ভাই ভাইকে মারল

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে এগোতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, জীবনের সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক খুব বেশি। প্রত্যেক মানুষ বিশেষ অবস্থায় স্বার্থের কারণে প্রভাবিত হয়। স্বার্থান্ধ হয়ে অনেক সময় অনেক পাপ করা হয়। চরম স্বার্থের মূলে থাকে, হয় দেশ অথবা রমণী। সিংহাসনে বসার আশায় অথবা রমণীকে পাওয়ার লোভে মানুষ চরম স্বার্থান্বেষী হয়ে ওঠে। এর নিদর্শনস্বরূপ আমি চন্দ্রসেনের বিষয়ে বলছি। এই কাহিনি শুনতে শুনতে পথ চললে পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—

অমরাবতীর রাজা ছিল অমরসেন। যুবক অবস্থাতেই সে রাজা হয়। কালিকোটা এবং অমরাবতীর মধ্যে বহুকাল থেকে শত্রুতা ছিল। অমরসেনের বাপের আমলে কালিকোটার রাজার চোখের বিষ ছিল অমরাবতী। সবসময় সে অমরাবতীর ওপর আক্রমণ চালানোর কথা ভাবত। অমরসেন যখন অল্প বয়সে সিংহাসনে বসল তখন কালিকোটার রাজা ভাবল, 'এই হল সুবর্ণ সুযোগ। অমরসেনের বয়স কম, অভিজ্ঞতা কম, এই সময় ওর দেশ যদি আক্রমণ করি তাহলে সহজেই অমরাবতী দখল করতে পারব।' রাজা যা ভাবল কার্যত তার বিপরীত ঘটনা ঘটল। অমরসেনের হাতে তাকে চরম পরাজয় বরণ করতে হল।

কিছুকাল পরে কালিকোটার রাজা তার মেয়ের বিয়ের জন্য স্বয়ম্বর সভা ডাকল। তার মেয়ের নাম মনিমালা। সে ছিল সুন্দরী। স্বয়ম্বর সভায় কালিকোটার রাজা সব দেশের রাজা এবং যুবরাজদের আহ্বান করল। খবর পাঠাল না শুধু অমরাবতীর অমরসেনের কাছে। এই ঘটনায় অমরসেন অত্যন্ত দুঃখ পেল এবং অত্যন্ত অপমান বোধ করল। কালিকোটা দেশের রাজা তাকে যেভাবে অপমান করেছে তার প্রতিশোধ কীভাবে নেওয়া যায় সে সম্বন্ধে মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করল।

মন্ত্রীর কথা অমরসেনের মনে ধরল না। স্বয়ম্বর সভায় যে সব রাজাদের ডাকা হয়েছিল, তারা যেভাবে নিজেদের ছবি পাঠিয়েছিল সেইভাবে অমরসেনও নিজের ছবি লোক মারফত পাঠাল।

কালিকোটার রাজা অমরসেনের ছবিটা ওই লোকের হাত থেকে নিয়ে, মেঝেতে ফেলে মাড়িয়ে ছবিটাকে ফেরত দিয়ে বলল, 'ওই ছবি তোমার রাজাকে ফেরত দাও।'

নিজের লোক মারফত অমরসেন জানতে পারল, কালিকোটার রাজা তার ছবি কীভাবে মাড়িয়েছে। শুনেই অমরসেনের মাথা গরম হয়ে গেল। সাপের লেজে পা পড়লে সাপ যেমন ফুঁসে ওঠে অমরসেনও তেমনি অপমানের জ্বালায় জ্বলে উঠল। তৎক্ষণাৎ কালিকোটার রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। তারপর যুদ্ধ ঘোষণা করল।

খবর শুনেই কালিকোটার রাজা ঘোষণা করল, 'অমরসেনের মুণ্ডু যে কেটে আনবে তার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব।'

মনিমালাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্য যেসব রাজা এবং রাজকুমার সমবেত হয়েছিল তারা অমরসেনের মুণ্ডু আনতে রওনা দিল।

সেই সময় অমরসেনের ছোটো ভাই চন্দ্রসেন গুরুর কাছে লেখাপড়া করছিল। বড়ো ভাইয়ের ওপর বিপদের আশঙ্কা আছে শুনে সে তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরে এল। এক এক রাজকুমার নিজের নিজের ছোটো ছোটো সেনাবাহিনীকে নিয়ে অমরাবতীর দিকে এগোচ্ছিল। রাজপ্রাসাদের ছাদ থেকে লক্ষ করা গেল, ছোটো ছোটো দলে চারদিক থেকে সেনাবাহিনী আসছে। ওই সেনাবাহিনী দেখে অমরসেন ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠল। ততক্ষণে সব রাজা ও রাজকুমার নিজের নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে গেছে।

চন্দ্রসেন দাদা অমরসেনের কাছে এসে নীচের ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ তরবারি বের করে দাদার মুণ্ডু কেটে নীচে ছুড়ে ফেলে দিল।

ওই মুণ্ডু দেখে যেসব রাজা ও রাজকুমার এসেছিল তারা ভাবল, 'অমরসেনের মুণ্ডু তো কাটা হয়ে গেছে। যে কেটেছে সে নিয়ে যাবে। আমাদের আর এখানে থেকে লাভ কী?' এই কথা ভেবে যে যার রাজ্যে ফিরে গেল।

তারপর চন্দ্রসেন দাদার কাটা মুণ্ডু কালিকোটার রাজার কাছে নিয়ে গিয়ে মনিমালাকে বিয়ে করে কালিকোটার রাজার সঙ্গে সম্পর্ক মধুর করে তুলল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'আচ্ছা রাজা, চন্দ্রসেন হঠাৎ অকারণে নিজের দাদার মুণ্ডু কেটে ফেলল কেন? মনিমালার মতো পরমাসুন্দরীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে, না কি সিংহাসনে বসার লোভে? চন্দ্রসেনের সঙ্গে কালিকোটার রাজা নিজের মেয়ের বিয়ে দিল কেন? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই কথার জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রাগের মাথায় রাজা অমরসেন কালিকোটার রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এই ঘোষণার ফলে তিনি যেচে নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছেন। মন্ত্রীর পরামর্শ শুনে তাঁর উচিত ছিল কিছু না করা। অমরসেনের ধারণা ছিল কালিকোটার রাজা দুর্বল। মনিমালাকে পাওয়ার আশায় বহু রাজা যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠবে সেই ধারণা অমরসেনের ছিল না। ফলে অমরসেনের মৃত্যু ঘনিয়ে এল। এই অবস্থায় চন্দ্রসেন ভাবল, দাদার মৃত্যু যখন অবধারিত তখন অন্য লোকে না-মেরে সেই যদি মারে তাহলে সে মনিমালাকে ঘরে আনতে পারবে। তার চেয়ে বড়ো কথা, শত্রুদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানো যাবে। মনিমালাকে যদি অন্য কোনো রাজা বিয়ে করত তাহলে অমরাবতীর বিরুদ্ধে কালিকোটার রাজা এবং জামাই দু-জনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোনো না কোনো সময়ে অমরাবতীর ওপর আক্রমণ চালাত। তাই কালিকোটার রাজা যা করেছিলেন তা ঠিক করেছিলেন।'

রাজা বিক্রমাদিত্যের মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%