অগ্নিকুমার আচার্য
বারো বছরে বিজ্ঞানী?
এ কী রূপকথার গল্প নাকি?
না— মোটেই রূপকথার গল্প নয়। একেবারে বাস্তব কাহিনি। এবং এ কাহিনির নায়িকা সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। কাব্য ভিগনেশ। দিল্লির বসন্তকুঞ্জের পাবলিক স্কুলের ছাত্রী সে।
কী আবিষ্কার করেছে সে?
সেএক আশ্চর্য রোবট বানিয়ে ফেলেছে। যে রোবট মৌমাছিদের বঁাচাবে।
সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ‘রোবট’ বানিয়ে ফেলেছে? কীভাবে?
পড়ার ফাঁকে ফাঁকে খেলাধুলোয় মন কাব্যের। আর তার খেলার সরঞ্জাম কী ছিল জানো? ভাঙা ফুটো টিন, কয়েকটা ব্যাটারি আর ইলেকট্রিকের তার। এইসব সরঞ্জামের মধ্যেই যে ছিল রোবট আবিষ্কারের উপাদান তা কে জানত? কিন্তু কাব্য এই অসাধ্যই সাধন করল। বিজ্ঞানের পাঠ্য বইয়ে সেরোবটের কান্ডকারখানার কথা পড়ে। তা ছাড়া আছে ইন্টারনেট! সেখানেও দেখে রোবটের কলাকৌশল। এসব দেখেই সেবানিয়ে ফেলেছে একটা যন্ত্রমানব। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, কোনো বিজ্ঞান শিক্ষকের সাহায্য নেই। একেবারে নিজের চেষ্টায়, আর অধ্যবসায়ের জোরে সেবারো বছরেই বিজ্ঞানীর তকমা লাগিয়ে ফেলল।

কাব্য ভিগনেশ
কিন্তু তার এই রোবট কী কাজে লাগবে?
সেবলেছে, তার রোবট মৌমাছিদের বঁাচাবে। মানে? কাব্য বলে, কোনো ঘরের কোণে, গাছের ডালে, বাগানে মৌমাছিরা যখন চাক বানায়, তখন এই চাকের মধু সংগ্রহের জন্য বিষাক্ত গ্যাস বা আগুন ব্যবহার করা হয়। এতে বহু মৌমাছি মারা যায়। অহেতুক কতকগুলি উপকারী পতঙ্গের জীবন যায়, তা ছাড়া বিষাক্ত গ্যাস, আগুনের ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হয়। মৌমাছি নিধন হওয়াতে মধুর উৎপাদনও কম হয়।
ভালো কথা। কিন্তু কীভাবে বঁাচাবে মৌমাছিদের কাব্যের তৈরি রোবট? সেজানায়, তার তৈরি রোবট আলতোভাবে মৌমাছির চাককে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যেতে পারবে। এতে মধু সংগ্রহের সময় আর গ্যাস ধোঁয়ার দরকার হবে না। মৌমাছিরাও বঁাচবে।
মৌমাছি বঁাচানোর এই নেশা থেকে দু-বছর চলেছে কাব্যের রোবট তৈরির সাধনা পড়ায় ফাঁকি দিয়ে।
এবার চাই স্বীকৃতি।
২০১৩ সালে বসেছিল রোবট তৈরির প্রতিযোগিতার আসর দিল্লিতে। সেখানে সবাইকে চমকে দিয়ে সর্বকনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি পেল কাব্য।
আর থামেনি কাব্য।
যতবার দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু যেখানেই রোবটের প্রতিযোগিতা হয়েছে, সেখানেই যোগদান করেছে এই ক্ষুদে বিজ্ঞানী। এই অল্প বয়সে তাঁর এই আশ্চর্য আবিষ্কার দেখে বিজ্ঞানীরা মুগ্ধ। প্রশংসা আর প্রশংসা। কাব্য আরও দূর যেতে চায় তার আবিষ্কার নিয়ে। তার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পৌঁছোনো। বিদেশের তাবড়ো তাবড়ো প্রযুক্তিবিদদের কাছ থেকে কাজের স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়া।
আগামীতে প্রতিযোগিতার আসর বসছে ডেনমার্কে। ‘ইউরোপিয়ান ওপেন রোবট চ্যাম্পিয়নশিপ’ প্রতিযোগিতা। ওখানে কাব্য তার আবিষ্কার প্রদর্শন করবে। এর জন্যেই চলছে জোরকদমে প্রস্তুতি।
এবার আর তার অর্থের অভাব নেই। অধিকাংশ অর্থের জোগান দিচ্ছেন বেঙ্গালুরুর একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা— ‘ফুয়েল এ ড্রিম।’ সংস্থার অধিকর্তা রঙ্গনাথ থোতা বলেছেন, ক্ষুদে বিজ্ঞানী কাব্য ভারতের গর্ব। ওর গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে আমরা ওর পাশে থাকব। অসামরিক বিমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও কাব্যকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তার বিদেশে যাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থাও মন্ত্রক থেকে করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
কাব্য খুশি। সেবলে, শুধু পড়াপড়া করে শিশুরা বইখাতা থেকে অন্য কোনো দিকে মন ফেরাতে পারে না। তাই প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু করার চেষ্টাও করা দরকার।
কাব্য ভিগনেশই হবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে এক প্রেরণার উৎস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন