ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, কীসের জন্য যে তুমি এই শবদেহ নিয়ে এত সাধ্যসাধনা করছ জানি না। তবে সাধনা করলেই যে সুফল হয় এমন ধারণা ঠিক নয়। সাধনায় ভুল থাকলে ফল পাওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ আমি ধর্মনাথের কাহিনি বলছি। শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম কমবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে মহানগরে রসরাজ ও ধর্মনাথ নামে দু-জন চোর ছিল। ওরা দু-জনে মিলে বড়ো বড়ো চুরি-ডাকাতি করত। বনে-জঙ্গলে ছিনতাই করত। এইভাবে দু-জনে প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে গিয়েছিল। রসরাজ নিজের ভাগের টাকা নিয়ে বাড়িঘর করে সম্পত্তি বাড়াতে লাগল। কিন্তু ধর্মনাথ ওই টাকা জমিয়ে রাখত না। সে ধর্মশালা করেছিল। ওই ধর্মশালায় প্রতিদিন বহু গরিব মানুষ এসে পেটভরে খেয়ে যেত। ধর্মনাথ সাধুর বেশে দিনের বেলা ওই ধর্মশালায় থাকত, সেবার কাজ করত আর রাত্রে রসরাজের সঙ্গে চুরি করতে বেরত।
কিছুদিনের মধ্যেই ধর্মনাথের সুনাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। ধর্মনাথের কথা রাজার কানেও গেল। রাজা ধর্মনাথকে রাজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে 'ধর্মদাতা' উপাধি দিল।
এই ধর্মদাতাই যে একজন চোর তা কেউ জানত না। এমনকী রসরাজও জানত না।
কয়েক মাসের মধ্যেই সারা দেশে চুরির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় রাজা সমস্যায় পড়ল। শেষে রাজা ঘোষণা করল চোরকে যে ধরিয়ে দেবে তাকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেওয়া হবে। ঘোষণা শুনেই রসরাজ ধর্মনাথই যে চোর তা রাজাকে জানিয়ে দিল।

রসরাজ ভেবেছিল ধর্মনাথকে ধরিয়ে দিলে শুধু যে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা পাবে তাই নয়, এরপর চুরির ভাগ দিতে হবে না।
রাজার লোক গিয়ে ধর্মনাথকে বন্দি করল। রাজার সামনে ধর্মনাথ চুরি-ডাকাতির কথা স্বীকার করে নিল।
ধর্মনাথের বন্দি হওয়ার পর দুটো ঘটনা লক্ষ করা গেল। চুরি হতে লাগল, ধর্মশালায় খাওয়ানো বন্ধ হয়ে গেল। যে সাধু খাওয়াত তার আর পাত্তা ছিল না। এই কথা জানার পর রাজা ওই ধর্মশালায় খাওয়ানোর ব্যবস্থা করল।
কিন্তু চুরি চলতে থাকায় রাজা রসরাজকে বন্দি করে আনার নির্দেশ দিল। রসরাজ অবাক হয়ে রাজার সামনে দাঁড়াতেই রাজা বলল, 'রসরাজ, দু-একদিনের মধ্যেই ধর্মনাথের বিচার হতে পারে। বিচারের সময় তোমাকে সাক্ষী দিতে হবে।'
রাজার এই কথার পর রসরাজকে থাকতে হল কারাগৃহে।
দিনের পর দিন গেল কিন্তু ধর্মনাথের বিচার হল না। ফলে রসরাজকে কারাগারে আটকে থাকতে হল। ধর্মনাথকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে হঠাৎ একদিন রাজা ধর্মনাথকে ধর্মশালার অধিকর্তার পদে নিয়োগ করল। রসরাজকে কারাগারে রাখার পর থেকে দেশে চুরি আর হল না।
রসরাজ কিন্তু মুক্তি পেল না।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, ওই রাজাটা কী ধরনের রাজা? ধর্মনাথ স্বীকার করেছিল যে সে চোর। তবু তাকে শাস্তি না দিয়ে ধর্মশালার অধিকর্তার পদে নিয়োগ করল। আর ধর্মনাথকে যে ধরিয়ে দিল সেই রসরাজকে পুরস্কার না দিয়ে তাকে সারাজীবন কারাগারে বন্দি করে রেখে দিল। রাজার এই ধরনের আচরণের কারণ কী— তা জানা সত্ত্বেও যদি না জানাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'ওই রাজা সূক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন রাজা ছিলেন। যে লোকটা দিনে সাধু সেজে ধর্মশালায় বসে থাকে সেই যে রাত্রে চুরি করে এটাও রাজা হয়তো জেনেছিলেন। তবু ধর্মনাথের মধ্যে দানধর্ম করার প্রবল ইচ্ছা যে ছিল সেটা রাজা লক্ষ করেছিলেন। ধর্মনাথকে বন্দি করার পর ধর্মশালায় কোনো সাধু এল না তখন রাজার কাছে সব কিছু নিশ্চয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। অপরপক্ষে ধর্মনাথকে ধরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজার চোখ ছিল রসরাজের উপর। রসরাজ চুরি করা টাকায় অগাধ বিষয়সম্পত্তি করেছিল। ধর্মনাথের বন্দি হওয়ার পরেও দেশে যখন চুরি হতে লাগল তখন রাজা রসরাজকে বন্দি করলেন। তাকে বন্দি করার পর আর চুরি হল না। এইসব ঘটনা বিচার করে রাজা ধর্মনাথকে ওই পদে বসালেন এবং রসরাজকে বন্দি করলেন।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন