ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাছোড়বান্দা বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তোমার এই ধরনের কাজ দেখে, বিশেষ করে এই পরিশ্রম দেখে যেকোনো লোক তোমাকে বুদ্ধিহীন ভাবতে পারে; কিন্তু অনেক সময় বুদ্ধিহীন লোকও হঠাৎ বুদ্ধিমান হয়ে যায়। তার প্রমাণ স্বরূপ বিক্রমবর্মা নামে এক রাজার কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
বিক্রমবর্মা মগধদেশের রাজা ছিল। তার মন্ত্রীর নাম বিশ্বকুম্ভ। রাজা যত ভালো ছিল মন্ত্রী ছিল তত খারাপ। সে রাজকাছারি, সৈন্যবাহিনী প্রভৃতি রাজার বিভিন্ন দপ্তরে নিজের আত্মীয়স্বজনদের চাকরি দিয়ে ঢুকিয়েছিল। রাজার অজান্তে সে বহু দুষ্কর্ম করত কিন্তু সেইসব কুকাজের খবর যাতে রাজার কাছে না পৌঁছায় সেদিকে তার তীক্ষ্ন নজরও ছিল। বিশ্বকুম্ভ অতিশয় ধূর্ত হলেও ছিল প্রচণ্ড পরিশ্রমী। সে দিনরাত পরিশ্রম করত আর রাজাকে তার চোখে চোখে রাখত। কিছুতেই রাজকে তাঁর রাত্রিকালীন বিশ্রামের আগে চোখের আড়াল করত না।

গুরুকে দেখে রাজা বিক্রমবর্মা খুব খুশি হয়ে শ্রদ্ধাভরে তাকে বসিয়ে আলাপ আলোচনা করল। তারপর কথায় কথায় গুরুর আসার উদ্দেশ্য রাজা গুরুর কাছ থেকে জানতে চাইল।
জবাবে রামশর্মা বলল, 'তেমন কোনো কাজ নেই, একটু জানতে এসেছি দেশের হালচাল কেমন চলছে?'
রাজা তৎক্ষণাৎ বলল, 'গুরুদেব, আমি কীভাবে দেশ শাসন করছি তা আমি কী করে বলব! আপনি কীরকম দেখছেন তাই বলুন।'
'প্রজারা তো ভালোই আছে। আমার তো মনে হয় প্রজারা তোমার সুগন্ধি বৃক্ষের ছায়ায় আছে। সুগন্ধও পাচ্ছে সবসময়। তোমার ভালোমানুষির সৌরভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।' রামশর্মা বলল।
গুরু রামশর্মার কথা রাজার কাছে হেঁয়ালির মতো লাগল। রামশর্মার কথা সে পরিষ্কার অনুধাবন করতে পারল না। কিন্তু এই কথার মধ্যে যে কিছু একটা গূঢ়তত্ত্ব আছে সেটুকু বুঝল। রাজা একমুহূর্ত নীরব থেকে পরক্ষণেই বলল, 'গুরুদেব, আপনি আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।'
তারপর সেইদিনই রাজা গুপ্তচরের মাধ্যমে দেশের খবর জানার চেষ্টা করল। জানতে পারল মন্ত্রীই সবচেয়ে বড়ো অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। পরের দিনই মন্ত্রীকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। মন্ত্রীকে সরানোর পর প্রজাদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইল। এত ভালো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে রাজা বুঝল যে সে যা করছে ঠিক করেছে।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, এই যে কাহিনি বললাম এর মধ্যে আমার কয়েকটা প্রশ্ন করার আছে। রামশর্মা এসেছিল রাজাকে সব কিছু জানিয়ে দিতে কিন্তু সে তা না জানিয়ে শুধু রাজার প্রশংসা করেই চলে গেল। যে গুরু মন্ত্রীর নিন্দা করতে এসেছিল সে রাজার প্রশংসা করে চলে গেল কেন? আর একটা প্রশ্ন, রাজাই বা রামশর্মা আসার আগে অনেকগুলো অনুযোগ পেয়েও মন্ত্রীর কাজকর্মের ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর করল না কেন? আমার এই দুটো প্রশ্নের সঠিক জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে একেবারে চৌচির হয়ে যাবে।'

প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রামশর্মা যে কাজে এসেছিলেন তা সফল হয়েছে। কথা অনেকভাবেই বলা যায়। সরাসরি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে না বলে সূক্ষ্মভাবে রাজাকে বিদ্রূপ করে তিনি চলে গেলেন। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ, রাজা রামশর্মার সঙ্গে গোপনে দেখা করেননি। অনেকের মধ্যে দেখা করা, কথা বলা রামশর্মার ভালো না লাগতে পারে। রামশর্মা যদি সেখানে বলতেন, ''বিক্রমবর্মা তোমার সঙ্গে গোপনে কিছু কথা আছে।'' তাহলে সঙ্গেসঙ্গে মন্ত্রী তার গুপ্তচর লাগিয়ে দিত। ফলে রাজা এবং রামশর্মার মধ্যে যে কথা হত সে কথা মন্ত্রী জানতে পারত। যে মন্ত্রী সারা দেশে কুকাজ করে বেড়াতে পারে সে যেকোনো মুহূর্তে রাজাকে মেরে ফেলতেও পারে। এই বিষয়টা বুঝতে পেরে রামশর্মা ঘুরিয়ে রাজার প্রশংসা করে চলে গেল। রামশর্মার ওই একটি কথাতেই কাজ হয়েছিল। এতদিন রাজাকে মনে করা হত তার বুদ্ধি নেই কিন্তু এখন বোঝা গেল রামশর্মার কথা বোঝার মতো ক্ষমতা রাজার আছে। সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছে শুনেই রাজা বুঝে নিয়েছিলেন যে রাজার কাজকর্মের ব্যাপারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে প্রজাদের মধ্যে। তাই তিনি কালমাত্র বিলম্ব না করে দেশের কাজের খোঁজ নিলেন। খোঁজ নিতে গিয়ে কানে টান পড়তেই মাথা এগিয়ে এল। মন্ত্রীর স্বরূপ ধরা পড়ল।'
রাজা বিক্রমাদিত্যের এই সদুত্তর শুনে বেতাল খুবই খুশি হল এবং রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে সেই শব নিয়ে আবার ফিরে চলে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন