ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি একজন মহাপণ্ডিত। তোমার মতো পণ্ডিতকেও দেখছি পরিবেশের দাস হয়ে যেতে। এতে আমি অবাক হচ্ছি। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিও সুবর্ণ সুযোগগুলোকে ঠিক ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ তোমাকে এক অরণ্যবাসী বীর যুবকের কাহিনি বলছি। তার নাম বীরু। এই কাহিনি শুনলে তোমার পথ চলার পরিশ্রমও কমে যাবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:

এই যখন অবস্থা তখন পূর্বদেশ থেকে একটি সাদা বাঘ ঢুকে যখন-তখন যাকে-তাকে আক্রমণ করে মেরে ফেলত। এই খবর পেয়ে মলয়সেন ওই বাঘ মারার জন্য বেরিয়ে পড়ল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বাঘকে পাওয়া গেল না। রাজার সঙ্গে ছিল দু-জন দেহরক্ষী। ওরা হঠাৎ একই সময়ে তরবারি তুলে রাজাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করল। এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য রাজা প্রস্তুত ছিল না। তবু তরবারি তুলে তাদের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে মলয়সেন।
দু-জন দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে একা বৃদ্ধ মলয়সেন পারবে কেন? বেশ বোঝা যাচ্ছিল রাজার মৃত্যু ওদের হাতে নিশ্চিত। এমন সময় এক অরণ্যবাসী যুবক এসে একজন দেহরক্ষীকে মেরে ফেলল। তাকে মেরে ফেলার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা ও ওই যুবকের আক্রমণের ফলে অন্য দেহরক্ষীও মারা পড়ল।
ওই যুবক ছিল অরণ্যবাসী ডাকাতদের সর্দারের ছেলে। তার নাম বীরু। বীরুর বাবা ছিল শিকারে ওস্তাদ। রাজভক্তির জন্য যে বীরু মলয়সেনকে বাঁচিয়েছিল তা নয়, সে লক্ষ করেছিল দু-জন যুবক মিলে একজন বৃদ্ধের উপর আক্রমণ করছে। ওই দৃশ্য দেখে তার ভীষণ রাগ হয়েছিল। এটা মলয়সেন জানত না। সে যুবকের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার সঙ্গে রাজধানীতে যেতে বলল। রাজধানী বস্তুটা যে কী ধরনের তা দেখার ইচ্ছে জেগেছিল বীরুর মনে। তাই সে যেতে রাজি হল।
রাজধানীতে পৌঁছানোর পর মলয়সেন বলল, 'দেখ বীরু, আমাকে অনেক বার অনেকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। আমার ছেলেপুলে না থাকায় সবাই চাইছে সিংহাসনে বসতে।'
খেতে বসে দু-গাল খেতে না খেতেই মলয়সেনের শরীর খারাপ হল। কারণ ওই খাদ্যে বিষ মেশানো ছিল।
সঙ্গেসঙ্গে রাজবৈদ্য ও প্রধানমন্ত্রী ছুটে এল। বৈদ্যের ওষুধে কোনো কাজ হল না। মলয়সেন বীরুকেই নিজের উত্তরাধিকারী হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঘোষণা করে মারা গেল।
চোখের পলকে যা ঘটে গেল তাতে বীরু অবাক হল। যা দেখছে যা শুনছে সবই তার কাছে নতুন। তার ইচ্ছে করল তক্ষুনি পালাতে। কিন্তু পরক্ষণেই তার আগ্রহ হল রাজাকে কে বিষ দিয়েছে তা জানার।
সিংহাসনে বসার পর বীরুকেও মেরে ফেলার চক্রান্ত শুরু হয়ে গেল। কিন্তু সৌভাগ্যবশত প্রত্যেক বারই বিপদের হাত থেকে সে বেঁচে যেতে লাগল।
ঠিক ওই সময় দেশের চারদিকে ডাকাতি শুরু হল। বীরু বুঝতে পেরেছিল কারা ওই ডাকাতি করছে।

বীরু কারাগারে এসে অপরাধীকে দেখতে চাইল। বীরুকে দেখেই আনন্দে ওই ডাকাতের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ওই ডাকাতটি ছিল বীরুর দলের ডাকাত। মাঝরাত্রে বীরু তার ডাকাত সঙ্গীকে মুক্ত করে অরণ্যে পালিয়ে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, বীরু রাতারাতি সিংহাসন ছেড়ে পালিয়ে গেল কেন? তাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হচ্ছিল বলে? নাকি সে বুঝেছিল যে দেশ শাসন করার ক্ষমতা তার মধ্যে নেই? রাজাকে কে বিষ দিয়েছে তা কি সে জানতে পেরেছিল? ডাকাতকে বীরু দিনের বেলায় মুক্ত করল না কেন? আমার এই প্রশ্নের সমাধান জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'বীরুর উপর হত্যার চক্রান্ত চলছিল বলে সে ভয় পায়নি। তার দলের লোককে কারাগারে দেখার পর এক সমস্যা দেখা দিল। রাজা হিসাবে ওই ডাকাতকে মুক্ত করলে সারা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ত যে রাজা ডাকাতকে মুক্ত করেছে। ফলে অপমানিত হয়ে একদিন তাকে সিংহাসন ছাড়তে হত। সিংহাসন নিয়ে যখন অনবরত চক্রান্ত চলছিল তখন কে-বা-কারা তা করছে তা জানার কৌতূহল বীরুর মধ্যে কমে গেল। রাজধানীর জীবনের চেয়েও তার কাছে অরণ্যের জীবন বেশি প্রিয় ছিল।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে পালিয়ে গেল ওই গাছে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন