গরিবের কথা

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য ফিরে গেলেন সেই গাছের কাছে। গাছ থেকে শব নামিয়ে কাঁধে ফেলে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবের বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি মনে কর না যে একমাত্র সাধনা এবং তপস্যার মাধ্যমেই বিরাট শক্তির অধিকারী হওয়া যায়। যে শক্তি পাওয়ার জন্য তুমি এত চেষ্টা করছ তা একজন সাধারণ গরিব মানুষের মধ্যেও থাকতে পারে। আমি এমন এক গরিবের কাহিনি শোনাব যার ফলে আমার বক্তব্য তুমি পরিষ্কার বুঝতে পারবে, আর শুনতে শুনতে হাঁটলে তোমার পরিশ্রমও লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:

কোনো এক গ্রামে একজন গরিব ছিল। তার কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। সে প্রত্যেক দিন ওই গ্রামের একটি পুকুরে চান করে শিবমন্দিরে ঢুকত। যেসব ভক্ত মন্দিরে আসত, পুজো দিত, তারা তাকেও দু-একটি ফল খেতে দিত। কেউ কেউ পয়সাও দিত। যেদিন যা পেত তাই ওই গরিব লোকটা খেত। যেদিন পেত না সেদিন খেত না। সে না খেয়েও সেখানেই পড়ে থাকত। অন্য কোথাও সে যেত না।

একদিন এক লক্ষপতি বউকে নিয়ে শিবমন্দিরে পুজো দিতে এসেছিল। তার কোনো ছেলে-মেয়ে ছিল না।

সে পুজো দিয়ে ফেরার সময় তার সামনে একটি কলা ফেলে দিয়েছিল। কলাটি তুলে নিয়ে লক্ষপতিকে ফেরত দিতে দিতে ওই গরিব লোকটা বলল, 'এই কলা তোমার বউকে খেতে দাও। এক বছরের মধ্যে তার একটি ছেলে হবে।'

যার যা থাকে না তারজন্য তার দুঃখ থাকে বেশি। যে যা চায় সে তা পায় না। লক্ষপতি সন্তান চায় কিন্তু সে তা পায়নি।

লক্ষপতির সন্তানের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। সে বউকে কলা খেতে দিল। এক বছরের মধ্যে লক্ষপতির বউ একটি ছেলের মা হল। লক্ষপতি ভাবল, গরিব লোকটা সাধারণ লোক নয়। অসীম ক্ষমতার অধিকারী সে। এই কথা ভেবে সে ওই গরিব লোকটার কাছে গেল। তাকে দেখে গরিব লোকটা বলল, 'কি ছেলে রাতদিন কাঁদছে বুঝি?'

লক্ষপতি তার কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, 'আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। আপনার ক্ষমতা অসীম। আপনার আশীর্বাদে আমি ধন্য হয়েছি। আপনি যা চাইবেন আমি তাই দেব। আপনি অনুগ্রহ করে কিছু নিলে আমি ধন্য হব। বলুন, আমি আপনাকে কী দিয়ে ধন্য হতে পারি।'

লক্ষপতি বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও গরিব লোকটা একটি কথাও প্রথমে বলল না। অনেকক্ষণ ধরে একই কথা বলতে থাকায় গরিব লোকটা মুখ খুলল।

'আমার কোনো কিছুর দরকার নেই। তবে তুমি একটু ভালো হও। গরিবদের বড্ড ঠকাচ্ছ। চুরিচামারি করে বড্ড বেশি লাভ করছ। এত লাভ কর না। পাপ বেড়ে যাবে। তোমার অপকর্মের জন্যে তোমার ছেলের অমঙ্গল হবে।'

লক্ষপতি সেদিন থেকে গরিবদের ঠকানো বন্ধ করে দিল। যার যত জিনিস বন্ধক রেখেছিল সব ফেরত দিল। তারপর থেকে সাধারণ ছোটোখাটো ব্যাবসা করে সে দিন যাপন করতে লাগল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, গরিব লোকটার কথা খেটে গেল কী করে? ওর কথায় এত শক্তি এল কোত্থেকে? শুধু শিব ঠাকুরের প্রসাদের উপর নির্ভর করে জীবনযাপন করলেই কি এতটা ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায়? আমার এই প্রশ্নের জবাব জানা সত্ত্বেও যদি না দাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

এই প্রশ্নের জবাবে বিক্রমাদিত্য বললেন, 'গরিব লোকটার প্রত্যেকটি কথা যদি ফলে যেত তাহলে গাঁয়ের লোক হয়তো অনেক দিন আগেই তাকে মাথায় করে রাখত। কোনো কোনো কথা মাঝে মাঝে ফলে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অনেক তীর্থ ঘুরে যা হয়নি গরিব লোকটার দেওয়া কলা খেয়ে যখন সন্তান হল তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে হয়েছিল লক্ষপতির।

বিক্রমাদিত্যের মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শবসহ নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%