ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, কিছু লোক নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপমানিত হয়। পতনের পরেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তি বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ আমি যমদগ্নি নামে এক দার্শনিকের কাহিনি বলছি। এই কাহিনি শুনলে পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।'
বেতাল তার কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে লক্ষ্মীপুরে যমদিগ্ন নামে একজন লোক ছিল। সে ছিল খুব গরিব ঘরের ছেলে। অভাবের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে, জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়ে, সাধু হয়ে দেশে দেশে ঘুরে অনেক জ্ঞান অর্জন করে। যমদগ্নির ধারণা হল জীবনে আনন্দ পেতে হলে দার্শনিক হতে হবে। তার এই ধারণা প্রচার করার জন্য সে ফিরে গেল নিজের গ্রামে, লক্ষ্মীপুরে।
যমদগ্নিকে সাধুবেশে ফিরে আসতে দেখে লক্ষ্মীপুরের গ্রামবাসীরা প্রথমে অবাক হল। পরে সাদরে তাকে গ্রহণ করল। সাধু হওয়ার পর যমদগ্নি নিজের নাম রেখেছিল দয়ানন্দ স্বামী। তার জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে গ্রামবাসীরা মুগ্ধ হল। তার উপদেশ শোনার জন্য দিনে দিনে অন্যান্য গ্রামের লোকও দলে দলে আসতে লাগল লক্ষ্মীপুরে।
মানুষের শেষ লক্ষ্য পরমাত্মায় লীন হওয়া। মানুষ হিসেবে যে উত্তম তারই মধ্যে এই উপলব্ধি আসতে পারে। এই বোধ যাতে মনের মধ্যে জাগে তারজন্য মানুষের উচিত বেশিরভাগ সময়ে ভগবানের চিন্তায় সময় কাটানো। যেটুকু পরিশ্রম না করলে সাংসারিক কাজ অচল হয়ে পড়ে সেটুকুই করা উচিত। তার বেশি সময় সাংসারিক কাজে ব্যয় করা উচিত নয়। এ ধরনের নানারকম উপদেশের সঙ্গে অসংখ্য নীতিধর্মের কাহিনি দয়ানন্দ স্বামী বলে যেত।
এই ধরনের উপদেশ দিনের পর দিন শুনতে শুনতে লক্ষ্মীপুরের মানুষের ইচ্ছে করল ঘণ্টার পর ঘণ্টা উপদেশ ও কাহিনি শোনার। কার্যত তারা তাই করত। ওদের মধ্যে একজন ছিল ব্যতিক্রম, নাম রামনাথ। সে লেখাপড়া শিখেছিল। এভাবে সময় কাটানো তার পছন্দ হত না। সে দয়ানন্দ স্বামীকে বলল, 'ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ভালো কিন্তু ঈশ্বরের নামে অলসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া ভালো নয়।' দয়ানন্দ স্বামী রামনাথের সঙ্গে একমত হতে পারল না। তার মতে, 'ঈশ্বরের আরাধনাই মানুষের শ্রেষ্ঠ কাজ। একে অলসতা বলা মোটেই উচিত নয়।'
রামনাথও নিজের মতে অটল। সে ঠিক করল, গ্রামবাসীদের মন বদলাতে হবে। কিন্তু সে বুঝতে পারল, যতদিন দয়ানন্দ ওই গ্রামে আছে, গ্রামবাসীরা তার কথায় গুরুত্ব দেবে না। তাই সে পরিকল্পনা করে চেষ্টা করল যাতে দয়ানন্দ অন্য গ্রামে যায়। রামনাথের বন্ধু অন্য গ্রামে ছিল। সেই বন্ধু দয়ানন্দকে অনুরোধ উপরোধ করে, রামনাথের পরিকল্পনা অনুসারে, তার গ্রামে নিয়ে গেল।
তার চলে যাওয়ার পর রামনাথের পরিকল্পনা অনুসারে গাঁয়ের একজনের মাথায় ভগবান ভর করল। সেই লোকটা গাঁয়ের লোকের সামনে বলল, 'এবছর লক্ষ্মীপুরের যে লোক বেশি উৎপাদন করবে সে-ই আমার দর্শন লাভ করবে।'
তারপর থেকে গ্রামবাসীরা চাষ-আবাদের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রত্যেক গ্রামবাসীরা দিনরাত পরিশ্রম করে ফসল বাড়াল। সে বছর সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপাদন করল শম্ভু দাস।

সবচেয়ে বেশি ফসল উৎপাদনকারী হিসেবে শম্ভু দাসের নাম ঘোষিত হল। তার পরের দিন পাশের গ্রামের এক ব্রাহ্মণ শম্ভু দাসের বাড়িতে এসে ভিক্ষে চাইল। শম্ভু দাস মহানন্দে ব্রাহ্মণকে ভিক্ষা দিল। ব্রাহ্মণ শম্ভু দাসকে আশীর্বাদ করে বলল, 'তোমার ধনসম্পত্তি বৃদ্ধি হোক, তুমি সুখে থাক।'
ওই ব্রাহ্মণ গ্রামের সীমা পেরিয়ে গেলে রামনাথ তার সঙ্গে দেখা করল। রামনাথের কথা অনুসারে সে কাজ করায় তার হাতে কিছু অর্থ দিল। সেখান থেকে ফিরে এসে রামনাথ সোজা শম্ভু দাসের বাড়িতে গেল। তাকে রামনাথ বলল, 'আজকে আমি এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছি।'
শম্ভু দাস সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল, 'কী দৃশ্য দেখেছ ভাই রামনাথ, বল না?'
'কিছুক্ষণ আগে গ্রামের সীমানায় এক তেজি ব্রাহ্মণকে দেখেছি। তাকে দেখেই শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে গেল। ঝট করে তাকে প্রণাম করে ফেললাম। আমার প্রণাম গ্রহণ করে তিনি বললেন, 'তোমাদের গ্রাম আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এই গ্রামে খুব পরিশ্রমী ভক্ত আছে।' তাঁর এই কথা শুনে আমি, আমরা কীভাবে কাজ করি, এবছর সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কে করেছে, কেন করেছে ইত্যাদি বললাম। হ্যাঁ, ভালো কথা, তুমি যে ভগবানের দর্শন লাভের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছ তাও জানিয়েছি। আমার কথা শুনে ওই তেজি ব্রাহ্মণ একগাল হেসে বললেন, 'পরিশ্রমের অন্য নাম পূজা। অধিক পরিশ্রম করেছে বলেই শম্ভু দাস অধিক ফসল পেয়েছে। আমি জানি, আজকেই শম্ভু দাস ভগবানেরও দর্শন পেয়ে গেছে।' তারপর জানো, আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেক প্রশ্ন তাঁকে করার ইচ্ছা হতেই তিনি চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ আমি সেখান থেকে নড়তে পারিনি। এখন আমি সেখান থেকেই ছুটে এলাম। কী ব্যাপার বল তো শম্ভু? তুমি কি সত্যই ভগবানের দর্শন পেয়েছ?
রামনাথের কথা শুনে শম্ভু দাসের মনে হল, ভিক্ষে করতে যে ব্রাহ্মণ এসেছিল সে-ই ছিল স্বয়ং ভগবান। তারপর, কিছুক্ষণের মধ্যেই এই খবর সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামবাসীরা মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করতে লাগল, 'পরিশ্রমের অন্য নাম পূজা।' গ্রামবাসীদের মধ্যে সে কী উন্মাদনা! প্রত্যেকেই পরিশ্রম করতে লাগল, ফলে ফসল বেশি হল।
কয়েক বছর পরে দয়ানন্দ স্বামী গ্রামে ফিরে এল। গ্রামে ঢুকে সকলের অবস্থা এবং পুজোপাট হচ্ছে না দেখে বড়ো দুঃখ পেল। কেউ তার উপদেশ শোনার জন্য ছুটে আসছে না। প্রত্যেকেই যে-যার কাজে মগ্ন। দয়ানন্দ মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে নতুন উদ্যোগে গ্রামবাসীদের মধ্যে উপদেশ বিতরণ করতে লাগল। একদিন হঠাৎ রামনাথ তার সামনে হাজির হয়ে তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করে তাকে ঘাবড়ে দিল। রামনাথের প্রশ্ন ছিল, 'হে মহাপুরুষ, বিশাল এই বিশ্বে এত জায়গা থাকতে আপনি শুধু এই গ্রামেই পড়ে থাকতে চান কেন?'

'এটাই যে আমার জন্মস্থান!'
'তাহলে এই গ্রামের প্রতি আপনার মোহ আছে। আপনারই যখন মোহ আছে, সাধারণ মানুষের মোহ থাকবে না কেন?' রামনাথ বলল।
'আমার মোহ নেই। মানুষ যদি কামনা বাসনা মেটাতেই সারাজীবন কাটায় তাহলে ভগবানের চিন্তা করবে কখন? সাধারণ মানুষকে মোহমুক্ত করা আমার কর্তব্য।' দয়ানন্দ বলল।
'আপনিও কোনো-না-কোনো মোহের বশেই এসব করছেন। নিশ্চয় আপনার কোনো স্বার্থ আছে।' রামনাথ বলল।
জবাবে দয়ানন্দ রেগে গিয়ে বলল, 'না, কোনো মোহ নেই, কোনো স্বার্থ নেই।'
'গাঁয়ের মানুষ এত যে পরিশ্রম করছে এতে ওদেরও কোনো স্বার্থ নেই। স্ত্রী, পুত্র, পরিবারের জন্য ওরা পরিশ্রম করছে। নরের মধ্যেই তো নারায়ণ আছে। ঋষিরা বলেন, মানব সেবাই শ্রেষ্ঠ সেবা। তাই একজন মানুষ আর একজন মানুষের জন্য যদি পরিশ্রম করে তবে দোষের কি আছে? সেটা কি ভগবানের পূজা নয়?' রামনাথ দয়ানন্দকে মোক্ষমভাবে ধরল।
দয়ানন্দ বিরক্ত হয়ে বলল, 'দেখ ভাই, মানব সেবার নামে তুমি ভগবানের নিন্দা করছ। ওসব হল উপলব্ধির ব্যাপার। তোমার মতো মূর্খরাই মানুষকে খারাপ করে দেয়।'
'এই দেখুন, আপনি সমস্ত রিপু জয় করেছেন বলেছিলেন। অথচ এখন রেগে যাচ্ছেন। রাগও তো রিপু।' রামনাথ কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বলল।
দয়ানন্দ তার প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে হাত জোড় করে রামনাথকে নমস্কার করে বলল, 'আমার ধারণা ছিল, দর্শনের সারকথা আমি বুঝে ফেলেছি, যা বুঝেছি, অন্যদের তা বোঝাতে পারি। কিন্তু আজ বুঝলাম, যে আমি কিছুই জানি না দর্শন সম্পর্কে। আমার আচরণের জন্য আমি দুঃখিত। ভাই রামনাথ— আমায় ক্ষমা কর।'
তারপর সে বাকি জীবনটা সাধারণ মানুষের মতো চাষ-আবাদের কাজ করে কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু রামনাথ তাকে অনুরোধ করল, 'আপনি এবার থেকে গাঁয়ের ছেলে-মেয়েদের একটি ঘরে বসিয়ে লেখাপড়া শেখান। গাঁয়ের মানুষের অক্ষরজ্ঞান অন্তত হোক।'
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, রামনাথ তো দয়ানন্দকে পছন্দ করত না, তবু তাকে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাতে বলল কেন? কোন উদ্দেশ্যে তাকে তর্কে পরাজিত করল? আমার এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তালে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
এই প্রশ্নের জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'রামনাথ দয়ানন্দ নামধারী যমদগ্নিকে কোনোদিন গ্রামছাড়া করতে চায়নি। যমদগ্নির প্রতি রামনাথের ভালোবাসা ছিল। কারণ গ্রামের প্রতি টান ছিল। যে মুহূর্তে দয়ানন্দ নিজের ভুল বুঝতে পারল সেই মুহূর্তে রামনাথের মন তার প্রতি দরদি হয়ে উঠল। তাই তাকে সে অন্য গ্রামে যেতে দিল না, চাষ-আবাদের কাজও করতে দিল না। উপযুক্ত কাজ করাল। যমদগ্নি খেতে না পেয়ে ভবঘুরের জীবনযাপন করতে করতে দয়ানন্দ হয়েছিল। তার ওই জীবনের মূলে ছিল দারিদ্র্য। আবার যাতে যমদগ্নি খেতে না পেয়ে ভবঘুরের জীবন না নেয় তারজন্যই গ্রামের ছেলে-মেয়েদের রামনাথ লেখাপড়া শেখাতে বলল। মানুষকে শ্রমবিমুখ না করে শ্রমমুখীন করার উদ্দেশ্যে রামনাথ দয়ানন্দকে তর্কে পরাজিত করেছিল।'
রাজা এইভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে আবার ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন