মিথ্যার আশ্রয়

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে এগোতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, কীসের জন্য যে তুমি এই কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছ, জানি না। অনেক সময় অনেকে সহজভাবে প্রাপ্য বস্তুকে অবহেলা করে অথবা বুঝতে না-পেরে সেই বস্তুটি পেয়েও পায় না। উদাহরণস্বরূপ, আমি বীরবর্মার কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পথচলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—

মালবদেশের যুবরাজ কল্যাণবর্মার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল বীরবর্মা। বীরবর্মা ছিল মালবদেশের এক রাজকর্মচারীর ছেলে। তা সত্ত্বেও কল্যাণবর্মা বীরবর্মাকে যথেষ্ট গভীরভাবেই ভালোবাসত এবং বীরবর্মা যে একজন সাধারণ রাজকর্মচারীর ছেলে তা সে কখনোই ভাবত না। ওই দু-জনের বন্ধুত্ব দেখে সবাই ভাবত, ওরা পূর্বজন্মে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিল।

বীরবর্মা তৎক্ষণাৎ নিজের ঘোড়াটাকে ওই ঘোড়ার কাছে নিয়ে গিয়ে, তার লাগাম ধরে, তার সামনের পা দুটো আস্তে আস্তে নামিয়ে, তার পিঠ চাপড়ে তাকে ঠান্ডা করল। ঘোড়ার ওপরের মহিলাটিকে দেখে মনে হল সে ঘোড়ার চেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেছে। মহিলার কাছে জানা গেল যে সে অরণ্যের ওপারের উদয়গিরির রাজকুমারী। তার নাম স্বর্ণকেশী। ওরা সবাই মিলে অরণ্যে শিকার করতে এসেছিল। কিন্তু বাঘের গর্জন খুব কাছ থেকে শুনতে পেয়ে তার ঘোড়াটা ঘাবড়ে গিয়ে, দলছুট হয়ে অন্যদিকে ছুটে গেছে। লাগাম ধরে জোরে টানলে ঘোড়াটা নাকি রেগে গিয়ে তাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বীরবর্মা যে তাকে এক বিরাট বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে তারজন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এবং তাঁর সম্পর্কে রাজকুমারী যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করে।

এই ঘটনার পর দু-জনের ঘোড়া পাশাপাশি যাচ্ছিল। কথায় কথায় রাজকুমারী স্বর্ণকেশী বলল, 'আমার বাবা আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। গতকাল পর্যন্ত আমি অনেক পাত্র দেখেছি কিন্তু কোনো পাত্রকেই আমার পছন্দ হয়নি। এবার বাবা ঠিক করেছেন স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করবেন। শীঘ্র বাবা স্বয়ম্বর সভা ঘোষণা করবেন। আপনি কিন্তু ঘোষণার পর স্বয়ম্বর সভায় আসবেন। এই যা, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। এতক্ষণ আমি নিজের কথাই বলে গেলাম। আপনার পরিচয় তো আমার কিছুই জানা হল না। আপনি কোত্থেকে এসেছেন? কে আপনি?'

'আমি মালবদেশের রাজকুমার। আমার নাম কল্যাণবর্মা।' বীরবর্মা এই মিথ্যা কথা রাজকুমারী স্বর্ণকেশীকে বলল।

'ও তাই বুঝি! আপনি আমার স্বয়ম্বর সভায় অবশ্যই আসবেন।' স্বর্ণকেশী বলল।

ওদের কথা শেষ হওয়ার পর স্বর্ণকেশীকে খুঁজতে খুঁজতে তার পরিবারের সবাই পৌঁছে গেল। ওদের সঙ্গে স্বর্ণকেশী উদয়পুর ফিরে গেল। যাওয়ার সময় স্বর্ণকেশীকে দেখে মনে হল বীরবর্মাকে ছেড়ে যেতে, তার কাছ থেকে বিদায় নিতে, তার কষ্ট হচ্ছে।

ফিরে এসে বীরবর্মা সমস্ত ঘটনা জানিয়ে শেষের দিকে বলল, 'কী জানি কেন রাজকুমারী যেভাবে প্রশ্ন করল, তার জবাবে আমার মুখ থেকে মিথ্যা কথা বেরিয়ে গেল। আমি নিজেকে কল্যাণবর্মা বলে পরিচয় দিতে তখন একটুও কুণ্ঠাবোধ করিনি।'

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কল্যাণবর্মা ঠিক করল, অবশ্য মনে মনে, যেকোনোভাবে তার বন্ধুর নামের স্বার্থকতা রক্ষা করতে হবে। বীরবর্মার ঘটনা শুনে কল্যাণবর্মার নীরব হয়ে যাওয়ার একটি কারণ ছিল। কিছুকাল থেকে কল্যাণবর্মা মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল স্বর্ণকেশীকে বিয়ে করবে। সে তার মনের এই ইচ্ছা, এমনকী তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীরবর্মার কাছেও প্রকাশ করেনি। বীরবর্মার ঘটনা শুনে কল্যাণবর্মা বুঝল, স্বর্ণকেশী বীরবর্মাকে ভালোবাসে। ওদের এই ভালোবাসার মাঝখানে সে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চায় না। কল্যাণবর্মা বলল, স্বর্ণকেশীকে তুমি যদি বিয়ে করতে চাও তাহলে এ ব্যাপারে তোমার যা প্রয়োজন হবে সবই তুমি পাবে। আমি চাই তোমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠুক। তোমাদের বিয়ে হোক।'

স্বর্ণকেশী ফিরে গিয়ে, সে যে কীভাবে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে, কল্যাণবর্মা যে ঠিক সময় এসে তার প্রাণ বাঁচিয়েছে ইত্যাদি বলে শেষের দিকে ওই ধরনের বীরকে বিয়ে করার ইচ্ছা সে বাবার কাছে প্রকাশ করল।

শুনে তার বাবা খুব খুশি হয়ে এককথায় রাজি হয়ে বলল, 'তোমার যদি কল্যাণবর্মাকে বিয়ে করার ইচ্ছা থাকে তাহলে সেই ইচ্ছা পূরণ করা যাবে।'

স্বর্ণকেশীর বাবা মেয়ের কথায় হঠাৎ রাজি হয়ে যাওয়ার পেছনে যে কারণ ছিল তা হল— রাজা ও রানি অনেকদিন আগে থেকেই কল্যাণবর্মার কথা শুনেছিল। রাজকুমার হিসেবে সে যেমন গুণী তেমনই দেখতেও সুন্দর ছিল। তবে এই বিষয়ে স্বর্ণকেশীর সঙ্গে ওদের কোনো কথা হয়নি। এখন স্বর্ণকেশী নিজেই যখন নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করল তখন এ ব্যাপারে রাজি না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। বরং রাজার মনে হল মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে তার যে দুশ্চিন্তা ছিল সেই দুশ্চিন্তা দূর হল।

তিনি বললেন, 'মালবরাজার সঙ্গে আমার শেষ যে সাক্ষাৎ হয়েছে সেই সময়েই আমি তার ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। এতদিনে আকস্মিক যোগাযোগ হয়ে গেল। আমি কল্যাণবর্মার ছবিও জোগাড় করেছি। এখন থেকে তুমি ছবিটা রাখতে পারো।' বলে সে কল্যাণবর্মার ছবি স্বর্ণকেশীকে দিল।

ছবি দেখে স্বর্ণকেশী অবাক হয়ে গেল। যে লোকটাকে সে অরণ্যে দেখেছে এই ছবি তো তার নয়। কোথায় যে গোলমাল স্বর্ণকেশী তা বুঝতে পারল না। সে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'আচ্ছা বাবা, মালবরাজার ক-টি ছেলে?'

'ক-টি নয়, একটিই ছেলে, নাম কল্যাণবর্মা। ওই ছেলেই যুবরাজ। কেন, কী হয়েছে?' রাজা জিজ্ঞেস করল।

'আর কিছু নয়, ছবির সঙ্গে রাজকুমারের ঠিক মিলছে না। ছবিটা একটু অন্যরকম লাগছে।' স্বর্ণকেশী বলল।

'ছবি কি অবিকল হয়? একটু উনিশ-বিশ হয়। ভাবছি একবার কল্যাণকে ডেকে পাঠাই। আমিও একটু দেখতে চাই।' রাজা বলল।

স্বর্ণকেশী ভাবল, 'কল্যাণবর্মা এলে ছবির সঙ্গে তা মুখের গরমিলের কারণ জানা যাবে।'

সেইদিনই উদয়পুরের রাজার কাছ থেকে কল্যাণবর্মা আমন্ত্রণ পেল। তৎক্ষণাৎ কল্যাণবর্মা বীরবর্মাকে ডেকে বলল, 'এখন তো তোমাকেই বেরোতে হবে। উদয়পুর থেকে আমন্ত্রণ এসেছে। একবার যখন কল্যাণবর্মা সেজেছ তখন আর একবারও সাজতে হবে। স্বর্ণকেশীর বাপের কাছে তুমি এমনভাবে অভিনয় করবে যাতে তোমাকে দেখে উনি বুঝতে না পারেন যে তুমি কল্যাণবর্মা নও। তবে স্বর্ণকেশীর কাছে সুযোগ বুঝে তুমি নিজের সঠিক পরিচয় দেবে। আমার নাম বলার আগে যেহেতু স্বর্ণকেশী তোমাকে ভালোবেসেছে সেইহেতু তুমি নিজের পরিচয় দিলেও স্বর্ণকেশী অবশ্যই তোমাকে ভালোবাসবে। বিয়ের পর্ব হয়ে গেলে আসল ঘটনা জানাজানি হলেও কিছু হবে না।'

রাজার সঙ্গে পরিচয়ের পর বীরবর্মা স্বর্ণকেশীর কাছে গেল। দু-জনের মধ্যে অনেকক্ষণ কথা হওয়ার পর স্বর্ণকেশী হঠাৎ উঠে কল্যাণবর্মার ছবি এনে তাকে বলল, 'দেখুন তো এই ছবি চিনতে পারেন কি না?'

ছবি দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে বীরবর্মা বলল, 'এই ছবি এখানে কী করে এল?'

'কোনো এক রাজকুমার আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করে বাবার কাছে পাঠিয়েছেন।' স্বর্ণকেশী বলল।

বীরবর্মা বলল, 'বিশ্বাসঘাতক?'

'বিশ্বাসঘাতকতা কল্যাণবর্মা করেননি। আপনি করেছেন। আসল ঘটনাটা আমার বাবার জেনে যাওয়ার আগে চলে যান।'

বীরাবর্মা ফিরে গেল। পরে কল্যাণবর্মার সঙ্গে স্বর্ণকেশীর বিয়ে হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, স্বর্ণকেশী বীরবর্মাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রথমে প্রকাশ করে, পরে কেন সরে গেল? সে রাজকুমার ছিল না— এটাই কি কারণ? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'কল্যাণবর্মার অনুমান অনুযায়ী স্বর্ণকেশী বীরবর্মাকে রাজকুমার হিসেবে ভালোবাসেনি। স্বর্ণকেশী কল্যাণবর্মার ছবি দেখেই বুঝেছিল কোথাও একটা মিথ্যা আশ্রয় পেয়েছে। বীরবর্মাকে নিজের ঘরে ডেকে স্বর্ণকেশী লক্ষ করল সে বিশ্বাসী বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতক বলছে। তারই ফলে পরিণতিতে স্বর্ণকেশী কল্যাণবর্মাকেই বিয়ে করল।'

বিক্রমাদিত্য মুখ খুলতেই বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%