ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে এগোতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি তোমার প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে যেও না। কেউ কেউ প্রতিজ্ঞার কথা মনে রেখে এগিয়ে যায়। কিন্তু ফল পেয়েও সেই ফল ত্যাগ করে। আমার কথার প্রমাণ স্বরূপ আমি তোমাকে বিশ্বনাথের কাহিনি শোনাচ্ছি।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
চিত্রকূটে বিশ্বনাথ নামে একজন কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিল। হয়তো পূর্বজন্মের সুকৃতির ফলে বাচ্চা বয়স থেকে তার মধ্যে সংগীতের প্রতি অনুরাগ জেগেছিল। গানের দিকে তার ঝোঁক দেখে তার বাবা গান শেখার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা দিল। বিভিন্ন পণ্ডিতের কাছে ঘুরে গান-বাজনা শিখে বিশ্বনাথ বাড়ি ফিরে এল।
বাড়ি ফিরে এসে চাষের কাজে বাপকে বিশ্বনাথ সাহায্য করতে লাগল। সারাদিন খেতখামারে কাজ করত। দিনের শেষে, সন্ধ্যার সময় সে বারান্দায় বসে বীণা বাজাত, গাইত।
যথাসময়ে বিশ্বনাথের বিয়ে হল। তার স্ত্রীর নাম মীনাক্ষী। মীনাক্ষীও গান-বাজনা ভালোবাসতো। তাই সন্ধ্যার সময় বিশ্বনাথ যখন বাজাত বা গাইত তখন সেও শুনত। ক্রমশ আরও অনেকে বিশ্বনাথের গান-বাজনা শোনার জন্য জড়ো হত। যারা গান-বাজনার ভালো বোদ্ধা তারাও বিশ্বনাথকে প্রশংসা করত।
একজন বলল, 'বিশ্বনাথ, তুমি গান-বাজনা এত ভালো জেনেও ঘরে বসে আছ কেন? তুমি যেকোনো রাজার কাছে গেলে তিনি তাঁর রাজসভায় তোমাকে সাদরে রেখে দেবেন। তুমি কেন এখানে খেতেখামারে সারাদিন পরিশ্রম করছ?'

মীনাক্ষীও মনে মনে এই কথাই পোষণ করত। কিন্তু বিশ্বনাথ কোনো রাজাকে খুশি করার জন্য গান শোনাতে রাজি ছিল না। স্বামীর এই মনোভাব মীনাক্ষী জানত। তাই সে তার স্বামীকে এই ধরনের কোনো অনুরোধ করেনি। সে মনে মনে কামনা করত একদিন যেন কেউ এসে তার স্বামীকে সাদরে রাজাকে গান শোনানোর জন্য নিয়ে যায়।
মীনাক্ষীর মনের বাসনা সত্যি সত্যি একদিন পূরণ হল। একদিন বারান্দায় বসে বিশ্বনাথ যথারীতি বীণা বাজাচ্ছিল, কোত্থেকে যেন দু-জন লোক এল। ওরা বসে সারাক্ষণ শুনল। পরে চলে গেল।
ওই দু-জন ছিল ছদ্মবেশে। তাই কেউ বুঝতে পারেনি যে ওরা সেই দেশের রাজা এবং মন্ত্রী ছিলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে রাজা বিশ্বনাথকে সাদরে ডেকে পাঠালেন। রাজা বিশ্বনাথকে তার রাজসভায় থাকতে বললেন। বিশ্বনাথ রইল সেখানে। প্রথম প্রথম ওই জায়গাটা তার কাছে কয়েদখানার মতো লাগল। তারপর নিত্যনতুন লোক বিশ্বনাথকে প্রশংসা করতে লাগল। নতুন পরিবেশে, নতুন নতুন মানুষের কাছে প্রশংসা পেয়ে ক্রমশ বিশ্বনাথের ভালো লাগছিল।
কিছুদিন পরে রত্নপুর থেকে চিত্রকূটে এক সংগীতের পণ্ডিত এল তার শিষ্যদের নিয়ে। তার অনুরোধ অনুসারে রাজা ওই পণ্ডিত ও বিশ্বনাথের গানের আসর বসাল। ওই পণ্ডিতের নাম কুঞ্জ। যেহেতু মাত্র দু-জনের আসর সেইহেতু সেটাকে একটা প্রতিযোগিতা হিসাবে সবাই নিয়েছিল।

সেই আসরে বীণা বাজিয়ে বিশ্বনাথ খুব একটা জমাতে পারল না। কুঞ্জ আসর মাত করে দিতে পেরেছিল।
তারপর থেকে বিশ্বনাথের মনে হল রাজা এবং রাজার আশেপাশে যারা থাকে তারা তাকে আগের মতো প্রশংসা করছে না।
'তোমার কী হয়েছে বল তো? প্রত্যেকের ভাগ্যে জয়-পরাজয় আছে।' মীনাক্ষী বলল।
'দেখ, আমি ব্যথা পাচ্ছি রাজার ব্যবহারে।' বিশ্বনাথ বলল।
তারপর বিশ্বনাথ মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে নিজের গানের চর্চা বাড়িয়ে দিল। ছ-মাস অত্যন্ত পরিশ্রম করে সে আরও উন্নতি করল।
ছ-মাস পরে বিশ্বনাথ রত্নপুরে গেল। কুঞ্জকে গানের আসরে আহ্বান করল। দর্শকরা এবারে আরও ভালো করে বুঝল যে এটা একটা তীব্র প্রতিযোগিতার আসর হবে। সেই আসরে কুঞ্জ শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হল।
কুঞ্জকে পরাজিত করে ফিরে আসার পর স্বয়ং রাজা গেলেন বিশ্বনাথের কাছে অভিনন্দন জানাতে। গত ছ-মাস বিশ্বনাথের প্রতি যে অবহেলা দেখানো হয়েছে তারজন্য রাজা ক্ষমা চাইলেন।
'মহারাজ, আমার ইচ্ছে করছে গ্রামে ফিরে যেতে। আমাকে অনুগ্রহ করে বিদায় দিন।' বিশ্বনাথ বলল।
গ্রামে ফিরে এসে বিশ্বনাথ আগের মতো চাষ-আবাদের কাজ করে, দিনের শেষে গান-বাজনা করত। গ্রামের লোক তাকে ঘিরে বসে গান শুনত। এইভাবে বিশ্বনাথ তার বাকি জীবন কাটিয়ে দিল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, বিশ্বনাথকে তাহলে কী ধরনের লোক বলা যায়? প্রথম আসরের পরে যে বিশ্বনাথ মনমরা হয়ে গেল, ছ-মাস ধরে গানের চর্চা বাড়িয়ে দিল, সেই বিশ্বনাথ দ্বিতীয় আসরে কুঞ্জকে পরাজিত করে রাজসভা ছেড়ে দিল কেন? কত সুখে ছিল সে! সেই সুখ ছেড়ে, অত ভালো পরিবেশ ছেড়ে সে ফিরে এল কেন চাষের কাজে? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
বেতালের প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'বিশ্বনাথ গান-বাজনায় যেমন পণ্ডিত ছিল তেমনি সে তার প্রেমিক ছিল। সে আনন্দ পাওয়া এবং দেওয়ার জন্যে গান গাইত বা বীণা বাজাত। পেট ভরানোর জন্য সে চাষের কাজ করত। পণ্ডিত কুঞ্জের কাছে পরাজিত হয়ে সে অপমানবোধ করেনি। অপরপক্ষে রাজা খুব অপমানবোধ করেছিলেন। তাই তিনি বিশ্বনাথের প্রতি ব্যবহার আগের মতো করেননি। বিশ্বনাথ চর্চা বাড়িয়ে প্রমাণ করে দিল যে জয়-পরাজয় চর্চার উপর নির্ভর করে। গান-বাজনাকে জীবিকা হিসাবে নেওয়া ঠিক নয় ভেবে বিশ্বনাথ ফিরে গেল চাষের কাজে।'
এইভাবে রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন