ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, জানি না, জীবনের উপর বিরক্তি জাগার ফলে হয়তো তুমি এভাবে এতটা পরিশ্রম করছ। তবু আমি যতটা জানি বিরক্ত হয়ে অনেক সময় মরতে চাইলেও মৃত্যু আসে না। আমার কাহিনির প্রমাণ স্বরূপ আমি তোমাকে গোপালের কাহিনি শোনাব। আমার এই কাহিনি শুনলে পথ চলার পরিশ্রম কমবে।' এই কথা বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
মহান্তিপুরে গোপাল পামে এক গরিব লোক নিরুপায় হয়ে ভিক্ষে করে দিন কাটাত। লোকটা এমন হতভাগা যে এক বেলা খেতে পেলে তিন বেলা উপোস করতে বাধ্য হত।
একদিন রামানন্দ নামে এক দৈবজ্ঞ পণ্ডিত শিষ্যদের নিয়ে কাশী যাওয়ার পথে মহান্তিপুরে পৌঁছাল। অত বড়ো পণ্ডিতকে নিজেদের গাঁয়ে পেয়ে প্রত্যেকে তাকে সুখ-দুঃখের কথা বলল এবং কীভাবে যে তারা নিজেদের সীমাহীন দুঃখ দূর করবে তা জানতে চাইল।
পাড়ার সবাই যখন ওই পণ্ডিতের কাছে তখন গোপাল আর স্থির থাকতে পারল না। সেও গিয়ে নিজের খেতে না পাওয়ার, দুঃখের দিনগুলোর কথা সবিস্তারে পণ্ডিতকে জানাল। সব কথা জানানোর পরে এর প্রতিকার কীভাবে হবে তাও গোপাল জানতে চাইল।
'জীবনে তোমার দুঃখ-দারিদ্র্য দূর হবে না।' রামানন্দ পণ্ডিত বলল।
'প্রভু, তাহলে আমাকে বলে দিন কীভাবে আমি মুক্তি পেতে পারি।'
পাশের শহরে রামসাহা, ভীমসাহা ও সোমনাথ সাহা নামে তিন জন ব্যবসায়ী আছে। এই তিন জন তোমার কাছে ঋণী। প্রত্যেকের কাছ থেকে তুমি একটি করে স্বর্ণমুদ্রা পাবে। এই ঋণ ওরা শোধ করার পরে তোমার মৃত্যু হতে পারে।' রামানন্দ পণ্ডিত বলল।

গোপাল রামানন্দ পণ্ডিতের কথা শুনে তাকে প্রণাম করে চলে গেল পাশের শহরে। গিয়ে ওই তিন জনের সঙ্গে দেখা করল। গোপাল প্রত্যেককে একটা করে সোনার মুদ্রা দিতে বলল। ওরা আর কথা না বাড়িয়ে প্রত্যেকে গোপালকে একটি করে সোনার মুদ্রা দিয়ে দিল।
গোপাল ওই তিনটি সোনার মুদ্রা খরচ করে গরিবদের খাইয়ে দিয়ে ভাবল, 'সত্যি আজ আমি মুক্তি পাব। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে সে কী বলব! যেকোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হতে পারে। বনে গিয়ে মরাই ভালো। কারণ বনে মরে গেলে যেকোনো জন্তুজানোয়ার মহানন্দে পেটপুরে আমাকে খাবে।
সে গভীর বনে গেল। দু-দিন ধরে সেখানে পড়ে রইল। দু-দিনেও তার মৃত্যু না হওয়ায় সে অবাক হল। বনের বাঘ বা সিংহ এসে তাকে খেল না। অত বড়ো পণ্ডিতের কথা কেন যে ফলছে না তা সে ভেবে পেল না। সে টলতে টলতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে একটি গর্তে পড়ে গেল।
'যাক, স্বয়ং ভগবান তাহলে আমার জন্য একটা গর্ত খুঁড়ে রেখেছেন। আর দেরি নেই, এই গর্তেই আমার মৃত্যু হবে।' ভাবতে ভাবতে গোপাল এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। তার চোখে পড়ল চকচকে একটি জিনিস। হাতে তুলে নিয়েই গোপাল বুঝতে পারল ওটা সোনা। তারপর সে যত তুলল তত সোনা পেল। যত সোনা পারল তুলে গোপাল বাড়ি ফিরল। সেই সোনা দিয়ে চাল, ডাল, নুন, তেল কিনে সে গরিবদের খাওয়াতে লাগল। গোপাল কোত্থেকে যে অত সোনা পেল তা সে কাউকে জানাল না, কেউ তাকে সে প্রশ্নও করল না।

মোটকথা পণ্ডিতের কথা ফলেনি। অত সোনা পেয়েও সে অহংকারী হয়নি, সে গরিবদের সঙ্গে ছিল, তাদেরই জন্য সে সোনা খরচ করতে লাগল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, গোপাল মরল না কেন? অত বড়ো পণ্ডিতের কথার কি দাম নেই? একেবারে মিথ্যে হয়ে গেল অত বড়ো পণ্ডিতের কথা? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে একেবারে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রামানন্দ পণ্ডিতের কথা মিথ্যা হয়নি। কারণ গোপাল ওই তিন জন ব্যবসায়ীর কাছে যা পেয়েছিল তার অনেকগুলো গরিবদের দিয়ে ওদের ঋণী করে রাখল। যে তিনটি সোনার মুদ্রা পেয়েছিল সেগুলো খরচ করে সে যদি নিজের পেট পূরণ করত তাহলে হয়তো তার মৃত্যু হত। কিন্তু সে দান করত বলেই যেভাবে যা ঘটার ছিল তা ঘটেনি। মৃত্যুর পরে ওর দেহ যাতে জন্তুরা খায় তারজন্য সে বনে গেল। নিজেকে নিঃশেষে অন্যের স্বার্থে লাগানোর এই ইচ্ছার জন্যই সে গর্তে পেল অত সোনা। ফলে তার ঋণীদের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল।'
রাজার এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শবসহ আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন