নাস্তিকের দৈবভক্তি

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন তিনি নীরবে। তখন শব থেকে বেতাল বলল, 'রাজা, একজন মানুষ আস্তিক অথবা নাস্তিক হতে পারে। কিন্তু আমি একজনের কাহিনি বলব যে দুটোই ছিল। কাহিনিটি শুনলে পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল তার কাহিনি শুরু করল:

কোনো এক দেশে রামেশ্বর নামে একজন লোক ছিল। গরিবদের সে খুব সাহায্য করত। গরিবের দুঃখে তার প্রাণ কাঁদত। তবে তার ঠাকুরদেবতার প্রতি ভক্তি ছিল না। কোনো মন্দিরে সে ঢুকত না। সে ছিল নাস্তিক। তার ধারণা ছিল অসহায় মানুষকে সেবা করার চেয়ে ইহজগতে বড়ো ধর্ম আর কিছু নেই।

একবার রামেশ্বরের মেজো ছেলের কঠিন অসুখ করল। তার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নগরের বড়ো বড়ো বৈদ্য এসেও রামেশ্বরকে ভরসা দিতে পারল না। তার ওই বিপদের সময়ে বন্ধু আত্মীয়স্বজনরা তাকে বলল, 'যেহেতু তুমি নাস্তিক সেইহেতু তোমাকে ভগবান পরীক্ষা করে দেখছেন। ভালো চাও তো প্রায়শ্চিত্ত কর। ঠাকুরের নামে মানত কর।'

'আমি নাস্তিক হয়ে ভগবান অথবা মানুষের ক্ষতি করিনি। নাস্তিক বলে যদি ঠাকুর আমাকে শাস্তি দিতে চান তাহলে তিনি কী ধরনের ঠাকুর! যা ঘটে থাকুক, আমি কোনো দেবতার নামে মানত করব না।' রামেশ্বর পরিষ্কার বলল।

রামেশ্বরের স্ত্রী স্বামীকে না জানিয়ে এক হাজার এক টাকা খরচ করে পুজো দেওয়ার মানত করল। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হল না। কিছুদিন পরে ঠাকুরদেবতার উপর রামেশ্বরের স্ত্রীরও বিশ্বাস কমে গেল।

কিছুদিন পরে সেই গ্রামে এক মহাপুরুষ এল। চারদিকে রটে গেল ওই মহাপুরুষের ক্ষমতা অসীম। তার হাতের ছোঁয়া পেলে অন্ধ লোক আলো দেখতে পায়, যেকোনো কঠিন অসুখ সে নাকি সারিয়ে দিতে পারে। রামেশ্বরের স্ত্রী স্বামীকে বলল, 'কে নাকি মহাপুরুষ এসেছেন, ছেলেকে তাঁর কাছে নিয়ে গিয়ে দেখালে হত না? উনি নাকি দেবতা।'

'মানুষ আবার দেবতা হবে কী করে? আমি তো শুনেছি একটা সাধু এসেছে। সাধু যদি রোগ সারায় বৈদ্য করবে কী? এসবে আমার বিশ্বাস নেই।'

তারপর ছেলেকে নিয়ে রামেশ্বর বিভিন্ন দেশ ঘুরে বহু নামকরা বৈদ্যকে দেখাল। কিন্তু কোনো ফল হল না। কিছুদিন পরে মহাবিষ নামে এক বৈদ্য দেশে দেশে ঘুরতে ঘুরতে রামেশ্বরদের গ্রামে এল। ওই বৈদ্যের হাত দিয়ে নাকি নানা ধরনের রুগি সেরে উঠেছে। মহাবিষ গ্রামে ঢোকার পরের দিন থেকে চারদিকের লোক এসে ভেঙে পড়ল। রামেশ্বরও ছেলেকে নিয়ে গিয়ে ওই বৈদ্যকে দেখাল। ছেলেকে পরীক্ষা করে মহাবিষ তিনটি পুরিয়া দিল। দিনে একটি করে খেতে হবে।

একপুরিয়া খাওয়ার পরেই ছেলের ঠোঁট নড়ে উঠল। মুখে ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। দ্বিতীয় পুরিয়া খাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে সে ভালোভাবেই কথা বলতে পারল। তৃতীয় পুরিয়া খাওয়ানোর পর রামেশ্বর মহাবিষের কাছে গিয়ে বলল, 'প্রভু, আপনি অসামান্য বৈদ্য। আমার দুর্ভাগ্য যে আমি এতদিন আপনার সন্ধান পাইনি।'

মহাবিষ হেসে বলল 'আমার কাছে নানা ধরনের ওষুধ আছে। রোগ যদি সেরে থাকে ওষুধের জন্যই সেরেছে। অন্য কোনো কারণে নয়। সাধারণ রোগ যেকোনো বৈদ্য সারাতে পারে। কিন্তু আমার কাছে বহু কঠিন কঠিন রোগ সারানোর ওষুধ থাকায় আমি দেশে দেশে ঘুরি। ওষুধ খেয়ে সেরে ওঠার পর যে যা আমাকে দেয় আমি তাই নিই।'

রামেশ্বর তার হাতে এক হাজার টাকা দিয়ে তার পায়ে প্রণাম করে বলল, 'প্রভু, এতদিন ভেবেছিলাম ভগবান নেই কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আপনিই ভগবান।'

মহাবিষ রামেশ্বরকে হাত দিয়ে ধরে তুলে বলল, 'দেবতার প্রতি তোমার বিশ্বাস নেই? তুমি হয়তো প্রত্যক্ষ দৈবস্বামীর দর্শন পাওনি। তাঁর দর্শন পেলে দেবতার উপর তোমার বিশ্বাস জাগত। আমি তাঁর ভক্ত। তাঁর নির্দেশেই আমি দেশে দেশে ঘুরে রুগিদের দেখি। পারলে একবার তুমি তাঁর দর্শন করে এসো।'

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, এখন তুমিই বল, রামেশ্বরকে কী বলা যায়? নাস্তিক না আস্তিক? যে লোকটা কোনোদিন মন্দিরে ঢোকেনি সে মহাবিষের মধ্যে দেবতার সন্ধান পেল কী করে? মহাবিষ যাঁর শিষ্য তাঁর মধ্যে সে দেবতার সন্ধান পেল না কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

রাজা বিক্রমাদিত্য এই প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'ভগবানের কোনো আকার নেই। তিনি যে কখন কাকে কোনরূপে দেখা দেবেন তা কেউ জানে না। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মত। একমতের লোক অন্য মতের মানুষকে নাস্তিক বলে। যাঁরা ঠাকুরদেবতা বিশ্বাস করে তারা সব কিছুর জন্য ঠাকুরদেবতাকেই দায়ী করে। তা না করাতেই রামেশ্বর ওদের চোখে নাস্তিক হয়ে গেল। মহাবিষ রুগিদের রোগ সারানোই জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছে। নিজের ছেলে সেরে ওঠার পর মহাবিষের মধ্যে দেবতার দর্শন লাভ রামেশ্বরের পক্ষে স্বাভাবিক। যিনি একজায়গায় বসে উপদেশ বিতরণ করেন তাঁর মধ্যে দেবতার সন্ধান পায়নি রামেশ্বর। তাকে দেখে রামেশ্বরের মনে হয়েছে তিনি একজন সাধারণ মানুষ। তাই রামেশ্বরের মধ্যে পরস্পরবিরোধী কোনো মত নেই। সে যা ছিল তাই রইল।'

বিক্রমাদিত্য রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শবসহ আবার ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%