ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। এমন সময় শবেস্থিত বেতাল বলে উঠল, 'রাজা, তুমি যা করছ তা ধর্মের না অধর্মের সে প্রশ্ন তুলছি না। তবে তোমার প্রয়াস সফল হবে কি না সেটাই আমার কাছে বড়ো প্রশ্ন। সিংহপুরীর রাজা নরসিংহবর্মা মস্তবড়ো ধার্মিক ছিলেন। বিজয়লাভের জন্য তিনি অত্যন্ত অধর্মের পথ ধরেছিলেন। আমার এই কাহিনি শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
শোনপুরের রাজা জয়পুর রাজার অধীন ছিল। শোনপুর ছিল একটি ছোট্ট দেশ। তবে সেই দেশে ছিল গুণী-জ্ঞানী ও ধনী লোক। জয়পুরে রাজার নাম ছিল জয়দেব। জয়দেব বিপদে-আপদে শোনপুরের রাজাকে সাহায্য করত। যেহেতু শোনপুর দেশ হিসেবে ছিল ছোট্ট এবং সম্পদশালী অথচ লোকবল ও সৈন্যবলে দুর্বল ছিল সেইহেতু মণিপুরের রাজা মনিমন্ত শোনপুরের ওপর হঠাৎ আক্রমণ করল। তার নিশ্চিত ধারণা ছিল এই ধরনের দেশের ওপর আক্রমণ করে অতি সহজে জয়ী হওয়া যায়।
ঠিক সেইসময় জয়দেব ঝামেলায় পড়েছিল। অন্য সময় হলে সে সোনপুরকে রক্ষা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ত; কিন্তু নিজের দেশে ঝামেলায় জড়িয়ে থাকার জন্য অন্য দেশকে সাহায্য করার কোনো উপায় ছিল না। অগত্যা মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে সিংহপুরীর রাজা নরসিংহ বর্মার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে তাকে আর্থিক সাহায্য দিল। জয়পুর ও সিংহপুরীর মধ্যে মৈত্রীভাব গড়ে উঠল। নরসিংহবর্মা ধর্মপরায়ণ হিসেবে খ্যাতি লাভ করল। জয়পুর ও শোনপুরের নানা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে নরসিংহবর্মা এগিয়ে এল। নিজের সেনাবাহিনীকে জয়পুরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক করে মণিপুর আক্রমণ করল।
উভয় দেশের মধ্যে দু-দিন ধরে যুদ্ধ হল। দু-দিনের যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে জয় যে মণিপুরের হবে সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছিল। যুদ্ধের পরিস্থিতির যখন এই অবস্থা তখন জয়দেব নরসিংহবর্মাকে একটি কৌশল গ্রহণ করতে পরামর্শ দিল। নরসিংহবর্মা তৎক্ষণাৎ সেই কৌশল গ্রহণ করল। সে সঙ্গেসঙ্গে সন্ধির প্রস্তাব দিল। প্রস্তাবটা একেবারে একতরফা ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নরসিংহবর্মা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।
সেদিন রাত্রে মণিপুরের সৈনিকদের শিবিরে বিজয়োৎসব হচ্ছিল। সৈনিকরা মদ খেয়ে নাচানাচি করছিল। তারা যখন মত্ত অবস্থায় ছিল সেইসময় জয়পুরের সৈন্য ও সিংহপুরীর সৈন্য ঐক্যবদ্ধভাবে মণিপুরের সৈনিকদের উপর আক্রমণ চালাল। সহজেই মণিপুরের রাজাকে বন্দি করল।
শোনপুর মুক্ত হল। জয়পুরের রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নরসিংহবর্মা নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে দেশে ফিরে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, নরসিংহবর্মার ধর্মপরায়ণ হিসেবে খ্যাতি ছিল। এহেন ধর্মপরায়ণ লোক জয়দেবের পরামর্শে সন্ধি ঘোষণা করেও, রাত্রির অন্ধকারে শত্রুর শিবির আক্রমণ করল কী করে? জয়দেবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য না কি মণিমন্তের দম্ভ চূর্ণ করার জন্য? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'নরসিংহবর্মা জয়দেবের পরামর্শ গ্রহণ না করলে তাকে শোচনীয়ভাবে পরজিত হতে হত। ধর্মসংস্থাপনের জন্য একটা পরিবেশ প্রয়োজন। শোনপুরকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচানো জয়দেবের ধর্ম। কিন্তু সেই ধর্মকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সাময়িকভাবে অধর্মের পথ গ্রহণ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। স্থায়ীভাবে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য এই পথ গ্রহণ করতে হয়েছিল। যারা ছোট্ট দেশের ওপর আক্রমণ করে তারা কি অধর্ম করে না? শোনপুরের মতো ছোটো দেশের উপর আক্রমণ করা কি অধর্ম নয়? বিশেষ করে শোনপুর তো কোনো দেশের প্রতি ক্ষতিকারক কিছু করেনি। যে রাজা কথায় কথায় যুদ্ধে মেতে উঠতে চায় তাকে পরাজিত করে তার যুদ্ধলিপ্সা স্তব্ধ করা কি অধর্মের কাজ? বিনা অপরাধে যে রাজা আক্রমণ করে তাকে অধর্মের পথে পরাস্ত করা কোনো ক্রমেই অধর্ম নয়।'
রাজা মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন