ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যেভাবে খেটে যাচ্ছ তাতে মনে হচ্ছে তোমার বাস্তব জ্ঞানের অভাব আছে। যাদের জাগতিক জ্ঞান আছে, তারা অত্যন্ত সাধারণ অবস্থা থেকে অনেক উন্নতি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বরুণের কাহিনি আমি শোনাতে পারি। পথ চলতে চলতে যদি এই কাহিনি শোনো তাহলে তোমার পথচলার পরিশ্রম কমে যাবে। এবার বলি, শোনো।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—
ধর্মপুরী দেশের এক গ্রামে বরুণ নামে এক বৈশ্যকুমার ব্যাবসা করে জীবনযাপন করবে বলে ঠিক করেছিল। যেকোনো ব্যাবসা করতে হলে কিছু পুঁজি লাগে। তাই সে ওই গ্রামের যে লোকটা সুদে টাকা খাটাত তার কাছে টাকা ধার নিল। ধারের টাকায় ব্যাবসা শুরু হল। কিন্তু যত বেশি কেনাবেচা হবে ভেবেছিল তত বেশি না হওয়ায় ঠিকসময় সে টাকা শোধ করতে পারল না।
সুদের কারবারী টাকার জন্য তাকে তাগাদা দিতে লাগল। বরুণ তাকে বলল, 'সব টাকা আমি মিটিয়ে দেব। সেরেস্তা থেকে আমাদের বাসুদেব আসছে। তার আসার সঙ্গে সঙ্গে সব টাকা মিটিয়ে দেব।'
'বাসুদেবের সঙ্গে তোমার আলাপ আছে?' সুদের কারবারী তাকে প্রশ্ন করল।
'আলাপ থাকবে না কেন? ও তো আমাদের বন্ধুর মতো।' বরুণ বলল।
'তাহলে এতদিন আমাকে এই কথা জানালে না কেন? ঠিক আছে, তাহলে তো তোমার একটা ভালো উৎস আছে। যখন সময় হবে দিও। অত তাড়ার কিছু নেই।' বলে সুদের কারবারী তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে গেল।

বাসুদেবের নাম শুনে সুদের কারবারী যে ধরনের ব্যবহার করল তাতে বরুণ রীতিমতো বিস্মিত হল। কিন্তু পরের দিন সব কিছু তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
পরের দিন সুদের কারবারী একটা ছেলেকে সঙ্গে করে তার কাছে এসে বলল, 'এই দেখো বরুণ, এই ছেলেটা আমার শ্যালক। বাসুদেবকে বলে জমিদারের সেরেস্তায় একটা কাজ পাইয়ে দাও না। এর জন্য একটা চাকরি যদি পাইয়ে দাও তাহলে আমি তোমার কাছে যা পাব তা তোমায় শোধ করতে হবে না।'
সুদের কারবারী কী বুঝতে কী বুঝল কে জানে! বরুণের বন্ধু বাসুদেব জমিদারের সেরেস্তায় একটা সাধারণ চাকরি করত। তবে বাসুদেব নামে আর একজনও ওই সেরেস্তায় চাকরি করত উচ্চপদে। ওই উচ্চপদের চাকুরের কথা ভেবে সুদের কারবারী তার শ্যালককে নিয়ে এসেছিল।
বরুণ যে মুহূর্তে বুঝতে পারল, সুদের কারবারী ভুল বুঝেছে সেই মুহূর্তে তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। তক্ষুনি যদি ওর ভুল ভেঙে দেওয়া হয় তাহলে ধার শোধ করতে হবে। তাই সে ওই প্রসঙ্গ না তুলে বলল, 'আচ্ছা ঠিক আছে, চেষ্টা করব। আপনি কালকে একবার আসবেন।' বলে সুদের কারবারীকে বিদায় দিয়ে নিজে চলে গেল সেরেস্তায়। সেরেস্তায় যত লোক কাজ করে তাদের প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা, পদ ইত্যাদি লিখে নিল।
তারপর বরুণ যে দপ্তরে কাজ করে সেই দপ্তরে গিয়ে প্রহরীকে বলল, 'আমাকে মণ্ডলাধিকারী বীরবর্মা পাঠিয়েছেন, তাঁর কোনো এক আত্মীয়ের চাকরির ব্যাপারে। এক্ষুনি আমাকে বাসুদেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে।' প্রহরী বরুণের কথা শুনেই বাসুদেবের সঙ্গে দেখা করতে দিল। বীরবর্মার নাম শুনেই বাসুদেব বরুণকে বলল, 'ঠিক আছে, কালকে ওকে নিয়ে আসুন।'
সুদের কারবারী পরের দিন তার শ্যালককে নিয়ে জমিদারের সেরেস্তায় পৌঁছে গেল।
যথারীতি উচ্চ পদাধিকারী বাসুদেব ওই ছেলেটিকে চাকরিতে বহাল করে নিল।
এদিকে গ্রামে দু-একদিনের মধ্যে রটে গেল যে বরুণ জমিদারের সেরেস্তায় সুদের কারবারীর শ্যালককে একটা চাকরি পাইয়ে দিয়েছে। আরও রটে গেল যে সেরেস্তার বড়ো বড়ো পদে যারা আছে তাদের সঙ্গে বরুণের বেশ চেনাজানা আছে। এই রটনার ফলে, গ্রামের বহু লোক বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বরুণের কাছে আসতে লাগল। কেউ চায় চাকরি আবার কেউ চায় খাজনার হার কমাতে। যারা যে উদ্দেশ্যেই আসুক না কেন, কিছু-না-কিছু তাকে দিয়ে যেত। এইভাবে লোকের যাতায়াত বাড়তে বাড়তে এমন একটা সময় এল যখন মন্ত্রী ও সেনাপতির লোকও তার বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে দিল। এই সুযোগে বরুণও তাদের পরিবারে যাতায়াত করত। বড়ো বড়ো লোকের বাড়িতে যাতায়াতের ফলে বরুণের খ্যাতি এবং সম্মান বেড়ে গেল। দেশের ব্যাবসাদাররাও বরুণের বন্ধু হয়ে গেল। যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ার ফলে বরুণ সত্যিসত্যি একদিন চাকরি পাইয়ে দেবার মতো ক্ষমতাবান হয়ে উঠল। সেনাপতি এবং মন্ত্রীর বাড়িতে যেকোনো উৎসবে তাকে দেখা যেত। এমনকী বাড়ির কাজকর্মেও তার উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় হয়ে উঠল। এইসব উৎসবে অংশ গ্রহণ করে বরুণ সবিনয়ে তার উপহার দিতে দিতে বলত, 'অধীনের এই ক্ষুদ্র উপহার।' তারপর এমন একদিন এল যখন সে আর নিজে সেরেস্তায় না গিয়ে একটা চিরকুট পাঠিয়ে যেকোনো লোকের চাকরি পাইয়ে দিতে পারত। একবার রাজার জন্মদিন উপলক্ষ্যে বরুণ বিশেষ আমন্ত্রণ পেল। এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়েছিল দেশের গণ্যমান্য লোক। এই অনুষ্ঠানে গল্প করতে করতে বিভিন্ন লোক নিজেদের জীবনের গোড়ার কথা, কীভাবে উন্নতি করল তার কথা কিছু বাড়িয়ে-কমিয়ে বলল। বরুণ যা ঘটেছিল তাই বলল। তার কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
সকলের বলার পর রাজা বলল, 'আপনাদের সকলের চেয়ে বরুণ হল অত্যন্ত বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন লোক। বৈষয়িক বুদ্ধিও আপনাদের সকলের চেয়ে বরুণের বেশি আছে।' রাজা বরুণের প্রশংসা করল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা বৈষয়িক জ্ঞান বরুণের বেশি থাকতে পারে, কিন্তু সে যা করল সেটা তো ধোঁকাবাজি। এই ধোঁকাবাজির কাহিনি শুনে ওই অনুষ্ঠানে যারা ছিল তারা কোন আক্কেলে হেসে উঠেছিল? আর রাজাই বা এত বড়ো একটা ধোঁকাবাজির প্রশংসা করল কী করে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্ন শুনে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'সংসারে কেউ উন্নত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে আবার কেউ অনুন্নত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে উন্নতি করে। যারা অনুন্নত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং উন্নতি করে তাদের বৈষয়িক জ্ঞান রাখতেই হবে। মন্ত্রীর ছেলের উন্নতির জন্য বাস্তবজ্ঞানের প্রয়োজন ততটা নেই। একই যুক্তিতে বরুণের পরিবার যখন উন্নত হয়ে গেল তখন তারও আর প্রয়োজন নেই বৈষয়িক জ্ঞানের। একটা সাধারণ ব্যাবসা থেকে শুরু করে রাজধানীর গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে উন্নীত হওয়ার মূলে বরুণের বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় পাই।'
রাজা এই কথা বলতেই বেতাল ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন