ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তোমার এই পরিশ্রমের জন্য তোমার বাবা দায়ী নয় তো? কারণ কিছু কিছু বাবা আছে যারা ছেলেদের কষ্ট না দিয়ে তৃপ্তি পায় না। একটা কাহিনি বললে আমার কথা আরও পরিষ্কার বোঝা যাবে। কাহিনিটি হল কলিঙ্গরাজ গুণশেখরের। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথচলার পরিশ্রম কমে যাবে।' বলে বেতাল শুরু করল:
কলিঙ্গরাজা গুণশেখরের একটিমাত্র ছেলে ছিল। তার নাম ছিল রাজশেখর। যুবক রাজশেখর ছিল সমস্ত বিদ্যায় পণ্ডিত। তার জ্ঞান পূর্ণ হয়েছে বলে পণ্ডিতরা মেনে নিয়েছিল। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা হলেই হবে না। দেশ শাসন করতে হলে চাই বাস্তববুদ্ধি ও জ্ঞান। তাই গুণশেখর ছেলেকে দেশভ্রমণ করতে পাঠিয়ে দিল।

রাজশেখর বিভিন্ন দেশ ঘুরে সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে চলতে চলতে একদিন বনের মাঝে রাত হয়ে গেল। ওই অন্ধকারে বনের মাঝখানে কী করবে তা সে ভেবে পাচ্ছিল না। এমন সময় মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। স্বর ছিল অস্পষ্ট। কিন্তু সেটা যে মানুষের সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। যেদিক দিয়ে আওয়াজ আসছিল সেদিকে সে এগিয়ে গেল। কিছু দূর এগোতেই শুনতে পেল মাটির নীচে থেকে আওয়াজটা আসছে। তাকিয়ে দেখল মাটির নীচে সিঁড়ি নেমে গেছে। সেও সিঁড়ি বেয়ে নীচের দিকে নেমে গেল। কিছু দূর যাওয়ার পর তার নজরে পড়ল পাতাল ভৈরবীর একটি মূর্তি। সেই মূর্তির সামনে একটি থামের সঙ্গে বাঁধা ছিল এক পরমাসুন্দরী। বিগ্রহের সামনে প্রদীপ জ্বলছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে রাজশেখর বুঝল ওই সুন্দরীর কণ্ঠস্বর সে শুনেছিল।
'কে তুমি? তোমাকে এখানে কে বেঁধে রেখেছে।' রাজশেখর ওই সুন্দরীকে জিজ্ঞেস করল।
'আমি মালবদেশের রাজকুমারী। আমার নাম মণিমালা। তান্ত্রিকের ছিল একটি মেয়ে। সে মরে গেছে। সে যে মুহূর্তে জন্মগ্রহণ করেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে জন্মগ্রহণকারী কোনো মেয়েকে বলি দিলে নাকি তান্ত্রিকের মেয়ে বেঁচে উঠবে। নিজের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য সে আমাকে ধরে এনেছে। আজ রাত্রেই বলি দেবে।' ওই সুন্দরী বলল।
'তোমার কোনো ভয় নেই।' বলে রাজশেখর থামের পেছনে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তান্ত্রিক এসে ওই দেবীমূর্তির সামনে বসে মন্ত্রপাঠ করতে লাগল। এমন সময় রাজশেখর পেছন দিক থেকে এসে তার গলা কেটে ফেলল। তারপর সে মণিমালাকে ঘোড়ায় বসিয়ে মালবদেশের দিকে রওনা দিল।
পরে মণিমালার সঙ্গে রাজশেখরের বিয়ে হল। বিয়ের পর মণিমালাকে নিয়ে রাজশেখর বাড়ি ফিরল।
কিছুদিন যেতে-না-যেতেই গুণশেখর রাজশেখরকে ডেকে বলল, 'বাবা, দেশভ্রমণ করতে তুমি আবার যাও।'
এবারে রাজশেখর অনেক দূর যাওয়ার পর একের-পর-এক হাড্ডিসার মানুষকে দেখতে পেল। জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, ওদের দেশের রাজা নাকি নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করছে।
রাজশেখর, ওদের দুর্দশা সহ্য করতে না পেরে সোজা চলে গেল ওই দেশের রাজার কাছে। তাকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করল।

ওই দেশের রাজা মুহূর্তে রেগে গিয়ে রাজশেখরকে বন্দি করল। এই খবর গুপ্তচরদের মাধ্যমে পেয়ে গুণশেখর তৎক্ষণাৎ ওই রাজার বিরুদ্ধে বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। উভয়পক্ষে বিরাট যুদ্ধ হল। যুদ্ধে ওই রাজা পরাজিত হল। পরে ওই দেশ শাসনের ভার রাজশেখরকে দিয়ে গুণশেখর ফিরে এল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'মহারাজ, যা ঘটল তাতে আমার এাকটা প্রশ্ন জেগেছে। গুণশেখর ছেলের প্রথম বারের দেশভ্রমণ পছন্দ করল না কেন? কোনোরকম দুর্ঘটনা না ঘটার ফলে কি? রাজশেখর সুন্দরী রাজকন্যাকে বিয়ে করায় গুণশেখর কি অসন্তুষ্ট হয়েছিল? দ্বিতীয় বারে দেশভ্রমণ করার পর গুণশেখর ছেলের প্রতি কি সন্তুষ্ট হয়েছিল? আমার এই প্রশ্নের সঠিক সমাধান জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রাজা গুণশেখর ছেলেকে দেশভ্রমণে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাকে ভবিষ্যতে রাজা হিসাবে তৈরি করা। প্রজাদের দুঃখদুর্দশা দেখে রাজশেখরের ইচ্ছা জেগেছিল ওই অত্যাচারী রাজার মোকাবিলা করার। রাজশেখর মনে মনে নিশ্চয় ওই ধরনের অত্যাচারী রাজাকে ঘৃণা করতে শিখেছিল। এইসব দেখে-শুনে কীভাবে দেশ শাসন করলে প্রজাদের মঙ্গল হয় তাও সে অনুভব করেছিল। ছেলের এই ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জিত হওয়ায় বাবা গুণশেখর খুব খুশি হয়ে জয় করা দেশের শাসনের ভার দিয়েছিলেন।'
এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন