পরিবর্তিত মানুষ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, মানুষের মন ক্ষণে ক্ষণে কেন যে বদলায় সে-কথা ভাবতে গেলে আশ্চর্য লাগে। মানুষের মন কত যে গতিশীল আর কত বেশি পরিবর্তনশীল তা বোঝানোর জন্য উদাহরণস্বরূপ আমি বিক্রমবর্মা ও সমরসেনের কাহিনি বলব। আমার এই কাহিনি শুনতে শুনতে পথ চললে পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—

বিক্রমপুরী ও আনন্দপুরী নামে পাশাপাশি দুটো দেশ ছিল। অনন্তকাল ধরে এই দুটো দেশের মধ্যে শত্রুতা ছিল। দুই দেশের মধ্যে ছোটোখাটো বিরোধ বাড়তে বাড়তে যখন সীমা ছাড়িয়ে যেত তখন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেত। যুদ্ধের ফলে উভয় দেশের বিষয়সম্পত্তি নষ্ট হত। উভয় দেশের অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হত। ফলে সমস্ত দিক থেকে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হত। এত কিছু হওয়ার পরেও দেখা যেত কোনো দেশেরই জয় হত না।

আমি যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে বিক্রমপুরীর রাজা ছিল বিক্রমবর্মা আর আনন্দপুরীর রাজা ছিল আনন্দবর্মা। আনন্দবর্মার মন্ত্রীর নাম ছিল ভদ্রপাল আর সেনাধিপতির নাম ছিল সমরসেন।

আনন্দবর্মা রাজা হয়েই প্রতিজ্ঞা করল, যেকোনোভাবে বিক্রমপুরী জয় করবে। মন্ত্রী ভদ্রপাল রাজার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলল, 'আপনার পূর্বপুরুষ যুগ যুগ ধরে যে কাজ পারেননি, আপনি যদি সেই কাজ করেন, যদি জয়ী হন তাহলে আমাদের দেশের ইতিহাসে আপনার নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।'

মন্ত্রী সমর্থন করলেও সেনাধিপতি সমরসেন কিন্তু রাজাকে সমর্থন করল না। সে রাজাকে বলল, 'মহারাজ, পাশাপাশি এই দুই দেশের মধ্যে অসংখ্য বার যুদ্ধ হয়েছে। বহু মানুষের জীবন নষ্ট হয়েছে। অঢেল ধনসম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু একবারও কেউ কাউকে জয় করতে পারেনি। এখন আমার মনে হয় বিক্রমপুরীর সঙ্গে যুদ্ধের কথা চিন্তা না-করে ওই দেশের সঙ্গে স্থায়ী মৈত্রী কী করে গড়ে তোলা যায় তা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে সেটা উভয় দেশের পক্ষেই মঙ্গল হবে।'

সমরসেনের কথার গুরুত্ব রাজা বুঝল না। তার পরামর্শ কানে না-তুলে আনন্দবর্মা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলল। অগত্যা সমরসেনকে সৈনিকদের শরীর মন যুদ্ধের জন্য গড়ে তোলার দিকে মন দিতে হল। সারা দেশে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মানসিকতা তৈরি করতে মন্ত্রী উঠে-পড়ে লাগল। শুধু পাশের দেশের বিরুদ্ধে প্রচার করলেই হয় না, সঙ্গে সঙ্গে প্রজাদের কাছ থেকে অর্থও তুলতে হয়। এইভাবে সারা দেশে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। রাজধানীর চারদিকে পাহারার ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়।

পাশের দেশে এইভাবে যখন যুদ্ধের আবহাওয়া তৈরি হয় তখন সেই খবর বিক্রমপুরীর রাজা বিক্রমবর্মার কাছেও আসে। বিক্রমবর্মা নিজে যে শুধু বীর ছিল তাই নয়, শাসক হিসেবেও সে ছিল দক্ষ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। যেকোনো বিষয় সঠিকভাবে বিচার করার সূক্ষ্ম ক্ষমতা তার ছিল।

এদিকে আনন্দবর্মা গুপ্তচর পাঠিয়ে বিক্রমপুরের ভেতরের অবস্থা জানতে লাগল।

এইভাবে কিছুদিন কেটে গেল। নানাভাবে আনন্দবর্মা চেষ্টা করল যাতে বিক্রমবর্মা সসৈন্যে তার দেশ আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে। অতর্কিতে একদিন বিক্রমবর্মা আনন্দপুরী আক্রমণ করল। আনন্দবর্মা তার সৈনিকদের এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল। উভয় দেশের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ বেধে গেল। আনন্দবর্মা জানতে পারল বিক্রমবর্মা নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে সৈনিকদের পরিচালনা করছে। শুনেই আনন্দবর্মাও সৈন্য পরিচালনা করতে নিজে এগিয়ে এল। এতক্ষণ সেনাধিপতি যে কাজ করছিল সেই কাজ আনন্দবর্মা নিজেই করতে লাগল।

এই ঘটনার পরের দিন প্রতিপক্ষের বিষাক্ত তিরে বিদ্ধ হয়ে আনন্দবর্মার মৃত্যু ঘটল। আনন্দবর্মার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সমরসেন সৈনিকদের নিয়ে ফিরে দুর্গের ভেতরে ওদের রেখে দরজা বন্ধ করে দিল।

আনন্দবর্মার কোনো ছেলে ছিল না। তাই এখন সিংহাসনে কাকে যে বসানো হবে সেই সমস্যা দেখা দিল। মন্ত্রী বলল, 'আমাদের রাজা যেহেতু মারা গেছে সেইহেতু আমাদের এই যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে বিক্রমবর্মার কাছে সন্ধিপত্র পাঠানো উচিত।'

বিক্রমবর্মা দুর্গ আক্রমণের চেষ্টা করে বুঝতে পারল কাজটা অত সহজ নয়। ফিরে যাবে কিনা ভাবছিল এমন সময় আনন্দপুরীর মন্ত্রী ভদ্রপালের নিজস্ব লোক বিক্রমবর্মার সঙ্গে দেখা করে কথা বলল।

আনন্দবর্মার মৃত্যুর পর সমরসেন যতটা উদ্যোগ নিয়ে বিক্রমবর্মার বিরুদ্ধে লড়তে চাইল ততটা উদ্যোগ আনন্দবর্মা বেঁচে থাকতে তার ছিল না। তাই মন্ত্রী ভাবল, 'সমরসেন হয়তো রাজা হতে চায়। সে যদি রাজা হয় আমাকে তো মন্ত্রীপদে রাখবে না। অপরপক্ষে আমি যদি বিক্রমবর্মাকে এখন সাহায্য করি তাহলে বিক্রমবর্মা নিশ্চয় রাজা হয়ে আমাকে মন্ত্রী করবে।' এই কথা ভেবে সে গোপনে বিক্রমবর্মাকে সাহায্য করল। ফলে তার সাহায্যে, একদিন মধ্যরাত্রে বিক্রমবর্মা দুর্গ আক্রমণ করে সমরসেন ও অন্য কয়েক জন বীর সৈনিককে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করল ভদ্রপাল ভেবেছিল বিক্রমবর্মা প্রকাশ্যে সমরসেনকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু তা হল না।

একদিন বিক্রমবর্মা কারাগার থেকে সমরসেনকে ডেকে পাঠিয়ে বলল, 'ভেবেছিলাম তোমাকে ফাঁসি দেব, কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা সুযোগ দিতে চাই। তুমি যদি সেই সুযোগ নাও তাহলে তোমার ফাঁসি হবে না। তুমি যদি আমার কাছে একটু অনুগত থাকো, আমার আনুগত্য স্বীকার করো, তাহলে তোমাকে সেনাধিপতি করব।'

'আমার ফাঁসি হয় হোক। আমি আপনার অধীনে সেনাপতির পদে থাকতে চাই না।' সমরসেন বলল।

'শেষবারের মতো আর একবার তোমাকে সুযোগ দিচ্ছি। ফাঁসির আগে তোমার যদি কিছু বলার থাকে বলো।' বিক্রমবর্মা বলল।

সমরসেন বুক টান করে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমাকে কিছু বলতে বলেছেন তারজন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। অনন্তকাল ধরে বিক্রমপুরী ও আনন্দপুরীর মধ্যে যুদ্ধ চলে আসছে। ফলে অনেক ধনসম্পত্তি নষ্ট হচ্ছে ও অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এসব কিছু হচ্ছে মাত্র কয়েক জনের মূঢ়তার জন্য। এখন আনন্দপুরী আপনার হাতে। আমার প্রার্থনা, এই দেশের আর যাতে ক্ষয়ক্ষতি না-হয় আপনি তার চেষ্টা করুন।'

বিক্রমবর্মা সমরসেনের কথা শুনে নিজের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করল। সমরসেনকে ফাঁসি না-দিয়ে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করল। সমরসেনের বক্তব্য বিক্রমবর্মার খুব ভালো লাগল।

এদিকে ভদ্রপাল প্রতিমুহূর্ত অপেক্ষা করছিল বিক্রমবর্মা কখন তাকে ডাকবে, মন্ত্রীর পদ দেবে। কিন্তু বিক্রমবর্মা অনেকদিন পরেও আর তাকে ডাকল না। ভদ্রপালের কথা বিক্রমবর্মার মনে হল কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিল।

বিক্রমবর্মা শাসক হিসেবে দক্ষ ছিল। তাই কিছুকালের মধ্যেই আনন্দপুরীর প্রজাদের মন জয় করতে পারল। সারা দেশে কিছু কিছু গঠনমূলক কাজ শুরু হয়ে গেল। এ-রকম একটা অবস্থায় রাজা বিক্রমবর্মার কাছে সমরসেন এসে বলল, 'মহারাজ, আপনার অধীনে, যেকোনো কাজে, আমি নিযুক্ত হতে চাই।'

বিক্রমবর্মা সমরসেনকে নিজের প্রধান পরামর্শদাতা পদে নিয়োগ করল আর ঘোষণা করে দিল যে রাজা যখন রাজধানীতে থাকবে না তখন তার কাজকর্ম সমরসেন দেখবে।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, বিক্রমবর্মা ও সমরসেনের ব্যাপারে আমার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন জেগেছে। সমরসেন প্রথমে বিক্রমপুরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চায়নি। চেয়েছিল সন্ধি। তারপর যখন যুদ্ধ হল, আনন্দবর্মার মৃত্যু ঘটল, তখন সন্ধি করতে চাইল বিক্রমবর্মার সঙ্গে। আর একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় সমরসেনকে বিক্রমবর্মা সেনাধিপতির পদ দিতে চাইল। সে নিল না। কিন্তু পরে তারই অধীনে যেকোনো পদে কাজ করতে চাইল সমরসেন। এদিকে বিক্রমবর্মা সমরসেনকে ফাঁসি দেবে ঠিক করেছিল। কিন্তু শেষের দিকে তাকেই প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে নিযুক্ত করল। বিক্রমবর্মার মনের গতিবিধির কথা বোঝা দায়! সে ভদ্রপালের সাহায্যে যে আনন্দপুরী জয় করল সেই ভদ্রপালকে সে দিব্যি ভুলে গেল। সমরসেন এবং বিক্রমবর্মার কেন যে ঘন ঘন মনের পরিবর্তন হল, তা জানা সত্ত্বেও যদি আমাকে না বলো তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'চিন্তাধারার দিক থেকে বিক্রমবর্মা এবং সমরসেনের মনের গতিবিধি ঘন ঘন পরিবর্তন হয়নি। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওরা যখন যা বলেছেন ঠিক কথাই বলেছেন। অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সমরসেন প্রথমে যুদ্ধ করতে চায়নি। দেশে শান্তি থাকলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় দেশবাসী। বিক্রমবর্মা শত্রু হিসেবে সমরসেনকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। তারপর যখন তাকে বুঝতে পারল তখন তাকে সেনাধিপতির পদ দিতে চাইল। কিন্তু তখন সমরসেন বিক্রমবর্মাকে বুঝতে পারেনি। কিছুকাল পরে কাজকর্ম দেখে, সমরসেন যখন দেখল যে দেশের উন্নতি হচ্ছে তখন কাজ করতে চাইল।'

রাজা মুখ খোলার সঙ্গেসঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%