ধর্মের পথ

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে, কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কেন, কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এত পরিশ্রম করছ আমি তা জানি না। তবে একটা কথা মনে রেখো, শ্রেষ্ঠ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শ্রেষ্ঠ পন্থাই গ্রহণ করতে হয়। তা যদি না-হয়, আঁকাবাঁকা পথে মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করা যাবে না। সেটা ধর্মবিরুদ্ধ। আমার কথা যে সত্য তা প্রমাণ করার জন্য উদাহরণ হিসেবে আমি ধর্মনন্দন যোগীর কাহিনি বলছি। শুনলে তোমার পথচলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল—

প্রাচীন কালে শিলাময় গ্রামে ধর্মনন্দন নামে এক নামকরা যোগী ছিল। সে বহু স্থান ঘুরে দেশবাসীর কাছ থেকে অনেক অর্থ সংগ্রহ করে একটি বিদ্যায়তন স্থাপন করল। সেই বিদ্যায়তনে বেদ এবং শাস্ত্র পড়ানো হত। সঙ্গে সঙ্গে কার্যকরী শিক্ষাও শেখানোর ব্যবস্থা ছিল। এই দুই ধরনের শিক্ষার সুযোগ থাকায় বহু ছাত্র সেই বিদ্যায়তনে ভরতি হল।

কিছুকালের মধ্যেই ওই বিদ্যায়তনের নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। সারা দেশ থেকে আরও বেশি করে চাঁদা সংগৃহীত হল। লোকে নিজে থেকে এগিয়ে এসে সাগ্রহে চাঁদা দিত। এমনকী রাজার কাছ থেকেও ওই বিদ্যায়তনের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করতে ধর্মনন্দন রাজার কাছে গেল।

রাজা ধর্মনন্দনের মুখে ওই বিদ্যালয় সম্পর্কে সমস্ত শুনে বলল, 'এতকাল আমার সাহায্য ছাড়াই ওই বিদ্যায়তন চলেছে। এখন এমন কোন ঘটনা ঘটে গেল যার জন্য আমার সাহায্যের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে? সত্যি সত্যি যদি শিক্ষার প্রসার ওই বিদ্যালয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে তাহলে অর্থের টান পড়ল কেন? এসব বিষয় আমাকে ভাবতে হবে।'

আসলে বিদ্যায়তনের জন্য প্রথম প্রথম অনেক টাকা সংগ্রহ করতে পারলেও শেষের দিকে তার পক্ষে আর অত টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অথচ ধর্মনন্দনের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যায়তনকে আরও উন্নত করা।

এই অবস্থায় ভীম নামে একজন এসে ধর্মনন্দনকে বলল, 'শুনলাম আপনি বিদ্যায়তন চালাতে না-পেরে বন্ধ করে দেওয়ায় কথা ভাবছেন। আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি, এই বিদ্যায়তনের খরচ এবার থেকে আমি দেব।'

ভীমের কথা শুনে ধর্মনন্দন খুব খুশি হয়ে সকৃতজ্ঞ চিত্তে বলল, 'আপনার দান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আমরা গ্রহণ করব। আপনি যে কী করেন, তা যদি একটু জানান, তাহলে আমার ভালো লাগত।'

'দেখুন ধর্মনন্দন যোগীমহাশয়, আমি যে কী করি তা আপনাকে বলে কী লাভ? আমি আপনার কাজে খুশি হয়ে সাহায্য করে যাব মাসে মাসে।' ভীম বলল।

তারপর থেকে প্রত্যেক মাসে ভীমের কাছ থেকে ধর্মনন্দন সাহায্য পেত। খোঁজখবর নিয়ে ধর্মনন্দন জানতে পারল ভীম ওই অঞ্চলে একজন নামকরা দাতা।

এইভাবে কিছুকাল অতিবাহিত হল। হঠাৎ একদিন ভীম সম্পর্কে অদ্ভুত একটা কথা শুনতে পেল। ভীম শিক্ষা প্রসারের জন্য প্রতিমাসে তাকে টাকা দেয়, সে নাকি ডাকাতদলের নামকরা সর্দার। বাইরের সবাই তাকে জানে মস্তবড়ো দাতা হিসেবে। কিন্তু সে যে লুণ্ঠন এবং ডাকাতি করে অর্থ সংগ্রহ করে সেই বিষয়ে আস্তে আস্তে জানা গেল। তার নামে রাজা ঘোষণা করেছিল ভীমকে ধরে দিলে পুরস্কার দেওয়া হবে।

এই ঘোষণার পর এক হপ্তার মধ্যে ধর্মনন্দন গোপনে রাজার সঙ্গে দেখা করে ভীমকে ধরিয়ে দিল। ধর্মনন্দন ভীমের মতো অত বড়ো ডাকাতসর্দারকে ধরিয়ে দেওয়ায় রাজা খুব খুশি হয়ে ধর্মনন্দনের বিদ্যায়তনের বিষয়ে নতুন করে ভাবল। কিছুদিনের মধ্যে ওই বিদ্যায়তনের সমস্ত খরচ বহন করার দায়িত্ব রাজা নিল। ফলে কিছুকালের মধ্যেই বিদ্যায়তনটি অনেক বড়ো হয়ে গেল। ধর্মনন্দনের আজীবনের স্বপ্ন সফল হল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, ধর্মনন্দনের কাজ সমর্থন করা যায়? তার আজীবনের স্বপ্ন ছিল একটি মস্তবড়ো বিদ্যায়তন গড়া। কিন্তু মাঝপথে সে যখন অভাবে পড়ল, তার বিদ্যায়তন উঠে যাওয়ার উপক্রম হল তখন রাজা এগিয়ে আসেনি, এগিয়ে এসেছিল ভীম। তার দেওয়া টাকায় ধর্মনন্দনের বিদ্যায়তন চলত। এহেন ভীমকে ধর্মনন্দন রাজার কাছে ধরিয়ে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকের মতো কাজ কি করেনি? যে ভীম ভালো কাজে আর্থিক সাহায্য দিয়ে যাচ্ছিল তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে সাহায্য করল ধর্মনন্দন! এই প্রশ্নগুলোর জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'ধর্মনন্দনের বিদ্যায়তনে শুধু যে বেদ পুরাণ পড়ানো হত তাই নয়, হাতেকলমেও শিক্ষা দেওয়া হত। আদর্শের পথে চলার জন্যই ধর্মনন্দন ডাকাতদলের সর্দারকে রাজার হাতে ধরিয়ে দিল। ভীমকে ধরিয়ে দেওয়া তার কাছে একটি পবিত্র কাজ মনে হয়েছিল। এই কাজকে সে ধর্মবিরোধী মনে করেনি।'

রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%