অগ্নিকুমার আচার্য
পাঁচ-শো ক্ষুধার্ত মানুষ।
খাবার না পেয়ে উপোস থাকেন। এদের মুখে ক্ষুধার অন্ন তুলে দেন এক যুবক।
না:, তিনি কোনো রাজা-জমিদার নন। তিনিও এক হতদরিদ্র মানুষ। কে তিনি? এমন মহাপ্রাণ!
নাম তাঁর বিশাল সিং। বয়েস ৩৮। গত চোদ্দ বছর ধরে ক্ষুধার্তদের মুখে রান্না করা খাবার তুলে দিচ্ছেন। বিশালের এরূপ একটি মহৎ কাজের পিছনে রয়েছে, তাঁর নিজের জীবনের এক করুণ কাহিনি।
কী সেই কাহিনি?
বেশ কিছু বছর আগেকার কথা।

বিশাল সিং গত ১৪ বছর ধরে ক্ষুধার্তদের খাবার তুলে দিচ্ছেন।
বাবা প্রচন্ড অসুস্থ। বাবাকে নিয়ে বিশাল গুরগাঁওয়ের হাসপাতলে ভরতি করান। চিকিৎসকেরা জানালেন, বাবার চিকিৎসার জন্য হাজার পঞ্চাশ টাকা লাগবে।
বিশালের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! হাতে তো একটা টাকাও নেই যে! কোথা থেকে জোগাড় করবে এত টাকা! হাসপাতাল চত্বরে বসে ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিল না।
দুপুরে খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু পয়সা কোথায় যে খাবার কিনে খাবে! এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে কোনো লাভ হল না। ক্ষুধার্ত বিশাল সিং দেখতে পেলেন হাসপাতাল চত্বরে আরও কিছু ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের জোগাড় করতে না-পেরে এদিক-ওদিক ঘুরে মরছে।
বিশালের মনে ক্ষুধার্তদের এই করুণ দৃশ্য দারুণ কষ্টকর হয়ে দেখা দিল। তিনি ভগবানের নামে শপথ করলেন যেদিন আমি রোজগার করতে পারব, সেদিনই আমি ক্ষুধার্তদের মুখে বিনে পয়সায় অন্তত একবেলা খাবার তুলে দেব।
বিশাল কিছুদিন পর স্বাবলম্বী হলেন। এবার প্রতিজ্ঞা রক্ষার পালা।
বিশাল শুরু করেন তাঁর অন্ন বিতরণের কাজ হাসপাতাল চত্বরে। কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা তো বেড়েই চলছে। বিশাল ঠিক করলেন বাজারে দোকানে গিয়ে হাত পাতবেন। সবজি, চাল, ডাল ভিক্ষা করবেন। নইলে যে তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। প্রথম প্রথম বিশাল তেমন একটা সাড়া পাননি। কিন্তু ধীরে ধীরে দোকানদারেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে লাগল। কাঁচামাল, শাকসবজি, চাল-ডাল পেতে শুরু করলেন বিশাল।
একটা কবিতায় আছে না, ‘ছোটো বালুকার কণা বিন্দু বিন্দু জল গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল’। এভাবেই মানুষের সদিচ্ছা থাকলে, দুর্গত মানুষের সেবা করার ইচ্ছা থাকলে, কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
বিশাল প্রথমে গুরগাঁও হাসপাতালে গরিব রোগীর পরিবার পরিজনদের মুখে রান্না করা খাবার তুলে দিতে লাগলেন। নিজেই রান্না করেন, নিজেই পরিবেশন করেন। যাদের খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা পেট পুরে খেতে পান। বিশাল মনে করেন, দরিদ্র ক্ষুধার্তদের সেবা করাই ঈশ্বরের সেবা।
বর্তমানে বিশাল রোজ পাঁচ-শো মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। এখন শুধু গুরগাঁও হাসপাতালে আর সীমাবদ্ধ নেই খাদ্য বিতরণ, কিং জর্জ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করেন। তাঁর আশা, ক্রমে ক্রমে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে, এমনকী রাজ্যের রাজধানী শহরের সবক-টি হাসপাতালেও রান্নাঘর চালু করবেন।
বিশালের এই মানবসেবার কাজ দেখে হাসপাতালের কর্মীরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কর্মীদের হাতেই তুলে দেওয়া হয় খাবার কুপন। তাঁরা গরিব রোগীর সঙ্গে আসা পরিজনদের হাতে তুলে দেন কুপন। বিনে পয়সায় দুপুরের এই খাবার পেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষগুলি যারপরনাই খুশি। তাদের সবার মুখে তৃপ্তির হাসি।
বিশাল আহ্বান করেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে যাতে তাঁরা মুক্তহস্তে কাঁচামাল দান করেন। তিনি বলেন, যেকোনো উৎসবের দিনে, জন্মদিনের বা বিবাহের অনুষ্ঠানে, ধর্মীয় উৎসবে, উৎসব-কর্তারা যদি কিছু কাঁচামাল দান করেন তাহলে বিশালের মানবসেবার কাজ আরও বিস্তৃত হবে, আরও অনেক ভুখা মানুষের মুখে হাসি ফুটে উঠবে।
বিশাল সমাজের বুকে যে মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা অতুলনীয়। তিনি প্রমাণ করলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন