ঘুসখোর পার পেল

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রমাদিত্য গাছের কাছে ফিরে গিয়ে, গাছ থেকে শব নামিয়ে যথারীতি নীরবে শ্মশানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখন শবেস্থিত বেতাল বলল, 'রাজা, তুমি হয়তো কোনো নীতিগত বিষয় মনে রেখে এত পরিশ্রম করছ। আমি জানি নীতি অনুসরণ করে না চললেও কেউ কেউ সংসারে শাস্তি পায় না। নীতি মেনে না চললে যদি শাস্তি না পায় তাহলে নীতি নিয়ে এত পরিশ্রম করার যে প্রয়োজন আছে, আমি তা মনে করি না। আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে আমি তোমাকে গিরিধর নামক একজনের কাহিনি বলছি। কাহিনিটি শুনতে শুনতে পথ চললে, পথ চলার পরিশ্রম লাঘব হবে।' বলে বেতাল কাহিনি শুরু করল:—

অনেককাল আগে হরিপ্রসাদ নামে একজন, তিন-তিনটে গ্রামের জমিদার ছিল। জমিদারির যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশোনা করত গিরিধর। চরিত্রের দিক থেকে লোকটা ছিল ভালো, বিশ্বাসী এবং জমিদারের যে বিষয়টা গোপন রাখার সে বিষয় গোপন রাখার ক্ষমতা ছিল। জমিদারও তার প্রতিটি পরামর্শ কান পেতে শুনত। তার উপদেশ মতো চলত।

এই তিনটে গ্রামের গ্রামবাসীদের অভাব অভিযোগ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি খবর রাখত গিরিধর। কারণ গ্রামবাসীরা গিরিধরের কাছেই তাদের অভাব অভিযোগের কথা জানাত। আস্তে আস্তে গ্রামগুলো বর্ধিষু� হল। লোকের সংখ্যা বাড়ল। সেই অনুপাতে চাহিদা বেড়ে গেল। চাহিদা অনুযায়ী সবসময় কাজ হত না। ফলে অশান্তি দেখা দিল। কিছু লোক প্রভাবশালী হয়ে উঠল। গ্রামবাসীদের মধ্যে অনেকেই গিরিধরকে নমস্কার করত। প্রভাবশালী ধনী লোকেরা গিরিধরকে পুজোপার্বণ উপলক্ষ্যে কাপড়জামা, আংটি এবং তার সঙ্গে কিছু টাকা উপহার দিত। এই ধনীরা তাদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য গরিবদের বেশি করে খাটাত। প্রতিদানে টাকা দিত কম। এই নিয়ে ধনী এবং গরিবদের মধ্যে মাঝে মাঝে বিরোধ দেখা দিত। ঝগড়া হত। গিরিধরকে যারা টাকা দিত, তারা কোনো অন্যায় কাজ করলেও গিরিধর তাদের কিছু বলতে পারত না। পূজারি, বিদ্যালয়ের পণ্ডিতমশাই প্রত্যেকেই সাধ্যমতো গিরিধরকে ভেট দিতে লাগল। দেখতে দেখতে ওই তিনটে গ্রামে গিরিধরকে ভেট দেওয়ার একটা প্রতিযোগিতা দেখা দিল। গিরিধরের স্ত্রীর গলা সোনার অলংকারে এবং আসবাবপত্রে বাড়ি ভরে গেল।

ফলে হরিপ্রসাদের জমিদারির অন্তর্গত তিনটি গ্রামের মধ্যে, প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঘুসের প্রভাব পড়ল। ঘুস নেওয়া এবং ঘুস দেওয়া জলভাত হয়ে গেল।

শেখর নামে এক গরিব শিক্ষিত লোক ছিল। সে এত গরিব ছিল যে এক একদিন একমুঠো ভাতও খেতে পেত না। গ্রামের অবস্থা এমন হয়ে গেল ঘুস ছাড়া সহজভাবে কিছুই পাওয়া গেল না। যত ছোটো কাজ হোক না কেন ঘুস ছাড়া তা পাওয়ার উপায় ছিল না। অনেকদিন কাজকর্ম না-পেয়ে খিদের জ্বালা সহ্য করতে না-পেরে আর গিরিধরের ঘুস নেওয়ার বহর দেখে শেখরের ভীষণ রাগ হল। সে সোজা একদিন জমিদারের কাছে গিয়ে তাকে বলল, 'আপনার জমিদারিতে কী চলছে আপনি কি তা জানেন? আপনার জমিদারিতে ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হচ্ছে না। ঘুস দেয় যারা, তারা গরিবদের দিনরাত খাটিয়ে, মজুরি কম দিয়ে, ওদের ঠকিয়ে পয়সা করে। আর এসবের মূলে আছে আপনার অতি বিশ্বাসী গিরিধর। শুনে হয়তো আপনি অবাক হচ্ছেন, কিন্তু আমি মিথ্যা কথা বলছি না। আমার কথা বর্ণে বর্ণে সত্য। আপনার এত বড়ো বিশ্বাসী পাত্রের বিরুদ্ধে আমি বাধ্য হয়ে বলছি। এর জন্য আমি দুঃখিত কিন্তু নিরুপায়। ভয়ে কেউ আপনাকে বলে না। আমি আর সহ্য করতে না-পেরে বলছি।'

জমিদার শুনে অবাক হয়ে গেল। আসলে গিরিধরের উপর হরিপ্রসাদের ছিল অগাধ বিশ্বাস। এত বছর ধরে গিরিধর তিনটি গ্রামের সব কিছু দেখাশোনা করছে। তার বিরুদ্ধে কেউ আজ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ করেনি। তাই শেখরের কথা বিশ্বাস করতে জমিদারের কষ্ট হয়েছিল। হরিপ্রসাদ বলল, 'শেখর, তুমি গিরিধরের বিরুদ্ধে যা বলেছ তা যদি সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে আমি তাকে দূর করে দেব।'

এরপর জমিদার একটা ব্রাহ্মণকে ডেকে বলল, 'তোমাকে ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। এখানে একটা মন্দির আছে। এই মন্দিরের পূজারির পদ নেওয়ার জন্য তুমি চেষ্টা করো। প্রয়োজন হলে এই একশোটি টাকা তুমি খরচ করো ওই পদ পাওয়ার জন্য।' তার চলে যাওয়ার পর হরিপ্রসাদ আর একজন ব্রাহ্মণকে ডেকে বলল, 'তুমি বহু বছর ধরে বিভিন্ন জায়গায় পুজো করে আসছ। তোমার অভিজ্ঞতা সীমাহীন। তুমি গিরিধরের সঙ্গে দেখা করো। তাকে নমস্কার করে, একটা নতুন মন্দির হয়েছে, সেই মন্দিরের পূজারির পদ চাও। এই নাও ঠিকানা। আমার ধারণা তুমি ওই পদ পেয়ে যাবে।'

দুই ব্রাহ্মণ একটু আগে-পরে গিরিধরের কাছে গেল। প্রথম ব্রাহ্মণ টাকার থলি নিয়ে বসেছিল। দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ গিরিধরের বাল্যবন্ধু ছিল। গিরিধর দ্বিতীয় ব্রাহ্মণের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করে শেষে বলল, 'আমার ধারণা তোমার মতো অভিজ্ঞ পূজারিকে ওই মন্দিরের পূজারি করতে জমিদারকে রাজি করাতে পারব।'

প্রথম ব্রাহ্মণ গিরিধরের সঙ্গে দেখা করে ওই পূজারির পদ পাওয়ার কথা জানাল। গিরিধর বলল, 'আপনাকে আমি কোনোদিন কোথাও পুজো করতে দেখিনি। আমি কী করে বলব জমিদারকে ওই পদ দিতে। আপনি এখন আসতে পারেন।'

গিরিধর দ্বিতীয় ব্রাহ্মণকে পূজারির পদে বহাল করার জন্যে হরিপ্রসাদকে পরামর্শ দিল। তারপর হরিপ্রসাদ শেখরকে ডেকে বলল, 'আমি গিরিধরকে পরীক্ষা করে দেখেছি। গিরিধর ঘুস খায় না, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি।'

শেখর কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'মাত্র একবারের চেষ্টায় অত বড়ো ঘুসখোরকে ধরা যায়? আপনি আর একবার পরীক্ষা করে দেখুন। আপনি গিরিধরের বাড়িতে গিয়ে বাড়ির সাজসজ্জা আর তার স্ত্রীর গয়নাগাঁটি নিজের চোখে দেখে আসুন। আপনি যা মাস মাহিনা দেন তাতে গিরিধর অতকিছু কী করে করতে পারে?'

শেখরের কথা শুনে হরিপ্রসাদ ঠিক করল, খাজনা আদায়ের অজুহাতে সে এক বার প্রত্যেক গ্রামে ভালো করে ঘুরে আসবে। সেই সময় গিরিধরের বাড়ি এবং তার স্ত্রীকেও দেখে আসবে।

হরিপ্রসাদের বেরুনোর আগের দিন গিরিধরের শ্যালক এসে বলল, 'আমাদের গ্রামে অনেকখানি চাষের জমি জলের দামে বিক্রি হচ্ছে। আমার কাছে টাকা থাকলে আমি কিনে ফেলতাম। তুমি যদি কিনতে চাও, এক্ষুনি চলো।'

গিরিধর কালমাত্র বিলম্ব না করে স্ত্রীর সমস্ত গহনা বন্ধক রেখে শ্যালককে জমি কিনে ফেলতে বলল। তারপর সে স্ত্রীকে বলল, 'দেখো সব গহনা তুমি ফেরত পাবে। আমি তো বিক্রি করছি না, বন্ধক রেখেছি ঠিক ছাড়িয়ে নিতে পারব। জলের দামে জমিটা পাচ্ছি কিনে নিই।'

সেইদিনই প্রতিবেশীর বাড়িতে বিয়ে ছিল। ওদের সঙ্গে গিরিধরের ভালো সম্পর্ক ছিল। ওরা দু-চারদিন ব্যবহার করার জন্য গিরিধরের বাড়িতে যত আসবাবপত্র ছিল সব ধার নিয়ে গেল।

পরেরদিন হরিপ্রসাদ আসার পর গিরিধর একটা মাদুর পেতে জমিদারকে বসাল এবং নিজে বসল একটি পিঁড়িতে। গিরিধরের বউ, বাড়ির ভেতরে স্বামীকে দুঃখ করে বলল, 'সব তো প্রতিবেশীদের দিয়ে দিলে। একটা রুপোর গ্লাসও নেই যে জমিদারকে একগ্লাস জল দেব।' বলে গজগজ করতে করতে একটা কাঁসার গ্লাসে তাকে জল দিল। জল নেওয়ার সময় জমিদার আড়চোখে গিরিধরের স্ত্রীর গলার দিকে তাকাল। তার গলায় তখন একটি পুঁতির মালা ছিল। হাতে সোনার কোনো অলংকার ছিল না। এসব লক্ষ করে হরিপ্রসাদ বলল, 'আমার জন্য ব্যস্ত হতে হবে না। হঠাৎ ইচ্ছে হল একটু ঘুরে ঘুরে দেখছি, গ্রামের মানুষ কেমন আছে।'

গিরিধর খুব দুঃখ পাওয়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, 'আপনি পায়ে হেঁটে এত কষ্ট করছেন কেন? আমাকে ডেকে পাঠালেই হত। ভালো কথা, একটু দাঁড়ান। কাল পর্যন্ত যা আদায় হয়েছে আপনাকে দিয়ে দিই।' বলে গিরিধর টাকা দিতে এলে হরিপ্রসাদ বলল, 'এখন ওই টাকা তোমার কাছেই থাক। পরে আমি নেবখন।' বলে হরিপ্রসাদ ফিরে গিয়ে শেখরকে সেদিনই ডেকে পাঠাল।

'দেখো শেখর, তুমি আমার কাছে মিথ্যা কথা বলেছ, আমি দেখে এসেছি গিরিধরের বাড়িতে আসবাবপত্র বলতে ছেঁড়া মাদুর আর পিঁড়ি আছে। আর তার স্ত্রীর গলায় একটা পুঁতির মালা আছে। তুমি আর কোনোদিন আমার কাছে এই ধরনের মিথ্যা কথা বলতে আসবে না। চলে যাও।' হরিপ্রসাদ বলল।

শেখর বড়ো দুঃখ পেল। 'একটা জলজ্যান্ত ঘুসখোর বার বার জমিদারের চোখে ধুলো দিতে পারছে। আমি প্রমাণ করতে পারলাম না। তাহলে কি প্রত্যেক বার ভগবান একটা ঘুসখোরকে বাঁচাচ্ছে! কী জানি!' ভাবতে ভাবতে শেখর ফিরে গেল।

বেতাল এই কাহিনি শুনিয়ে বলল, 'রাজা, শুনলে তো কীভাবে একাধিক বার গিরিধর বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেল। গিরিধরের প্রতি জমিদারের অন্ধবিশ্বাস কিছুতেই ভাঙা গেল না। এর কারণ জানা সত্ত্বেও যদি না জানাও তাহলে তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জবাবে রাজা বিক্রমাদিত্য বললেন, 'গিরিধর যে নীতিহীন কাজ করেছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। গিরিধর যে ঘুস নিত সেটাকে কখনোই সমর্থন করা যায় না। তবে গিরিধরের মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য ঘুস নেওয়া ছিল না। নির্দিষ্ট পদে উপযুক্ত লোককে নিয়োগ করাই তার লক্ষ্য ছিল। ঘুস ছাড়া সে উপযুক্ত লোককে নেয়নি এ-রকম অভিযোগ খাটে না। সে শোষণ করেনি। যারা গরিবদের শোষণ করে তারা তার বাড়িতে এসে যদি কিছু ভেট দেয় সেটাকে সে ফিরিয়ে দেয়নি। গিরিধরের ওপরে সবচেয়ে বড়ো যে অভিযোগ শেখর করেছিল সেটা প্রমাণিত না হওয়ায়, তার বাড়িতে কিছু আসবাবপত্র দেখলেও, হরিপ্রসাদ হয়তো শেষপর্যন্ত তার চাকরি খেত না। আগের দিন যা আদায় হয়েছে তাও গিরিধর জমিদারকে দিয়ে দিতে চাইল। এর ফলে জমিদার বুঝল, গিরিধর কত সৎ এবং বিশ্বাসী। জমিদারের কাছে অন্য কেউ অভিযোগ না করায় এবং আদায়কৃত খাজনা ঠিকসময় পেয়ে যাওয়ায় গিরিধরের উপর অবিশ্বাসের কোনো কারণ রইল না।'

রাজার মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বেতাল শব নিয়ে ফিরে গেল সেই গাছে।

সকল অধ্যায়
১.
বেতাল কথা
২.
রাজার খাতির
৩.
ঘরের ছেলে
৪.
বোকার কাহিনি
৫.
দেশভ্রমণ
৬.
শাস্তি
৭.
অক্ষয় পাত্র
৮.
দুই রূপ
৯.
দার্শনিক
১০.
গরিবের কথা
১১.
ঋণ মুক্তি
১২.
প্রতিজ্ঞা
১৩.
অনুভবানন্দ
১৪.
নাস্তিকের দৈবভক্তি
১৫.
ঠাকুরের ইচ্ছা
১৬.
সাধুর বর
১৭.
ভুলের কাছে ঋণী
১৮.
অর্থহীন পরীক্ষা
১৯.
সুগন্ধি বৃক্ষ
২০.
পরামর্শ
২১.
পাপীর অর্জিত পুণ্য
২২.
সাধনায় ভুল
২৩.
অরণ্যকুমার
২৪.
গানের পরীক্ষা
২৫.
অরণ্যবাসী
২৬.
সৈনিকের স্বার্থ
২৭.
মানবতা
২৮.
শান্তির জন্য যুদ্ধ
২৯.
ক্ষমা করা যায় না
৩০.
মর্যাদা
৩১.
মিথ্যার আশ্রয়
৩২.
পরিবর্তন
৩৩.
ব্যাবসার ভাগ্য
৩৪.
কথার দাম
৩৫.
ঘুসখোর পার পেল
৩৬.
পিতৃসত্য পালন
৩৭.
রাক্ষসভীতি ও রাজনীতি
৩৮.
মনের কথা
৩৯.
পদের লোভ নেই
৪০.
স্নেহ বড়ো অন্ধ
৪১.
ভাই ভাইকে মারল
৪২.
নাম করার ইচ্ছা
৪৩.
বেশি কথা বলে
৪৪.
ধর্মপরায়ণ
৪৫.
সঠিক বিচার
৪৬.
বাস্তব জ্ঞান
৪৭.
সম্পর্ক
৪৮.
জাদুর আরশি
৪৯.
ধর্মের পথ
৫০.
প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত
৫১.
কার কত টান
৫২.
পরাজিত গন্ধর্ব
৫৩.
আদর্শ পুরুষ
৫৪.
পরিবর্তিত মানুষ
৫৫.
বুদ্ধিমান

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%