেছে।'
রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন