ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য সেই গাছের কাছ গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি যে কোন মহান আদর্শের জন্য এত পরিশ্রম করছ জানি না। তবে অনেক সময় বড়ো বড়ো আদর্শও ব্যর্থ হয়। আমার কথা আরও পরিষ্কার বুঝতে পারবে একটি কাহিনি শুনলে। এ হল সুশর্মা নামে এক যুবকের কাহিনি। শুনতে শুনতে হাঁটলে হাঁটার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:
প্রাচীন কালে জলন্ধর দেশে সুশর্মা নামে এক যুবক ছিল। জীবনে তার একটিমাত্র বিষয়ে ঝোঁক ছিল। তা হল মূর্তি দেখা এবং মূর্তি গড়া। প্রত্যেক দিন সে যারা মূর্তি গড়ে তাদের কাছে যেত, মূর্তি গড়া দেখতে। অনেকদিন নিজের খিদে-তৃষ্ণার কথাও ভুলে যেত। শিল্পীরা টানা অনেকদিন তাকে দেখে একদিন তাকে বলল, 'শিল্পকলার বিষয়ে তোমার যখন এত ঝোঁক তখন রাজার শিল্পকলা শিক্ষাকেন্দ্রে ভরতি হও না কেন? সারাজীবন দেখলেই কি মন ভরবে? নিজের হাতে তৈরি করলে তুমি আরও আনন্দ পাবে।'
সুশর্মা ওই শিক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে ভরতি হতে চাইল। কিন্তু সেই কেন্দ্রের কর্তা তাকে বলল, 'দেখ বাবা, শিল্পীদের এই বিদ্যালয়ে যে সে ভরতি হতে পারে না। যার বাবা শিল্পী ছিল সেই ভরতি হতে পারে। জাত ইত্যাদি না দেখে এখানে ভরতি করা যায় না।'
সুশর্মা হতাশ হয়ে ফিরে গেল। পরদিন সে রাজার কাছে এই ব্যাপারে অনুযোগ করল।
রাজা তার কথা শুনে বলল, 'শিল্পের ক্ষেত্রে আগ্রহটাই বড়ো। তোমার বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করে শিক্ষাকেন্দ্রে ভরতি করিয়ে দেব। তবে একটি শর্তে। তা হল, তোমার সৃষ্ট শিল্পকলা হবে শুধু আমাদের দেশের প্রজাদের ব্যবহারের উপযোগী।'

'তাই হবে মহারাজ।' সুশর্মা বলল। তারপর শিক্ষাকেন্দ্রে ভরতি হয়ে সে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে শিল্পচর্চা করতে লাগল।
অনেকদিন পরে ওই কেন্দ্রের কর্তা বলল, 'এখন তুমি বাড়িতে ফিরে গিয়ে নিজেই মূর্তি গড়তে পার। তোমার এখানকার শিক্ষা শেষ হয়েছে।'
তারপর সুশর্মা রাজার কাছে গিয়ে বলল, 'মহারাজ, আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রে যতটা শেখানো হয় ঠিক ততটুকুতে আমি তৃপ্ত হতে পারিনি। আমি দেশে দেশে ঘুরে বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকলা দেখে আরও কিছু শিখতে চাই। আপনি কি দয়া করে অনুমতি দেবেন?'
রাজা সুশর্মাকে দেশে দেশে ঘোরার অনুমতি দিলেন।
বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে সুশর্মা অসংখ্য মূর্তি দেখল। সেইসব মূর্তি যারা গড়েছে তাদেরও সন্ধান সে খোঁজ করে পেল। সন্ধান পেল না শুধু একটি ক্ষেত্রে। বনের মাঝে একটি পোড়ো মন্দিরে শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন সে দেখেছিল। আশেপাশে কোনো লোক ছিল না। ওই অপূর্ব শিল্পকলা যে কে তৈরি করেছে তা কিছুতেই জানতে পারল না। তখন সে ওই মন্দিরের মাটি কামড়ে পড়ে রইল। কয়েক দিন পরে এক বিচিত্র ধরনের লোক এসে সুশর্মাকে সেখানে তার ওইভাবে পড়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করল।
'আমি অনেক জায়গায় ঘুরে অসংখ্য শিল্পের নিদর্শন দেখেছি। কিন্তু এই মন্দিরে যা দেখলাম তার তুলনা নেই। এত ভালো শিল্পের স্রষ্টা যে কে আমি তা জানতে পারছি না। তাই যতদিন না জানব ততদিন এখানেই পড়ে থাকব। আমি জানতে চাই এটা কোন যুগের, কার সৃষ্টি!'

'এ হল কৃত যুগের। এ শিল্প যারা গড়েছে তাদের বংশের কেউ আর এখন বেঁচে নেই।' লোকটা বলল।
সুশর্মা হতাশ হয়ে বলল, 'সে কি? কেউ নেই!'
'তুমি যদি আমার সঙ্গে পাতাললোকে আসো তাহলে আমি এমন এক শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব যিনি শিল্পসৃষ্টির গূঢ় রহস্য জানিয়ে দেবেন।' শুনেই সুশর্মার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ওই লোকটার সঙ্গে পাতালে গেল। দানবদের শিল্পী যমের সঙ্গে সে দেখা করল। তার ভাঙাচোরা আলয় থেকে সুশর্মাকে যে পাতালে নিয়ে গিয়েছিল সেও ছিল দানব। সুশর্মা যমের কাছে শিল্পসৃষ্টির রহস্য জেনে বিদায় নিয়ে ফিরে এল আবার মর্ত্যভূমিতে। সে পাহাড়ের পাশ দিয়ে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে সে দেখছিল মূর্তি গড়ার উপযোগী পাথর পাওয়া যায় কি না। এক জায়গায় সে ওই ধরনের পাথর দেখতে পেল। সেখানেই থেমে গিয়ে যমের কাছে শিল্পসৃষ্টির যা শিখেছিল তা প্রয়োগ করতে গেল।
শিল্পস্রষ্টা বিশ্বকর্মা সুশর্মাকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা বাবা, এই নির্জন অঞ্চলে যে শিল্প তুমি গড়ছ তা কার জন্য?'
সুশর্মা নিজের সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বলল, 'আমি সত্যিকারের শিল্পী হতে চাই। আপনি কি আপনার পরিচয় দেবেন?'
'আমি বিশ্বকর্মা।' বিশ্বকর্মা বলল।

সুশর্মা তৎক্ষণাৎ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বলল, 'আমি দানবের সৃষ্ট শিল্পরহস্য জানতে পেরেছি। আপনি অনুগ্রহ করলে দেবতাদের শিল্পরহস্যও জানতে পারি।'
'দুরাত্মা! পাপী! তুমি সব ভুলে যাও।' অভিশাপ দিয়ে বিশ্বকর্মা চলে গেল।
বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, সুশর্মার উপর বিশ্বকর্মা অত চটলেন কেন? অভিশাপ দিলেন কেন? আমার প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'
জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'অভিশাপের কারণ ছিল। বিশ্বকর্মাকে সুশর্মা যা বলল তাতে মনে হল, সে সারাজীবন শিল্পসৃষ্টির সন্ধান করতে করতেই কাটিয়ে দেবে। প্রজাদের ব্যবহারের উপযোগী কোনো শিল্প সে গড়বে না। অথচ রাজাকে সে কথা দিয়েছিল প্রজাদের ব্যবহারের উপযোগী শিল্প গড়ার। প্রজাদের কল্যাণে যদি কোনো জ্ঞানের প্রয়োগ না হয় তাহলে সে জ্ঞানের কোনো অর্থ হয় না। এরজন্যই বিশ্বকর্মা সুশর্মাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন।'
রাজা এইভাবে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন