ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজা বিক্রমাদিত্য আবার গাছের কাছে গিয়ে গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে আগের মতোই যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি হয়তো তোমার কোনো প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার জন্য এত পরিশ্রম করছ। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঝোঁকের মাথায় প্রতিজ্ঞা করলেও শেষপর্যন্ত সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা যায় না। আমার এই কথার নিদর্শন স্বরূপ তোমাকে একটি সুন্দর কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনলে তোমার ভালো লাগবে ও পথ চলার পরিশ্রম কমবে।' এই কথা বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে মালবদেশ ও পঞ্চালদেশের মধ্যে একবার প্রচণ্ড বিরোধিতা দেখা দিল। মালবদেশের রাজার নাম ছিল বীরসেন। তার ছেলের নাম ছিল বিজয়সিংহ। পঞ্চালদেশের রাজার নাম ছিল বিমলাদিত্য। ওই রাজার একটি মেয়ে ছিল। নাম মণিমালা। সে খুব সুন্দরী ও নম্রস্বভাবা ছিল। যথাসময়ে মণিমালার জন্য পাত্র বাছাই করতে স্বয়ংবর সভা ডাকা হল। বিভিন্ন দেশে খবর পাঠানো হল। সুন্দরী মণিমালাকে বিয়ে করার আশায় বহু যুবক, এমনকী বহু দেশের বহু বয়স্ক রাজাও মণিমালার স্বয়ংবর সভায় এসে হাজির হল।
তবে বিমলাদিত্য তার শত্রু বীরসেনের কাছে মণিমালার এই স্বয়ংবর সভার কোনো খবর বা আমন্ত্রণ পাঠায়নি। এতে বীরসেনের ভীষণ রাগ হল। এদিকে বীরসেনের ভীষণ আগ্রহ ছিল মণিমালাকে যেনতেনপ্রকারেণ নিজের কবলে আনার।
বীরসেন তার ছেলে বিজয়সিংকে ডেকে বলল, 'তুমি এক্ষুনি তৈরি হও। তোমাকে যুদ্ধে যেতে হবে। তুমি একাই পারবে। সৈন্য নিয়ে পঞ্চালদেশ আক্রমণ করে রাজকুমারী মণিমালাকে তুলে নিয়ে এসো। হ্যাঁ, শোনো, আমি স্থির করেছি মণিমালাকে বিয়ে করব।'

কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে সংযত করে বিজয়সিংহ বলল, 'রাজকুমারী, আপনাকে বিয়ে করতে আমার বাবা আগ্রহী। তাই আগামীকাল আমাদের দেশে যাওয়ার জন্য তৈরি থাকবেন।'
মণিমালা বিজয়সিংহের এই কথার জবাবে কোনো কথা না বলে বিজয়সিংহের কথা শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে গেল।
সেই রাত্রে বিজয়সিংহের ঘুম হল না। সারাক্ষণ তার চোখের সামনে মণিমালার মুখ ভাসতে লাগল। সে মাঝে মাঝে বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় পায়চারি করছিল। হঠাৎ মণিমালার এক চাকর একটি চিঠি এনে তার হাতে দিল। সেই চিঠিতে লেখা ছিল: 'যুদ্ধ করে বীরের মতো যে বস্তু জয় করা হয় তা অন্যের হাতে দিয়ে দেওয়া একান্ত অনুচিত।'
বিজয়সিংহ বুঝতে পারল মণিমালা তাকে বিয়ে করতে চায়। প্রথম দর্শনেই মণিমালাকে তার ভালো লেগেছে। তার ওপর এই চিঠি পেয়ে বিজয়সিংহ ঠিক করল মণিমালাকে সে-ই বিয়ে করবে। পরের দিন মণিমালাকে নিয়ে মালবদেশে ফিরে যাওয়ার কথা। বহু সময় ধরে ভেবে ভেবে অবশেষে সেদিনই বিজয়সিংহ মণিমালাকে বিয়ে করল।
সেই রাত্রে সে মণিমালাকে স্ত্রী হিসাবে পেয়ে মহানন্দে তাকে কাছে টানতে যেতেই তার বুকে একটি ছোরা ঠেকে গেল। মণিমালা ছোরা নিয়ে প্রস্তুত ছিল। বিজয়সিংহ তাকে আলিঙ্গন করতে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে সে ছোরা চালাতে গেল। বিজয়সিংহ ঝট করে তার হাত ধরে বেঁকিয়ে তাকে প্রশ্ন করল, 'আমাকে যে চিঠি দিয়েছিলে তাতে আমার মনে হয়েছিল তুমি আমায় ভালোবাস; তুমি কি ভালোবাসার অভিনয় করেছিলে? সত্যি বল, তা না হলে তুমি আমার হাতেই কঠোর শাস্তি পাবে।'

'যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাবা আমাকে শেষ কথা বলেছিলেন প্রতিশোধ নিতে। আমি তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করেছি মাত্র।'
বিজয়সিংহ কিছুক্ষণ কী যেন ভেবে, কর্তব্য স্থির করে হঠাৎ কোথায় যেন চলে গেল। তারপর থেকে তার খোঁজ আর কেউ কোনোদিনই পেল না।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, মণিমালাকে বিজয়সিংহও তো ভালোবেসেছিল, তাকে ছেড়ে সে চলে গেল কেন? সে কি মণিমালাকে ক্ষমা করতে পারেনি? মণিমালা তো বলেছিল তার ভালোবাসা অভিনয় নয়। তবু তার কথা কি বিজয়সিংহের বিশ্বাস হল না? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও না দিলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'মণিমালাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বিজয়সিংহকে দোষ দেওয়া যায় না। মণিমালার ছোরা তার বুকে বিদ্ধ হলে সে মারা যেত, মণিমালা একাই পড়ে থাকত। ওর চলে যাওয়ার কারণ অন্য। সে মণিমালার কাছে একটি শিক্ষা পেয়েছিল। মণিমালা বিজয়সিংহকে ভালোবেসেও বাপের ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে মণিমালাকে ভালোবেসে বাপের ইচ্ছার কথা ভুলে গিয়েছিল। তাই সে নিজের দেশে না ফিরে অন্য দেশে পাড়ি দিল।'
রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন