ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে হাঁটতে লাগলেন শ্মশানের দিকে। তখন শবে স্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, দোষ করলেই যে শাস্তি পেতে হয় এটা কিন্তু ভুল ধারণা। আমি এমন একজন অপরাধীর কাহিনি বলব, যে দিনেদুপুরে চুরি করেও শাস্তি পায়নি। আমার এ কাহিনি শুনলে পথ চলার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—
কোনো এককালে গঙ্গাপ্রসাদ নামে এক ঠগ দিনেদুপুরে ঠকিয়ে চলে যেত। কেউ তাকে ধরতে পারত না। তার চেহারা এবং পোশাক দেখে কেউ বুঝতেই পারত না যে সে একজন ঠগ। ফলে কেউ তাকে চিনতেও পারেনি। এই অচেনা ঠগকে ধরার জন্য অনেক চেষ্টা করেও নগরপাল ব্যর্থ হল।
সোজা পথে ঠগ ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে নগরপাল গুপ্তচরদের মাধ্যমে তাকে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হল না। শেষে নগরপাল নিজে ছদ্মবেশে গঙ্গাপ্রসাদকে ধরার ফাঁদ পাতল।
একদিন গঙ্গাপ্রসাদ একজনের টাকার থলি কৌশলে চুরি করে নিল। পরে দেখা গেল ওই টাকার থলির ভেতর একটা চিঠি আছে। সেই চিঠি লিখেছিল এক মহিলা তার দাদাকে। চিঠির বয়ান: দাদা, আজ কয়েক মাস হল উনি মৃত্যুশয্যায়। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। পত্রপাঠ টাকা পাঠিয়ে আমার সিঁথির সিঁদুর যাতে থাকে তার চেষ্টা করো।

তারপর গঙ্গাপ্রসাদের বিচার হল। এই ভদ্ররূপী ঠগকে দেখার জন্য বিচারালয়ে বহু লোকের ভিড় হয়েছিল। বিচারের শেষে নগরপাল কোনোরকম শাস্তি না-দিয়ে গঙ্গাপ্রসাদকে মুক্তি দিল। মুক্তির আগে শুধু তাকে দিয়ে নগরপাল শপথ করিয়ে নিল ভবিষ্যতে আর সে চুরি করবে না বা ঠকাবে না।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, যে নগরপাল গুপ্তচরের মাধ্যমে ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে নিজেই ছদ্মবেশে গঙ্গাপ্রসাদকে ধরল সেই আবার কোনোরকম শাস্তি না-দিয়ে তাকে ছেড়ে দিল কেন? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না-দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'নগরপাল অনেক চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু তার তেমন কৃতিত্ব নেই। মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর, বড়ো হতে হতে, জ্ঞান অর্জন করে। তার জ্ঞানের উৎস সে যে অঞ্চলে থাকে সেই অঞ্চলের প্রকৃতি এবং মানুষ। প্রকৃতি সুন্দর হলে, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বড়ো হওয়ার ফলে মানুষের মনও সুন্দর হয়ে ওঠে। প্রকৃতি যদি রুক্ষ হয়, যদি মরুভূমিতে পূর্ণ হয় সেই অঞ্চল, তাহলে সেখানকার মানুষের মনও কিছুটা রুক্ষ না-হয়ে পারে না। অভাবের মধ্য দিয়ে যাকে বড়ো হতে হয় সে দেখে অভাবের নগ্ন রূপ। আর এই অভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপায় খোঁজে। এই ধরনের একটি উপায় গঙ্গাপ্রসাদ পেয়েছিল। সে লোক ঠকিয়ে রোজগার করে জীবনযাপন করছিল। মানুষের মনের গভীরের মণিকোঠায় থাকে মানবতা। এই মানবতা আছে বলেই মানুষ, মানুষ নামে পরিচিত। সঠিকভাবে যদি এই মানবতাকে জাগ্রত করা যায় তাহলে বহু সমস্যার সমাধান হয়।

আসলে গঙ্গাপ্রসাদের মধ্যে যে মানবতা ছিল সেই মানবতার জন্যই সে ধরা পড়েছিল। গঙ্গাপ্রসাদকে কেউ চিনত না। তাকে বিচারালয়ে সবাই চিনে ফেলল। এরপর আর সে আগের মতো ঠকাতে পারবে না। গঙ্গাপ্রসাদ দিনেদুপুরে লোক ঠকিয়ে টাকা জোগাড় করত। বিভিন্ন গ্রামের বহুলোকের সামনে তাকে ঘোষণা করে হাজির করানোর ফলে সকলের কাছে সে পরিচিত হয়ে গেল। গঙ্গাপ্রসাদের মানবতার কথা ভেবে এবং তাকে চিহ্নিত করার কাজ হয়ে যাওয়ায় নগরপাল এই অবস্থায় তাকে আর শাস্তি দেওয়া নিষ্প্রয়োজন মনে করল।'
রাজা বিক্রমাদিত্য এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গেসঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন