স্নেহ বড়ো অন্ধ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, আমার ধারণা, যেকোনো রাজা রাজনীতিকেই অগ্রাধিকার দেয়। প্রথমে রাজনীতি পরে অন্য নীতি। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে, এটা লক্ষ করা গেছে স্নেহ প্রীতি ভালোবাসা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। রবিবর্মার কাহিনি শুনলে আমার কথা পরিষ্কার বোঝা যাবে। এই কাহিনি শুনতে শুনতে চললে পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল এই কাহিনি শুরু করল—

রবিবর্মা ছিল খুব শক্তিশালী রাজা। বিজয়শেখর নামে এক রাজাকে সহজেই সে যুদ্ধে হারিয়ে দিল। তারপর সে সিংহাসনে বসল। বিজয়শেখর শেষমুহূর্ত পর্যন্ত রবিবর্মার বিরুদ্ধে বীরের মতো যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করল। তার মৃত্যুর বিবরণ শুনে তার স্ত্রী বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে মরে গেল। বিজয়শেখরের একটি ছেলে ছিল। রবিবর্মার কোনো ছেলে ছিল না। সে বিজয়শেখরের ছেলেকে নিজের ছেলের মতো যত্নে লালনপালন করতে লাগল। সেই ছেলের নাম রাখল বিজয়বর্মা। বিজয়শেখরের ছেলে বিজয়বর্মাকে রবিবর্মা আদরযত্নে লালনপালন করে বড়ো করতে লাগল।

রবিবর্মার ছিল একটি মেয়ে। মেয়েটি যথাসময়ে বড়ো হল। ওই মেয়ের পাত্র নির্বাচন উপলক্ষ্যে স্বয়ম্বর সভা ডাকা হল। ঘোষণা করা হল যার সঙ্গে বিয়ে হবে তাকে অর্ধেক রাজত্বও দেওয়া হবে।

এই ঘোষণা শুনে বিজয়বর্মার মনে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া হল না। তবে নতুন সেনাপতি হয়ে যে লোকটা তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছিল সেই ভূপতির দুঃখ হল। সে বিজয়বর্মার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলল। তারপর বিজয়বর্মার হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে রবিবর্মার বিরুদ্ধে নানা কথা তার কানে ঢালতে লাগল। এই কথার বেশিরভাগই বানানো এবং কষ্টকল্পিত।

একবার বিজয়বর্মাকে ভূপতি বলল, 'যে যাই বলুক, আমরা তো জানি, তুমি রবিবর্মার পোষ্যপুত্রের মতো। এই যদি তোমার বাবা হত তাহলে তোমার প্রাপ্য রাজত্ব থেকে অর্ধেকটা জামাইকে দিয়ে দিত না। আর এক্ষেত্রে সত্যি কথা বলতে কী, এটা তো তোমার বাবার সিংহাসন। তোমার বাবার সিংহাসনে বসে রবিবর্মা নিজের জামাইকে অর্ধেক রাজত্ব দিতে চাইছে। এ হল পরের ধনে পোদ্দারি। ন্যায়বিচারের দিক থেকে এই দেশ তো তোমাদের। রবিবর্মার কি উচিত ছিল না এই জমির প্রতিটি কণা তোমার হাতে তুলে দেওয়া? এখন তুমি যদি কিছু করতে চাও তাহলে আমি সবদিক থেকে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।'

বিজয়বর্মা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু রবিবর্মার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে একটা দল তো গঠন করতে হবে। দল গঠন করতে গেলে বিপদের আশঙ্কা আছে। যেকোনো সময় উনি গুপ্তচরদের মাধ্যমে জানতে পারবেন। যদি একবার সব জেনে যান তাহলে তোমাকে এবং আমাকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দেবেন। তাই নয় কি!'

ভূপতি হেসে বলল, 'তোমার কোনো ভয় নেই। যে মুহূর্তে টের পাব, রবিবর্মা আমাদের গোপন ব্যাপার জেনে গেছে সেই মুহূর্তে আমরা গোপন পথে পাশের দেশে চলে যেতে পারব। পাশের দেশের রাজা নরসিংহ ভালো রাজা। ওনার কাছে আমরা সবরকমের সাহায্য পেতে পারি। তার সাহায্য নিয়ে আমরা অতর্কিতে আক্রমণ করে অতি সহজেই রাজধানী দখল করতে পারব। তুমি জানো না, গোপন পথ কোত্থেকে কোথায় গেছে?'

সেদিন সন্ধ্যার সময় রবিবর্মা উদ্যানে পায়চারি করছিল। এমন সময় তার পোষা একটি পায়রা, মুখে একটি চিঠি নিয়ে তার কাঁধে বসল। সেই চিঠিতে লেখা ছিল: 'আজ রাত্রে রবিবর্মার জীবন বিপন্ন হতে পারে। সেনাপতি ভূপতির সাহায্যে বিজয়বর্মা আপনার রাজত্ব কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে।'

রবিবর্মা তৎক্ষণাৎ অন্তঃপুরে ঢুকে প্রহরীদের ডেকে পাঠাল। সবাইকে পরীক্ষা করে রবিবর্মাকে হত্যা করার জন্য যে প্রহরীকে ঠিক করা হয়েছিল তাকে ধরা হল।

সেদিন রাত্রে রবিবর্মা খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, ভূপতি বিজয়বর্মার সঙ্গে আছে। কিন্তু রাজভবনের ভেতরে ওরা যে ঘটনা ঘটাবে ভেবেছিল তা ঘটাতে পারল না। ওরা যে গোপন পথে অন্য কোথাও চলে গেছে তারও কিছু কিছু চিহ্ন দেখা গেল। রাজভবনের অন্তঃপুর থেকে যে সুড়ঙ্গপথ শুরু হয়েছে সেটা শেষ হয়েছে অনেকদূরের বনের একটি দেবালয়ের মূর্তির পেছনে। ওই দেবালয়ের চারদিকে গোপনে কিছু সৈনিককে নিয়োগ করা হল। ওরা রাতদিন সেখানে পাহারা দেয়।

সেই গোপন পথ দিয়ে বিজয়বর্মা ও ভূপতি রাজা নরসিংহের কাছে গেল। ভূপতি রাজা নরসিংহকে গোপনে বলল, 'আপনি অবিলম্বে বিজয়বর্মাকে বন্দি করুন। চলুন বিজয়বর্মার সিংহাসন দখল করতে।'

তারপর ভূপতি রাজা নরসিংহ এবং তার পঞ্চাশ জন বীর সৈনিককে নিয়ে সুড়ঙ্গপথে রাজা রবিবর্মাকে সিংহাসন থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে রওনা হল।

এদিকে রবিবর্মা জানতে পারল যে এখন যারা আসছে তাদের মধ্যে বিজয়বর্মা নেই। সে নির্দেশ দিল সুড়ঙ্গপথ দু-দিক থেকে বন্ধ করে দেওয়ার। ওরা সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে পড়ল। রবিবর্মা সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাজা নরসিংহের সিংহাসন দখল করল।

বিজয়বর্মাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাকেই সেই দেশের রাজা করে ফেলল।

যথাসময়ে রবিবর্মার মেয়ের বিয়ে হল। অর্ধেক রাজত্ব জামাই পেল। বাকি অর্ধেক রবিবর্মা বিজয়বর্মার রাজত্বের সঙ্গে জুড়ে দিল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, চক্রান্তকারীদের মধ্যে প্রধান যে দু-জন, ভূপতি এবং বিজয়বর্মা, তাদের মধ্যে, রাজা রবিবর্মা ভূপতিকে মৃত্যুদণ্ড দিল আর বিজয়বর্মাকে রাজা করে ফেলল। এতে রাজনীতির চেয়ে বিজয়বর্মার প্রতি স্নেহ কি বেশি প্রকাশ পাচ্ছে না? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'ভূপতি যে চক্রান্ত করেছিল সেটা নষ্ট করার মূলে ছিল বিজয়বর্মা। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে পায়রার মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছিল বিজয়বর্মা নিজে। এই ঘটনা রবিবর্মা ভালোভাবে অনুধাবন করেছেন। ভূপতি এবং বিজয়বর্মার মধ্যে যে বিরোধ ছিল তার পরিণতি ঘটেছে বিজয়বর্মাকে কারাগারে নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে। এই ঘটনাতেই প্রকাশ পায় যে ভূপতি বুঝতে পেরেছিল বিজয়বর্মা বিশ্বাসঘাতকতা করছে অথবা ভবিষ্যতে সিংহাসনে বসার জন্য করবে।'

রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%